তেওতা গাঁয়ের সেই মেয়েটি

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২৩:১৪
ছবির মতো সবুজ শ্যামল শোভায় ভরা একটি গ্রাম—নাম তার ‘তেওতা’। এই ‘তেওতা’ গ্রামের পাশ ঘেঁষে কল্কল্ ছল্ছল্ করে বয়ে গেছে দুষ্টু মেয়ে মেঘের নদী যমুনা। যমুনার স্বচ্ছ জলধারায় পলিমাটি উজাড় করে ভরিয়ে দিয়েছে ফুল, ফল আর ফসলের সম্ভারে। এই গ্রামের সোঁদা মাটির বুকে জন্ম নিয়েছেন মধ্যযুগের কবি ঈশান নাগর, প্রজাহিতৈষী রাজা শ্যামাশঙ্কর রায়চৌধুরী, ত্রিপুরার রাজ্যের আগরতলার মহারাজার মন্ত্রী উমাকান্ত দাশগুপ্ত, সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস লেখক রজনীকান্ত দাশগুপ্ত ও ভারতবর্ষের সংগ্রামী কংগ্রেসী নেতা কিরণশঙ্কর রায় প্রমুখ। এ গ্রামের রাজা শ্যামাশঙ্কর রায়চৌধুরীর শৈল্পিক নন্দিত সুরম্য অট্টালিকা রাজপ্রসাদ ঘিরে এক সময় ছিল কর্মচাঞ্চল্য। রাজ কর্মচারী, প্রজাদের পদভারে আর পাইক-পেয়াদারের হাঁকডাকে অষ্টপ্রহর ছিল মুখরিত। নবরত্ন দোলমন্দিরে সকাল-সন্ধ্যা বেজে উঠতে কাঁসর ঘণ্টা। কাঁসর ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ছুটে আসতো মন্দির প্রাঙ্গনে। পুরোহিতের কাছ থেকে দু’হাত ভরে ভোগের সামগ্রী নিয়ে আনন্দে ফিরতো ঘরে। বৃহত্তর ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার (বর্তমান মানিকগঞ্জ জেলার) শিবালয় থানার ‘তেওতা’ গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী সেন পরিবারের বাসিন্দা বসন্তকুমার সেনগুপ্ত। বসন্তকুমার সেনগুপ্তের প্রথম পত্নী আঙুরিদেবীর ঘরে কোনো সন্তান না হওয়ার দরুণ গিরিবালা দেবীর সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হন। বিয়ের কিছুদিন পর ১৩১৬ সালের ১৭ বৈশাখ (১৯০৯, মে) মা-বাবার-ঘর উজ্জ্বল করে ভূমিষ্ট হন ‘তেওতা’ গাঁয়ের দুলি নামের একটি মেয়ে। দেরীতে হলেও মা-বাবার আশা পূরণ হয়েছে বলে কন্যা সন্তানের নাম রাখলেন—আশালতা সেনগুপ্তা। আশালতা দেখতে ছিলেন চাঁপাকান্তি রূপ-লাবণ্যে প্রতিমার মতো অপরূপা। মা-বাবা আদরে করে ডাকতেন কখনও দোলন আবার কখনও দুলি নামে। দু’মায়ের একমাত্র কন্যা সন্তান। আদর সোহাগের কোনো কমতি নেই। এক মায়ের বুকে মাথা রেকে আরেক মায়ের কোলে তুলতুলে পা রেখে পরম সুখে ঘুমিয়ে পড়েন ছোট্ট মেয়েটি। আবার ঘুম থেকে জেগে ওঠে ফোকলা দাঁতে খিলখিল হাসিতে মায়েদের মন আকুল করে তোলেন। মা একমাত্র আদুরের মেয়েটির কচি দু’হাত ধরে ঝুলিয়ে ছড়া কাটেন : ‘ঝুলে ঝুলেরে/যাবে মায়ের কোলেরে’। ছোট্ট মেয়ে দুলি এক মায়ের কাছ থেকে আরেক মায়ের কাছে যেতে বাড়িয়ে দেয় সুন্দর কচি দুটি হাত। পরিবারের আদর সোহাগে ‘তেওতা’র ধুলোবালি, কাদা-মাটিতে বেড়ে ওঠেন দুলি। খেলার সাথীদের নিয়ে টইটই করে ঘুরে বেড়ান বন-বাদাড়ে। আম-জাম, বেতস, করমচা কুড়িয়ে ফ্রকের কোচড় ভরে ফিরেন ঘরে। আবার কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ শুনে এক দৌড়ে ছুটে যান রাজবাড়ির নবরত্ন দোল মন্দিরে। পুরোহিতের কাছ থেকে ভোগের সামগ্রী তুলে নেন দু’হাত ভরে। সন্দেশ, বাতাসা খেয়ে গাঁয়ের জামায় হাত মুছে শোনেন কীর্তন কিংবা ভক্তিগীতি। খেলার সাথীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছুটে যান গাঁয়ের তেমাথা রাস্তার ধারে। বরইগাছের মগডালে চড়ে কাঁটার সঙ্গে লাল মরিচ গেঁথে দিয়ে এসে সাথীদের চিত্কার করে ডেকে বলেন, ‘ভট্টু, ওই দেখ বরই গাছে লাল লঙ্কা ধরেছে।’ খেলার সাথীরা দুলির দুষ্টুমী না বুঝে অবাক হয়ে পড়ে। ‘তেওতা’ গ্রামের চপলা-চঞ্চলা শ্যামলাবতী দুলি নামের মেয়েটি খেলার সময় খেলে। কিন্তু স্কুলের সময় হলে খেলা ফেলে ঠিকই বই হাতে নিয়ে যায় স্কুলে। স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফিরে এসে খেতে না খেতে স্টিমারের হুইসেল শুনে যমুনার পাড়ে দে ছুট। এমনিভাবে খেলাধুলায় আনন্দে আহ্লাদে দিন কাটতে থাকে দুলির। দুলির বাবা বসন্তকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের নায়েব। কর্মস্থল ত্রিপুরায় তাঁর আকস্মিকভাবে মৃত্যু হয়। এতে সংসারে নেমে আসে দুঃখের কালো ছায়া। দুলিদের দেখাশোনা করার মতো গ্রামে তেমন কোনো অভিভাবক নেই। যার দরুণ বড় মা আঙুরি দেবীকে ‘তেওতা’য় রেখে মা গিরিবালা দেবীর সঙ্গে চলে যান কাকা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের বাসায়। কাকা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন কুমিল্লায় কোর্ট অব ওয়ার্ড-এর ইন্সপেক্টর। তিনি সপরিবারে এই কান্দিরপাড়ের বাসায় বসবাস করতেন। দুলি কাকার বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে থাকেন ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে। দুলি পড়াশোনায় ছিলেন যেমন মনোযোগী, তেমনি উত্সাহী ছিলেন সাহিত্য-সংগীত চর্চায়। কুমিল্লার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দুলি ও তাঁর কাকাতো বোন কমলাদেবী বাচ্চি সংগীত পরিবেশন করে দর্শক শ্রোতাদের মন জয় করতে সক্ষম হন। দুলির কাকাতো ভাই বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন ঈশ্বর বিদ্যালয়ের একজন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। তাঁর অনুপ্রেরণায় দুলি লেখাপড়া আর সংগীত চর্চায় মুখর হয়ে ওঠেন। বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত একসময় গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দেন। ভাইয়ের সান্নিধ্যে থেকে দুলিও স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েন। ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী দুলি স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি একাত্ব ঘোষণা করে পড়াশোনা ছেড়ে স্কুল ত্যাগ করেন। ‘তেওতা’-র প্রখ্যাত এই সেন পরিবারের মধ্যে যেমন ছিল রাজনীতি সচেতনতা, তেমনি ছিল শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি আবহে ভরপুর। রাজনীতির কারণে স্কুল ছেড়ে দিলেও দুলি বাড়ির অন্দর মহলে ভাই বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের কাছে লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়োজিত ছিলেন রবীন্দ্র সংগীত চর্চায়। দুলির মা গিরিবালা দেবী ও কাকিমা বিরজাসুন্দরী দেবী এঁরাও ছিলেন সাহিত্য অনুরাগী। ১৯২১ সালে নিয়তির টানে কাজী নজরুল পুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খানের সঙ্গে কুমিল্লায় দৌলতপুরে বেড়াতে আসেন। আলী আকবর খানের স্কুল জীবনের সহপাঠী ছিলেন বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত। যাত্রাবিরতিতে আলী আকবার খান কবি নজরুলকে নিয়ে চার-পাঁচদিন অবস্থান করেন বীরেন্দ্র কুমার সেনগুপ্তের কুমিল্লার কান্দিরপাড় বাসায়। এই সময় দুলির সঙ্গে নজরুলের প্রথম পরিচয় হয়। দুলির সুরেলা কণ্ঠে গান শুনে অভিভূত হন কবি নজরুল। আর কবি নজরুলের মায়াবী চেহারা, ডাগর ডাগর সুন্দর চোখ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, মন ভোলানো অট্টহাসিতে সেনপরিবারের সবাই হন মুগ্ধ। কবির সঙ্গে সেন পরিবারের গড়ে ওঠে এক মধুর সম্পর্ক। নজরুল চার-পাঁচ দিন সেনপরিবারে থাকার পর আলী আকবর খানের সঙ্গে চলে যান দৌলতপুরে। কিছুদিন পর নজরুল বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের সঙ্গে বেড়াতে এসেছেন দুলির জন্মস্মৃতি ‘তেওতা’ গ্রামে। ‘তেওতা’র স্মৃতির রেখায় কবি লিখেছেন, হারাছেলের চিঠি, ‘ছোট হিটলার’ কবিতা। ১৯২৪ সালের ২৫ শে এপ্রিল মানিকগঞ্জের তেওতার মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে দোলন দেবী দুলির সঙ্গে বাঁধনহারা কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন সুখের নীড়। সেই থেকে দুলি ছন্নছাড়া কবিকে ছায়ার মতো রেখেছেন ঘিরে। কবির সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে, অসুখে-বিসুখে দুলি ছিলেন চিরসাথী। আর যাযাবর কবি দুলির ওপর সংসারের ভার ছেড়ে দিয়ে মেতে ওঠেন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। কবি যেকোনো নতুন গান কিংবা কবিতা রচনা করে আগে শোনাতেন দুলিকে। দুলির রূপে-গুণে মুগ্ধ হয়ে কবি সৃষ্টি করেছেন গানের এক নতুন রাগ ‘দোলনচাঁপা’। শুধু তাই নয়—একটি অমর কাব্যগ্রন্থের নামকরণও করেছেন ‘দোলন চাঁপা’। সুখী-সুন্দর দাম্পত্য জীবনে দুলির ঘরে জন্ম লাভ করেন আজাদ কামাল (কৃষ্ণ মোহাম্মদ) (১৯২৪, ডিসেম্বর জন্মের কিছুদিন পরপরই তাঁর মৃত্যু ঘটে। তারপর ১৯২৩ সালে ৮ মে জন্ম লাভ করেন দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম খালেদ বুলবুল। তিনিও অকালে মারা যান ১৯৩০ সারের ৮ মে। ১৯২৮ সালে কাজী সব্যসাচী ও ১৯৩০ সালে কাজী অনিরুদ্ধ জন্ম লাভের ফলে দুলি ও কবি কিছুটা হলেও সন্তানহারা বেদনা ভুলে সান্ত্বনা লাভ করেন। নজরুলের জীবনে দুলি ছিলেন আশীর্বাদস্বরূপ। কবির সুখে-দুঃখে যুগিয়েছেন সান্ত্বনার বাণী। কবির উন্মুল সংসারের শক্ত হাতে ধরেছেন হাল। দুলি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিনী। সাংসারিক জীবনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নিজেও করেছেন সাহিত্যে সাধনা। দুলির বিভিন্ন লেখায় ঘটেছে তাঁর জীবনের ছায়াপাত। দুলির লেখা ‘শঙ্কিতা’ ও ‘করুণা’ নামক দুটি কবিতা সাম্যবাদী পত্রিকায় প্রকাশিত হলে সুধী মহলের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। এই মহিয়সী নারী ১৯৩৭ সালে আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তাঁর শরীরের কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায়। তিনি বিছানায় শয্যাশায়িত হয়ে পড়লে কবি নজরুল দিশেহারা হয়ে পড়েন। দুলির চিকিত্সার জন্য কবি মরিয়া হয়ে পড়েন। তাঁর লেখা বইয়ের স্বত্ব বিক্রি করে দিয়ে চিকিত্সার জন্য ডাক্তার, কবিরাজ, হেকিম, বৈদ্য এদের কাছে ছোটাছুটি করতে থাকেন। কিন্তু কোনো ওষুধে কোনো কাজ হলো না। কবি নজরুলও ১৯৪২ সালে ৯ জুলাই কলকাতা বেতারে ছোটদের এক অনুষ্ঠানে কথিকা পাঠ করার সময় হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর কবি একসময় নির্বাক হয়ে যান। দুলি শয্যাশায়িত অবস্থায় কবিকে করতেন সেবাযত্ন। শুইয়ে শুইয়ে খাইয়ে দিতেন নিজ হাতে। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন এই মমতাময়ী নারী আশালতা সেনগুপ্তা দুলি সকল কর্মের অবসান ঘটিয়ে ত্যাগ করেন শেষ নিঃশ্বাস। দুলির ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় চুরুলিয়ার মাটিতে। ‘তেওতা’-র মেয়ে দুলি ‘প্রমীলা’ নামে চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন আমাদের মাঝে। দুলি মানিকগঞ্জের মেয়ে, তেওতার মেয়ে, এজন্য আমরা পুলক অনুভব করি।