আমার কথা

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২৩:১৪
আমার লেখালেখির শুরুটা বেশ ছোটবেলা থেকেই বলা যায়। যখন আমি ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি। বেশিরভাগ মানুষের ছড়া দিয়ে লেখালেখির শুরু। কিন্তু আমার যতদূর মনে পড়ে আমার গল্প লেখা দিয়েই শুরু। প্রথম লিখি “রচনা লেখার ফ্যাসাদ”। মনে হয় রচনা লেখার ব্যাপারে অনেকবারই ঝামেলায় পড়েছি, সেই কারণেই হবে লেখনি বিভ্রাটে রচনাই এসে যায়। গরুর রচনাকে টেনে নিতে নিতে - কাঁঠালের আত্মকথা, আমাদের স্কুল, মায়ের ভালোবাসা, পুষ্টিবিদ্যা বিভিন্ন অনুষঙ্গ চলে আসে। গরুর রচনা আর গরুর মধ্যে থাকে না। পরের গল্পটি ছিল এক হিংসুটে রাজকুমারীকে নিয়ে। তাকে এক যাদুকর অভিশাপ দিয়ে টিকটিকি করে দেয়। আর পরিণতি স্বরূপ তার লেজ খসে পড়া। নাম ছিল “টিকটিকির লেজ খসে কেনো”। অল্প বুদ্ধিতে ভয়ঙ্করি লেখা লিখতাম। এর পরে আসে ছড়া/কবিতা লেখার পালা। প্রথম লেখা ছাপা হয় দেয়াল পত্রিকায় ১৯৬৬-৬৭ ঐ সময়। ১৯৬৭ সালে “সুকতারা” সংকলনে ঐ “রচনা লেখার ফ্যাসাদ” ছাপা হয়। তারপর থেকে দৈনিকে বেশ অনেক লিখেছি। বাবা রেলওয়েতে ছিলেন, পেপার পেতেও অসুবিধা হয়নি, লেখা পোস্ট করতেও অসুবিধা হয়নি। আমার মায়ের ভীষণ সখ ছিল লেখাপড়ার পাশাপাশি এমন সৃষ্টিশীল কাজে আমরা জড়িয়ে থাকি। তাঁর মামা প্রফেসর মনসুর উদ্দীন লোকসাহিত্য গবেষক ছিলেন। “হারমনি” তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ। লালনের ওপর তিনি লিখেছেন। ছোট্টবেলা থেকেই দেখেছি তাঁকে। আমার খালা সাহিত্যিক হাজেরা নজরুল। তাঁকেও পেয়েছি। আমার ছোট দু’বোন আরো একজন খালা অনেকেই লেখালেখির সাথে জড়িত। তার কিছুটা প্রভাব হয়তো ছিল। তখন লিখতাম তাহমিনা খানম তানু নামে। কাগজের পাতায় প্রায়ই লেখা ছাপা হতো। নিজের নামটি পত্রিকায় দেখে দেখে আশ মেটতো না। আরো লিখতাম। এমনও দিন গেছে ২/৩টা লেখা সপ্তাহে থাকতো। অনেক পত্রিকায় লিখতাম। সংবাদের “খেলাঘর”, পূর্বদেশের “চাঁদের হাট,” আজাদের “মুকুলের মহফিল”, ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসর, দৈনিক বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা”, বাংলার বাণীর - “শাপলা কুড়ির আসর”, চরমপত্রের- “সৃষ্টিসুখের উল্লাসে” ইত্যাদি ছোটদের পাতায় লিখেছি। লাবনী, সুধা, ললনা এগুলোতেও লিখেছি। ষাট দশকের শেষদিক এবং সত্তর দশকের প্রথম দিকে যারা আমার সাথে লিখতো বন্ধু খালেক বিন জয়েন উদ্দীনসহ ওরা সবাই আজ সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক। তারা সবাই আমার চেয়েও অনেক ওপরে লেখায় এবং বই প্রকাশের সংখ্যায়। আমি সত্যি আনন্দিত তারা সবাই প্রতিষ্ঠিত লেখক। ছোটদের জন্য লিখে আজোও আমি ভারি আনন্দিত। ফিরে যাই সেই শৈশবে। মনে পড়ে এই তো সেদিন ১৯৭২ এর ডিসেম্বর হবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে “বই পড়া” এর ওপরে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হয়। ক, খ, গ তিনটি শাখার মধ্যে ক শাখাতে আমি প্রথম হই। সে যে কি আনন্দ! অনুষ্ঠানটি হয়েছিল বাংলা একাডেমীর সামনের চত্বরে প্যান্ডেল সাজিয়ে। তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলীর হাত থেকে পুরস্কৃত হয়েছি। বেশ অনেকগুলো বই। ঐ অনুষ্ঠানে কবি নজরুল ইসলামের পুত্র সব্যসাচী কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। ১৯৬৬-৭৫ পর্যন্ত ছোটদের পাতায় লেখালেখির গতিময়তা ছিল। পরবর্তীতে কিছুটা সময় নীরবই ছিলাম। আবার সরব হয়েছি মনের তাগিদে। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, শিশুতোষ ছড়া, কিশোর গল্প, নাটক, টেলিফিল্ম সবকিছুই লেখার চেষ্টা করি। শিশুতোষ লেখা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমাদের শৈশব ছিল মাটি-কাদা চাঁদ-আকাশ জোনাক ফুল-পাখি লতা-পাতার সাথে। পুকুরে সাঁতার কাটা, পেয়ারা চুরির সেই দিনগুলো। বৃষ্টির দিন পেয়ারার পাতলা ডালগুলো পিছলা হয়ে থাকতো। শান্তিনগরের সেই নানাবাড়ির একতলা বাড়ির ছাদ থেকে পেয়ারা গাছে ভর দুপুরে বৃষ্টির দিনে। কি যে সংঘাতিক ছিল। এখন মনে হলে গা শিউরে ওঠে। এই বয়সে কত যে দুষ্টুমি করেছি। গাছ বাওয়া মেয়ে ছিলাম। গাছে উঠে পেয়ারা, জামরুল, লিচু, কাঁঠালের মুচি, কাঁচা আম কত যে পেড়েছি। নানীবড়ির সেই রকম পেয়ারা গাছ চোখে পড়ে না। বিশাল ডালপালা নিয়ে গাছটির বিস্তার। ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে অনেকগুলো ডাল গড়িয়ে পড়তো। ওটাতেই ঝুলতে ঝুলতে গাছ বেয়ে বেয়ে পেয়ারা পাড়তাম আর গাছে বসেই আমরা খেতাম। ঢাকা শহরেই জন্ম আমার কিন্তু গ্রামের সোঁদা গন্ধে ভরপুর ছিল আমাদের শৈশব। ঢাকার শান্তিনগরে নানা বাড়িই আমার জন্ম, শিশুবেলা কয়েক বছর ভৈরবে। তারপর ঢাকাতেই। গাছপালায় ভরপুর ছিল শহর। আমরা যখন সবুজবাগে নিজেরা বাড়ি করে চলে আসলাম ১৯৬১-৬২ হবে। তখনও শেয়াল ডাকতো সন্ধ্যা হলে। আমাদের হাঁসমুরগির ঘরগুলো সন্ধ্যা হলেই শক্ত লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো। প্রথম প্রথম কত হাঁস-মুরগি ওদের পেটে গেছে। শান্তিনগরে নানাবাড়িতে গরু পালতেন নানা। সেই ফেনাতোলা দুধ জাল দিয়ে গরম গরম আমাদের খাওয়ানো হতো। আর যে মোটা পুরু সর পড়তো দুধের হাড়িতে তা দিয়ে আমার মা ঘি তৈরি করে দিতেন। খুব মজা করে ঘি দিয়ে ভাত খেতাম। সেই সুগন্ধ এখনও মনে পড়ে। মনে পড়ে যুদ্ধের সময়ের দিনগুলো। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আমাদের বাসা থেকে ওষুধ-খাবার দেওয়া হতো। মামা-খালারা দিতেন। সেই রাতে শান্তিনগরের সেই বাড়িতে পাকসেনারা হানা দিয়েছিলো। আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছি। সময় গড়িয়ে যায়। লেখার তাগাদা ভেতর থেকেই আসে। যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করি লিখতে। সময় পেলে কিছুক্ষণ পড়ি। গল্প, কবিতা, কিশোর গল্প, শিশুতোষ ছড়া, উপন্যাস সব মিলিয়ে অতি সামান্যই বই এর সংখ্যা, প্রায় ২৩টি হবে। আরো জমা আছে- কয়েকটা পান্ডুলিপি। কিশোর গল্প এবং ছড়া। তখন-এখন এর মধ্যে মস্ত বড় তফাত্। চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে তেমন ফারাক ছিল না। আমরা অল্পে তুষ্ট ছিলাম। ছোট্ট ছোট্ট চাওয়া-পাওয়ায় ভরে যেতো আমাদের ছোট্ট তরী এই জীবন। অনেকগুলো ভাইবোনের সংসারে আমরা মায়া-মমতা ভালোবাসায় বড়ো হয়েছি।