শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯৪ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তার ছেলে শাফি ইমাম রুমী শহীদ হন। এছাড়া তার স্বামী শরীফ ইমামও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইন্তেকাল করেন। একাত্তরে স্বামী-সন্তান হারা এই মা স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। তার একাত্তরের দিনলিপি নিয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে একজন মুক্তিযোদ্ধার মায়ের দৃঢ়তা, ত্যাগ ফুটে উঠেছে। যা তাকে দেশের মানুষের কাছে চির সম্মানের আসনে পৌঁছে দেয়। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বিক্ষোভের অংশ হিসাবে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ঘাতক নির্মূল কমিটি গঠন করা হয়। তিনি হন এর আহ্বায়ক। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি। এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। তার নেতৃত্বেই এই কমিটি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গণআদালতের মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার সম্পাদন করে। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান শহীদ জননী জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। এই বিচারের পর দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তত্কালীন সরকারের বিরোধিতা জেলজুলুম সহ্য করে তিনি এই আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে তার ক্যান্সার আরো বেড়ে যায়। আমেরিকায় চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
জাহানারা ইমামের জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ মে। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায়। ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের রক্ষণশীল বাঙ্গালি মুসলিম পরিবারে জন্ম হয় তার। তার বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম।
১৯৪২ সালে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করে ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড শেষ করে ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে মাস্টার্স করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
তিনি ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউটেও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে কাজ করেছেন। সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ উপলক্ষে এক বাণীতে বলেন, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমেই জাহানারা ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। জাহানারা ইমামের প্রতি আজ রাজধানীর শাহবাগে ‘প্রজন্ম চত্বরে’ শ্রদ্ধা নিবেদন করবে সর্বস্তরের জনগণ। গত সোমবার গণজাগরণ মঞ্চের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শহীদ জননীর ছবি সম্বলিত বেদিতে বুধবার সকাল আটটায় গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে সকলের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সারাদিন উন্মুক্ত থাকবে এই বেদি। এছাড়া সন্ধ্যায় শহীদ জননীর ছবিতে আলোক প্রজ্বলন করা হবে। সেইসঙ্গে থাকবে শহীদ জননীকে নিবেদিত গান ও কবিতা।
