কাঠগড়ায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি। নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেয়ার এক পর্যায়ে গত সোমবার সাক্ষীর কাঠগড়ায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে বিচারকাজ মুলতবি করা হয়। আদালত কক্ষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার পর প্রিজন ভ্যানে করে তাকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে দেয়া সাফাই সাক্ষ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, নিজের ইচ্ছামত ইতিহাস তৈরির প্রবণতা মানুষের মধ্যে রয়েছে, তবে সুখের বিষয় হলো ইতিহাস তা অনুমোদন করে না। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ করাচির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। সে সময় বিমানে আমার সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন রাষ্ট্রদূত ওসমান সিদ্দিকী। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইয়ার মেট ছিলেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাতও ওই বিমানে ছিলো। তিনি বলেন, এটা ঐতিহাসিক সত্য যে আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী ছিলেন। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
জবানবন্দিতে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, এ মামলার ফর্মাল চার্জে (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) আমাকে মনোবিকারগ্রস্ত খুনী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়নি। মানসিক প্রতিবন্ধির অভিযোগও তারা আমার বিরুদ্ধে আনেনি। আমি আমার মরহুম পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর রাজনীতির অনুসারী ছিলাম এ সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি হিসেবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। হোসেন শহীদ সোরওয়ার্দীর সমর্থন সত্ত্বেও ১৯৪৬ সালে বেঙ্গল এসেম্বলির নির্বাচনে আমার পিতাকে মনোনয়ন দিতে মুসলিম লীগ ব্যর্থ হয়। মুসলিম লীগের অর্থের যোগানদাতাদের একজন খান বাহাদুরকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তরুণ মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে ফরমান উল্লাহ খান, মাজহার কুদ্দুস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কলকাতায় মুসলিম লীগ অফিসের সামনে বিক্ষোভ হয়।
সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর ফজলুল কাদের চৌধুরী একটি বিবৃতি দিয়ে ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন, যেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। যে নির্বাচনে আমার পিতা পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইয়াহিয়া খানের সমঝোতা প্রচেষ্টা চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং আমার পিতা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন। মধ্যাহ্ন বিরতির পর এক ঘন্টা সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাফাই সাক্ষ্য দেন সালাহউদ্দিন কাদের। সাক্ষ্য দেয়ার এক পর্যায়ে বিকাল সোয়া ৩টার দিকে হঠাত্ বুকে ব্যথা অনুভব করায় সেখানে রাখা চেয়ারে তিনি বসে পড়েন। তখন তিনি কোন কথা বলতে পারছিলেন না। কয়েক মিনিট পর সালাহউদ্দিন কাদেরের উদ্দেশে ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক বলেন, আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন? এসময় তিনি হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। এরপর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম কাঠগড়ার কাছে গিয়ে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হয়ে বিচারকাজ মুলতবির জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানান। তখন বিচারকাজ মুলতবি করে বিচারকগণ এজলাস থেকে নেমে যান। বিচারকরা এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার কয়েক মিনিট পর সালাহউদ্দিন কাদেরকে কাঠগড়া থেকে বের করে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জন্য রাখা সোফায় এনে বসানো হয়। সেখানে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে প্রেশারটা উঠানামা করছে। আজকেও সেইরকম বোধ করছি। এজন্য আমাকে স্প্রে নিতে হয়েছে। কিন্তু এই স্প্রে ব্যবহারেরও একটা সমস্যা আছে এতে প্রেশার খুব নিচে নেমে যায়। ট্রাইব্যুনাল কক্ষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন কাদেরকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকার অনুরোধ জানান। জবাবে তিনি বলেন, এখানে (কেন্দ্রীয় কারাগার) থাকলে আমি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বো। সময় বেশি লাগলেও গাজীপুরে আমাকে নিয়ে চলুন। এরপরই ছেলে হুমাম কাদের চৌধুরীর কাঁধে ভর দিয়ে তিনি আদালত কক্ষ থেকে নিচে নেমে আসেন। এরপরই তাকে প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরআগে সকালে সালাহউদ্দিন কাদেরের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম সাফাই সাক্ষীর সংখ্যা বিষয়ক আদেশ পুনর্বিবেচনা, প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত নথিপত্র আদালতে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা এবং মামলার কার্যক্রম ৭ জুলাই পর্যন্ত মুলতবি করার জন্য ট্রাইব্যুনালে তিনটি আবেদন উত্থাপন করেন। আজ এসব আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।
