মান নয়, সংখ্যা বাড়াতে আগ্রহী সরকার

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২২:৪২
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বেশিরভাগই চলছে আইন অমান্য করে। সরকারের নীতিমালা আমলে না নিয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছেন। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে মালিকানা দ্বন্দ্ব। আবার যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে মালিকানা দ্বন্দ্ব নেই সেগুলোতেও রয়েছে বড় ধরনের আইনি দুর্বলতা। নেই শিক্ষার মান। নির্ধারিত সময়েও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি সার্টিফিকেট বিক্রিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নানামুখি সমস্যা নিরসনে সরকার উদ্যোগী না হলেও নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিতে সরকারের উদ্যোগ দৃশ্যমান। রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাচ্ছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠার সময়ও পুরোপুরি নীতিমালা মানতে হচ্ছে না এসব বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোক্তাদের । বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৫২টি। এ সংখ্যা পৌঁছেছে ৭১ টিতে। দুই একটি ছাড়া সরকার বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই অনুমোদন দিয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকদের মধ্যে রয়েছেন সংসদ সদস্য, ছাত্রলীগের প্রাক্তন সভাপতি ও সম্পাদক, সিটি করপোরেশনের সদ্যবিদায়ী মেয়রসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়ার বিষয় পুরোটাই এখতিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। কেউ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আবেদন করলে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিদর্শনের জন্য ইউজিসিতে পাঠানো হয়। ইউজিসি পরিদর্শন শেষে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরিদর্শন রিপোর্ট ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ কোন বিষয় নয়, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। সরকারের সর্বশেষ অনুমোদন দেয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় টাইমস ইউনিভার্সিটি। ফরিদপুরে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালিত হবে। চলতি মাসে এটি অনুমোদন দেয়া হয়। এর আগে নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদ দেয় সরকার। এছাড়া এর আগে গত বছরের নভেম্বরে রাজধানীতে সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি, ফেনী ট্রাঙ্করোডের বারাহিপুরে ফেনী ইউনিভার্সিটি, খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামে পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কুমিল্লায় ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সিরাজগঞ্জ জেলায় খাজা ইউনূস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের অনুমোদন দেয় সরকার । এর আগে গত বছরের মার্চে আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজধানীতে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি, রাজশাহীতে বরেন্দ বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের গোলাপগঞ্জে নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গায় ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি, কিশোরগঞ্জে ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, শরীয়তপুরে জেড এইচ সিকদার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, নারায়ণগঞ্জের হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া গতবছরের অক্টোবরে এক্সিম বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া পরিদর্শন শেষ হয়ে কিছু আবেদন জমা পড়ে আছে মন্ত্রণালয়ে। প্রতি সপ্তাহেই কিছু আবেদন পাঠানো হচ্ছে ইউজিসিতে। রাজনৈতিক বিবেচনায় আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেতে পারে এ সরকারের আমলেই। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই দক্ষ ও মানসম্মত শিক্ষক। খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে পরিচালনা করছে শিক্ষা কার্যক্রম। এ বিষয় অবহিত থাকার পরও ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের আন্তরিক চেষ্টার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ‘দন্তনখহীন বাঘ’ হিসাবেও উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ। বাস্তব অর্থে কোন ক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এসব কারণে যে সব প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ম মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে ইউজিসি কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম নামে একজন প্রার্থী জানান, প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ দেয়ার জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা বোর্ড বসেছিল। ওই বোর্ড আমাকে প্রশ্ন করেছিল, আমি কত বেতনে চাকরি করতে রাজি আছি। তারা আমার মেধা যাচাই করার কোন প্রশ্নই করল না। যে কম বেতন দাবি করেছে তাকেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। রফিকুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে মেধার দরকার নেই। এ কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভালো নয়। ২০১০ সালে ১২ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৪১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে রেড এলার্ট জারি করে। বলা হয়, ২০১১ সালের মধ্যে যারা স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে না পারবে, তাদের নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করতে দেয়া হবে না। কিন্তু রেড এলার্ট জারির দুই বছর পার হতে চললো, এখনো অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। অন্যদিকে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নিচ্ছে না সরকার। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম না মানা বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নেপথ্যে রয়েছেন সরকারের অনুসারীরা।