বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারে দেশের উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে হু হু করে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারি বর্ষণ। এসব এলাকার লাখ লাখ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। উপকূলবর্তী জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এদিকে সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় দেশের তিন সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর। আমাদের অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
বরগুনা (উত্তর):পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের (বেড়িবাঁধ) ভাঙা অংশ দিয়ে বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, বেতাগী, আমতলী, তালতলীর অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে মাঝেরচর, এমবালিয়াতলী, আলিয়াবাদ, নিশানবাড়িয়া, জিনতলা, বালিয়াতলী, রুহিতা, তেঁতুলবাড়িয়াসহ বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থিত আবাসন প্রকল্পগুলো। সরেজমিনে দেখা যায়, বরগুনা শহর সংলগ্ন খাকদোন নদীর উত্তরপাড়ের মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ পল্লী, সোনালী পাড়ায় হাঁটু পানিতে প্লাবিত হয়ে মানুষজন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বরগুনা শহরের বাজার সড়ক, গোলাম সরোয়ার সড়ক, পশু হাসপাতাল সড়ক জোয়ারে হাঁটু পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পাউবো সূত্রে জানা যায়, ইতিপূর্বে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা ও মহাসেনের কারণে বরগুনার ৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। ঝুঁকির মধ্যে আছে প্রায় ১২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।
খুলনা অফিস:খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কৈয়া-সরাবপুর সড়কের টিকেবুনিয়া স্ল্যুইচ গেট ভেঙে চিংড়ি ঘেরসহ বসতবাড়ি ডুবে গেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রায় দুইশ চিংড়ি ঘেরের ১০ কোটি টাকার চিংড়ি ভেসে গেছে।
কয়রা (খুলনা):সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় জনপদ কয়রার নদ-নদীতে জোয়ারের পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে উপজেলার কপোতাক্ষ নদ ও শাকবাড়িয়া নদীর ৮৪ কিলোমিটার এলাকার বেড়িবাঁধের অর্ধশত পয়েন্ট চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পূর্ণিমার জোয়ারে যেকোন সময় বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে ঘটতে পারে মহাবিপর্যয়। পাউবো কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি বারবার অবহিত করা হলেও বাঁধ রক্ষায় তারা এখন পর্যন্ত কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ইতিমধ্যে এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বেড়িবাঁধের ক্ষত-বিক্ষত জায়গায় মাটি ফেলানোর কাজ করলেও প্রচণ্ড জোয়ারের চাপে তা কাজে আসছে না।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কয়রা সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর কয়রা ক্লোজার, ৬ নম্বর কয়রা, ঘাটাখালি, হরিণখোলা, মদিনাবাদ লঞ্চঘাট, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কাঠকাটা, গাজীপাড়া, গাববুনি, শাকবাড়িয়া, কাশিরহাট, দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চরামুখা, মেদেরচর, ঘড়িলাল, জোড়শিং, আংটিহারা, গোলখালি, মাটিয়াভাঙা, মহারাজপুর ইউনিয়নের দশালিয়া, লোকা, মঠবাড়ি পবনা, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের গিলাবাড়ি, নয়ানি, শেখেরকোনাসহ অর্ধশত পয়েন্টে বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশের উপক্রম হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম হাসান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে পাউবোর সাতক্ষীরা জোনের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের পর কয়রা এলাকার বেড়িবাঁধের নীচু ও ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টগুলোর তালিকা প্রস্তত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোন বরাদ্দ ও নির্দেশনা না পাওয়ায় কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পটুয়াখালী:পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়কের তিনটি ফেরিঘাট ও পটুয়াখালী-বরিশাল সড়কের লেবুখালী ফেরিঘাট গতকাল জোয়ারে ডুবে যায়। এ সময় কয়েক ঘণ্টা সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। তলিয়ে যায় গলাচিপা, রাঙাবালী ও দশমিনা উপজেলার বেড়িবাঁধের বাইরের অর্ধশতাধিক চর এলাকা।
গতকাল বেলা ১১টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত জোয়ারের পানিতে প্ল¬াবিত হয় পটুয়াখালী শহরের নূতন বাজার, সদর রোড, সেন্টারপাড়া, চরপাড়া, পোস্ট অফিস রোড, লতিফ স্কুল রোড, হাসপাতাল এলাকা, জুবিলী স্কুল রোডসহ অনেক এলাকা। এ সময় পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়কের খেপুপাড়া, হাজীপুর ও মহিপুর এবং পটুয়াখালী-বরিশাল সড়কের ফেরিঘাটের সংযোগ সড়কসহ গ্যাংওয়ে ডুবে যায়। এতে জোয়ারের সময় প্রায় এই রুটের যানবাহন চলাচল বিঘ্ন ঘটে।
মংলা (বাগেরহাট):পূর্ণিমার জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ হাজার মানুষ। গতকাল দুপুরে শহরের রাস্তাঘাটের ওপর দিয়ে বইতে থাকে জোয়ারের স্রোত। পশুর নদী ও মংলা নদীর দুকূল উপচে জোয়ারের পানি শহরে ঢুকে পড়ে। মূহূর্তেই শহর ও শহরতলীর অধিকাংশ সড়ক, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়। শহরের আব্দুল হাই সড়ক, সিঙ্গাপুর মার্কেট, নিউ মেইন রোড, বাজার মসজিদ রোড, মাদ্রাসা রোড, কবরস্থান রোড ও খেয়াঘাট এলাকা প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট পানিতে তলিয়ে যায়। এ সময় ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে শহরের রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে পড়ে। প্লাবিত শহরে পথ চলতে গিয়ে পথচারীদের ড্রেন ও রাস্তার খানা-খন্দে পড়তে হয়েছে। শহরতলীর সিগনাল টাওয়ার, কুমারখালী, কেওড়াতলা, শেলাবুনিয়া, মাছমারা, পুরাতন রকেটঘাট এলাকার বেশিরভাগ ঘর ও বসতবাড়িতে নদীর জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে। বিকালের দিকে জোয়ারের পানি নেমে গেলে শহর এলাকা স্বাভাবিক হয়। দিন-রাতে প্রতিদিন দুবার এ অবস্থা চলছে লক্ষাধিক মানুষের আবাস মংলা পৌর শহরে। জোয়ারের তোড়ে মংলার অধিকাংশ চিংড়ি ঘের ডুবে কোটি কোটি টাকার চিংড়ি ভেসে গেছে।
কাউখালী (পিরোজপুর): পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সন্ধ্যা, কচাঁ, কালিগঙ্গা, চিরাপাড়া, গাবখান নদীতে তিন-চার ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নদী তীরবর্তী প্রায় ২৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক রবিশস্যের।
