গাজীপুরেও জয় চায় বিএনপি

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২২:৪৩
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও জয় চায় বিএনপি। খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ জয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে এবার নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র পদেও জয় পেতে সর্বশক্তি নিয়োগ করছে দলটি। দলের নেতারা মনে করছেন, চার সিটির ফলাফলের ‘বড় ধরনের’ প্রভাব গাজীপুরেও পড়বে, তাছাড়া ওই জয়ের ধাক্কায় জোটের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও বাড়তি উত্সাহ-উদ্দীপনা কাজ করছে। স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেও চার সিটির হিসাব-নিকাশ কাজ করছে বলে দাবি করছেন তারা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও গাজীপুরের মেয়র পদে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এমএ মান্নানের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী আ.স.ম হান্নান শাহ ইত্তেফাককে বলেন, চার সিটির জয়ের পর এখন দ্বিগুণ উত্সাহ-উদ্দীপনা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এখানে জোটের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও কোনো বিভক্তি নেই, সবাই সুসমন্বয় করে কাজ করছে। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারলে মান্নান বিপুল ভোটে জয়ী হবেন বলে দাবি করে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবির পক্ষে আবারও জনরায় প্রতিফলিত হবে। বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করছেন- চার সিটিতে পরাজয়ের কারণে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জয় পেতে আওয়ামী লীগও মরিয়া। বিশেষ করে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে তারা চেষ্টা করবে। এছাড়া রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকা হওয়ায় গাজীপুরের নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকারি দল। কারণ গাজীপুরের ফলাফলের ঢেউ ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেও পড়বে। বিষয়টি মাথায় রেখে ১৮ দলও জয়ের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছে। বিএনপির এসব নেতার বিশ্বাস- খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেটের মতো গাজীপুরেও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হবে। গাজীপুরের প্রথম মেয়রও বিএনপির ঘরে নিতে পারলে মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তা সবস্থানেই ‘কমেছে’ বলে দেশবাসীর কাছে প্রতীয়মান হবে। আর যদি নির্বাচন সুষ্ঠু না হয় কিংবা সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে তাহলেও বিএনপির হারানোর কিছু নেই। এতে বরং আগামী জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবি আরো যৌক্তিকতা পাবে। এভাবে বিবেচনা করলে এই নির্বাচনে হারলেও বিএনপির লাভ, জিতলেও লাভ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘গাজীপুরেও ভোটাররা সরকারকে প্রত্যাখ্যান করবে। কারণ সারাদেশেই আওয়ামী লীগ সরকারের জনপ্রিয়তা কমেছে। শুধু চার সিটি কিংবা গাজীপুর কেন, দেশের যেখানেই এখন সুষ্ঠু নির্বাচন হবে সবখানেই সরকারি দলের পরাজয় ঘটবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই নির্দলীয় সরকারের অধীনে হতে হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গাজীপুর নির্বাচনের বিষয়ে দল ও জোট নেতাদের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নানের পক্ষে প্রতিদিনই গণসংযোগ করছেন হান্নান শাহ। এছাড়াও পালা করে ভোটারদের কাছে ছুটছেন বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী, ফজলুল হক মিলন। দলীয় সমর্থন না পেলেও দ্বন্দ্ব ভুলে সাবেক এমপি হাসান উদ্দিন সরকারও নিয়মিত মান্নানের প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা টঙ্গীর দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খান, হাসান উদ্দিন সরকারও টঙ্গী এলাকাকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। ১৮ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও নিজেদের সাধ্যমতো মান্নানের জন্য কাজ করছেন। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে গাজীপুরের ৫৭টি ওয়ার্ডে বিএনপির ৫৭টি টিম মাঠে কাজ করছে। নারী ভোটারদের সমর্থন আদায়ে প্রতি দুই ওয়ার্ডে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের একটি করে টিম কাজ করছে। স্থানীয় নির্বাচন হলেও ভোটারদের কাছে তারা সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা ও অনিয়মের কথা তুলে ধরছে। গাজীপুরের নির্বাচনের সর্বশেষ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গত শনিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সমন্বয় বৈঠক করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক এমএ মান্নান, টঙ্গীর বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি হাসান উদ্দিন সরকার উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, এই বৈঠকে আগামী ৬ জুলাই নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কর্মপরিকল্পনা করা হয়। বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান জানান, চার সিটির মত গাজীপুরেও মূলত জাতীয় ইস্যুগুলো কাজ করবে। সরকারের ব্যর্থতার হিসাব করছেন এখানকার ভোটাররাও। পদ্মা সেতু, হলমার্ক, শেয়ারবাজারের পাশাপাশি গত ৫ ও ৬ মে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঘটনারও প্রভাব দেখা যাচ্ছে গাজীপুরের ভোটারদের মাঝে। তাছাড়া গত সাড়ে চার বছরে সরকারি দলের লোকজনের নানা অনিয়মের কারণেও স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলে জানান বিএনপির এই নেতা। জানা গেছে, পাঁচদিন ‘নিখোঁজ’ থাকার পর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম গত রবিবার ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে প্রকাশ্যে গাজীপুরে প্রচারণায় অংশ নিলেও তার কর্মী-সমর্থকদের একাংশের ভোট এদিক-ওদিক হবে। এর সুযোগও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক মান্নান। এছাড়া শনিবার এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসাদ সিদ্দিকীসহ টঙ্গীর নেতাকর্মীরা মান্নানকে সমর্থন দেয়ার কারণেও মহাজোটে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। যদিও জাপার কেন্দ্র থেকে কাউকে সমর্থন দেয়ার কথা অস্বীকার করা হয়েছে। বিএনপির দাবি, গাজীপুর জাপার নেতা-কর্মীদের একাংশের ভোটও মান্নানের বাক্সে পড়বে। এদিকে, শুরু থেকেই নানা আশঙ্কা প্রকাশ করে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি করে আসছেন ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক মান্নান। বিএনপির একটি প্রতিনিধি দলও রবিবাব রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সেনা মোতায়েনের দাবির পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে বলেছে কমিশনকে। যদিও কমিশন থেকে বলা হয়েছে, সেনা মোতায়েনের মতো কোনো পরিস্থিতি এখনও হয়নি। প্রসঙ্গত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নবগঠিত। আগামী ৬ জুলাই এর প্রথম নির্বাচন।