টেন্ডার নিয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগ গোলাগুলি, শিশুসহ নিহত ২

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২২:৪৪
বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে নামকরা আলেম হবে। এ আশায় মাত্র এক মাস আগে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয় দুই ছেলে আরমান ও শান্তকে। কিন্তু রিকশাচালক বাবা সিদ্দিক আর মা আছিয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে টেন্ডারবাজ সন্ত্রাসীরা। তাদের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধের মাঝখানে পড়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছে আট বছরের নিষ্পাপ শিশু আরমান। একই ঘটনায় প্রাণ হারান যুবলীগ কর্মী সাজু পালিত। সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় নগরীর সিআরবি এলাকায় পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের সদর দফতরের সামনে সাত রাস্তার মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। রেলের প্রায় ৭০ লাখ টাকার কাজ বাগাতে বন্দুকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দু‘টি গ্রুপ। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সাইফুল আলম লিমনের অনুসারী সশস্ত্র ক্যাডাররা এ বন্দুকযুদ্ধে জড়িত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে কমপক্ষে ২০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয় বলে পুলিশ জানায়। মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় মাদ্রাসা ছাত্র দেলোয়ার হোসেন আরমান। গুলিবিদ্ধ যুবলীগ কর্মী সাজু পালিতকে চমেক হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পুলিশ নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সাইফুল আলম লিমনসহ ৫২ জনকে আটক করে। সাইফুল আলম লিমনকে পরে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সোমবার রাতে কোতোয়ালি থানার এসআই মহিবুর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। এতে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক সাইফুল আলম লিমনসহ ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৩০-৪০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আটক ৫২ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মহানগর হাকিম লুত্ফুল মজিদ নয়ন গ্রেফতার হওয়া ৫২ জনের মধ্যে ৪৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বাকি আটজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছে আদালত। সহিংসতার অর্ধশতাধিক ঘটনা বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত সাড়ে চার বছরে চট্টগ্রামের সিআরবিতে টেন্ডার জমা দেয়া নিয়ে অর্ধশতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। মূলত যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, দিদারুল আলম ও সাইফুল আলম লিমনের অনুসারীরাই এসব সহিংস ঘটনা ঘটায়। সন্ত্রাসী টেন্ডারবাজদের দাপটের কাছে সাধারণ ঠিকাদাররা ছিলেন একেবারেই অসহায়। রেল কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে না পারায় বৈধ ঠিকাদাররা টেন্ডারে অংশ নেয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। অনুমোদিত ঠিকাদাররা কাজ না পাওয়ায় বিভিন্ন কাজের গুণগত মান নিয়েও নানা মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে রেল কর্তৃপক্ষ এসব ব্যাপারে বরাবরই নীরবতা পালন করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব জোনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতি বছর এ জোনে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার কাজ হলেও তালিকাভুক্ত প্রায় ৪০০ ঠিকাদারের পক্ষে এসব কাজ পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা সন্ত্রাসীরাই শক্তির মহড়া প্রদর্শন করে এসব কাজ বাগিয়ে নেয়। টেন্ডার জমা থেকে বিরত রাখতে টেলিফোনে ভয়ভীতি দেখানো ছাড়াও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে বৈধ ঠিকাদারদের বিতাড়িত করার বিষয়টি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। কামাল উদ্দিন নামে এক ঠিকাদার ইত্তেফাককে জানান, বিএনপি সরকারের সময়ও সরকারি দলের লোকজনই রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করত। তবে টেন্ডারের দখল নিয়ে প্রাণহানির ঘটনা এবারই প্রথম ঘটল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পূর্ব জোনের টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, সরকারি কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দিদারুল আলম ও ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক সাইফুল আলম লিমনের হাতে। অভিযোগ আছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সব ধরনের টেন্ডার কে পাবেন, সেটি আগে থেকে ঠিক করে দিতেন এরা। গত সাড়ে চার বছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে যত টেন্ডার আহবান করা হয়েছে, টেন্ডার ফরম কেনা কিংবা জমাদানের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই এসব গ্রুপের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বেশ কয়েকবার রেলওয়ের কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করা, অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর একসময় নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিল বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ এর আগেরবার ক্ষমতায় থাকার সময় বাবরের নাম সন্ত্রাসী তালিকা থেকে বাদ পড়ে। তবে তার বাহিনী এখনও নগরীর একটি বিশাল এলাকাজুড়ে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। বাবরের ফাঁসির দাবিতে শ্লোগান আটক ৫২ ছাত্রলীগ কর্মী গতকাল মঙ্গলবার যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের ফাঁসির দাবিতে শ্লোগান দেন। গতকাল দুপুরে কোতোয়ালি থানা হাজত থেকে আদালতে নেয়ার পথে প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় লিমনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ কর্মীরা ‘খুনি বাবরের ফাঁসি চাই, যুবলীগ নেতা বাবরের ফাঁসি চাই’ ইত্যাদি শ্লোগান দেন। এ সময় তারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেন। তারা সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেন। নিয়ন্ত্রণহীন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ চট্টগ্রামে গত কিছুদিন ধরেই নানাভাবেই আলোচনায় আসছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নাম। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ বিলবোর্ড ব্যবসা, সিটি কর্পোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাজে বাধা দেয়া, থানায় ঢুকে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা, ওসিকে লাঞ্ছিত করাসহ নানা অপকর্মে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সমপ্রতি হেফাজতে ইসলামের এক মিছিলে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে চট্টগ্রামে আলোচনার শীর্ষে উঠে আসেন নগরীর লালখান বাজার কেন্দ্রিক যুবলীগ নেতা মাসুম। তবে মাসুমসহ যুবলীগ, ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধেই আজ পর্যন্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় নগরবাসী অনেকটাই বিস্মিত। নগরীর জিইসি মোড়ে ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করেই দায়সারা হয়েছে। সমপ্রতি সতীর্থদের ছাড়িয়ে আনতে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ওসিকে নাজেহাল করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। সর্বশেষ গত সপ্তাহে নগরীর ষোলশহর মোড়ে গাড়ি ভাংচুর করে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা। নগরীর নাসিরাবাদ শিল্প এলাকায় চাঁদাবাজির আধিপত্য নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণেই গাড়ি ভাংচুরের এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ছাত্রলীগ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চাঁদার দাবিতে ছাত্রলীগ কর্মীদের বাধার মুখে চবিতে নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা হলের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতে হয়। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের কারণে চুয়েট গত ১৫ জুন থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিয়ে দল এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করলেও অভিযুক্ত যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের স্পষ্টভাবে কোনো বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘এখানে ছাত্রলীগ-যুবলীগ বড় কথা নয়। তা আমার দেখার বিষয়ও নয়। অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে আমার যা করার আমি সেটা যথাসময়ে করব। তবে বর্তমান সময়ে মূল দায়িত্ব হচ্ছে পুলিশের। তারা সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করলে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।