নাচ, গান আর গম্ভীরায় ৩ দিনব্যাপী আম উত্সব অনুষ্ঠিত

আপডেট : ২৬ জুন ২০১৩, ২০:১২
এ নিয়ে ৬ষ্ঠ বার হলো। রাজশাহীর সব ঐতিহ্য নিয়ে এবারও আয়োজন হলো বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক উত্সব ও মেলার। আম, রেশম ও সিল্ক; রাজশাহী এই তিন ঐতিহ্যকে নিয়ে এবার বাংলালিংকের পৃষ্ঠপোষকতায় আমরা রাজশাহীবাসীর আয়োজনে ৬ষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো তিন দিনব্যাপী এই উত্সব। এবারের উত্সব অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহীর নগর ভবনে। এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণেই আমরা ১০ জনের একটি দল রওয়ানা হই রাজশাহীর উদ্দেশ্যে। অনুষ্ঠানটির প্রথম দিন ছিল ২০ জুন, এদিন বিকেলের দিকে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক আগ মুহূর্তেই হাজির হই অনুষ্ঠানস্থলে। আগে থেকেই নগর ভবন যেন এক আনন্দ উত্সবের সাজে সেজে প্রস্তুত। অনুষ্ঠানস্থলের চারিপাশ সাজানো হয়েছিল রেশম, সিল্কসহ স্থানীয় নানা ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প। আর পুরো এক পাশ জুড়ে ছিল রাজশাহীর নানা জাতের আম। সব মিলিয়ে আমের জাতের নামই ছাড়াবে অর্ধশত সংখ্যাকে। অধিকাংশ মানুষেরই ভিড় ছিল আমের স্টলগুলোতে। যদিওবা এই স্টলগুলোর কোনো আমই বিক্রির জন্য নয়, শুধুমাত্র প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যেই। তবে রেশম ও সিল্কের পণ্যগুলো প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিক্রির জন্যও ছিল। অনুষ্ঠান শুরু হতে আরও প্রায় দু ঘণ্টা বাকি। সবাই এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছিল, তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো প্রায় সবার হাতেই ছিল ক্যামেরা। নগর ভবনের সাজানো-গোছানো সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানগুলোতে দাঁড়িয়ে যে যার মতো ফটোসেশনে মেতে উঠেছে। আরেকপাশ থেকে দেখা যাচ্ছে, যারা সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ নিবেন তারা প্রস্তুত হচ্ছেন। প্রস্তুতি শেষে তারাও স্টলগুলোতে ঘুরে ফিরে দেখছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো... তখনই ডাক পড়ল অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার। সময় মতোই হাজির হলেন প্রধান অতিথিসহ অন্যান্যসব অতিথিরা। প্রধান অতিথি ফিতা কেটে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এরপর অনুষ্ঠানে আগত সবাই অংশ নেয় বর্ণাঢ্য র্যালিতে। নগরভবনের আশপাশের এলাকায় র্যালিটি প্রদক্ষিণ করে আবার নগর ভবনে এসেই শেষ হয়। এরইমাঝে শুরু হয়ে যায় অতিথিবৃন্দ ও আলোচকদের আলোচনা অনুষ্ঠান। ঘণ্টাব্যাপী চলে এই আলোচনা, তারপর শুরু হয় সবার কাঙ্ক্ষিত সেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আলোচকদের আলোচনা থেকে জানা যায়, এই উত্সব মূলত তিনটি প্রধান পণ্যের পুনঃউপস্থাপন, যেগুলো বাঙালির চিরকালের সাংস্কৃতিক গৌরব। আম বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিণ অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ঋতুভিত্তিক মূল্যবান ফল যা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মেলার ৩ দিনে আমের শত শত নমুনা প্রদর্শিত হয়। এসব আমের বেশিরভাগ সরাসরি কেটে খাওয়ার জন্য; তবে এসবের পাশাপাশি আরও আম রয়েছে যেগুলো বিশেষভাবে জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনী ইত্যাদি তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়। রাজশাহীর রেশম হচ্ছে—রেশমের গুটি থেকে জাত অসামান্য মসৃণ এক বস্ত্র-উপাদান যা সেরিসিন নামের প্রোটিনে আবৃত থাকে। প্রধানত তিনধরনের রেশম পাওয়া যায়-মালবেরি সিস্ক, এরি (এন্ডি) এবং তসর সিল্ক। এসবের মধ্যে মালবেরি সিল্ক হচ্ছে সবচেয়ে মসৃণ এবং একারণে এর দাম সবচেয়ে বেশি। রাজশাহী সিল্কের তৈরি শাড়ি ও অন্যান্য পণ্যের প্রতি আগ্রহ ও অনুরাগ শুধু এ দেশীয় মানুষের মধ্যেই ব্যাপক নয়, একইসঙ্গে বিশ্বজুড়েই রয়েছে এর বিপুল চাহিদা। রাজশাহীতে রয়েছে বিপুলসংখ্যক রেশম ইন্ডাস্ট্রি ও একটি রেশম গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এই অঞ্চলেই দেশের সিংহভাগ রেশম উত্পাদিত হয়। প্রায় ১ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতে নিজেদের পেশা গড়েছেন। আর এই বিপুল কর্মজীবী মানুষের সংখ্যাই দেশে রেশম খাতের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। আলোচনাপর্ব শেষেই শুরু হয় কাঙ্ক্ষিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই পর্ব শুরু হতে না হতেই নগর ভবনের চারপাশ ভরে যায় সাংস্কৃতিক অনুরাগীদের কোলাহলে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্বেই আম, সিল্ক ও রেশমের উপর ভিত্তি করেই। প্রতিটি গানও সাজানো হয়েছে এসবের উপর। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাউলা সুরে টান দিতে না দিতেই এলাকাবাসীও ওই শিল্পীর সঙ্গে কণ্ঠ মেলায়। গানের সুর ছুঁয়ে যায় উপস্থিত প্রতিটি প্রাণকে। এরপর শুরু হয় নৃত্যানুষ্ঠান। এই পর্বে একাধিক দল নৃত্য পরিবেশন করেন। প্রথমদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নৃত্য পর্বে বিমূর্ত সাংস্কৃতিক দলের নাচ সবাইকে মুগ্ধ করে। এই নৃত্যদলটি টানা তিন দিন ধরেই ছিল প্রশংসা পেয়েছে। এরপর শুরু হয় রাজশাহীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গম্ভীরা। বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের লোক গান নিয়ে এই গম্ভীরা। এই সংগীত দেশের পশ্চিম অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গীতি। গানে প্রধানত দুটি চরিত্র প্রধান ভূমিকা পালন করে। এদের একজন নানা, যিনি পেশায় একজন কৃষক এবং অন্যজন হচ্ছেন নাতি, যে একজন রাখাল। তারা গানে গানে রসিকতা করে এবং এর মধ্যদিয়ে তারা মানুষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করে। উত্সবের সব আয়োজনকে ঘিরেই বিপুল সংখ্যক মানুষের ব্যাপক আগ্রহ ও সাড়া দেখা যায়। প্রতিদিনই গম্ভীরা ছিল উত্সবের সেরা চমক, তাই এই পর্বটি প্রতিদিন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পূর্ব মুহূর্তেই মঞ্চস্থ করা হতো। এই উত্সব আনন্দে সমবেত হওয়ার জন্য সারাদেশের শতশত আম গবেষক, রেশম গবেষণায় বিশেষজ্ঞ ও গম্ভীরা গানের সুবিখ্যাত শিল্পী ও বাউলরা উত্সবে সমবেত হয়ে বিভিন্ন উপস্থাপনায় অংশগ্রহন করেন। আর এর ফলে উত্সব এক বহুমাত্রিক অবয়ব পায়, যাতে সমাজের নানা পর্যায়ের মানুষের জন্যেই থাকে বিনোদনের অফুরন্ত ভাণ্ডার। দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ রাজশাহীর নগরভবনে জড়ো হয়ে এই বর্ণাঢ্য উত্সবে অবগাহন করে। এই উত্সবে অংশ নিয়ে উপলব্ধিতে এসেছে, বাঙালির উত্সব নিছক বিনোদন নয়, একাত্মতা প্রকাশের ক্ষেত্র। উত্সবের মাঝ দিয়েই প্রকাশ হয় তাদের মনের ইচ্ছেগুলো। এমনই একটি ইচ্ছে রাজশাহীবাসীর যেন গম্ভীরাকে সারাদেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায়। আর এই উদ্যোগে এগিয়ে আসবে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সবাই—এটাই তাদের আশা। আর এভাবেই শেষ হয় ৩ দিনব্যাপী বাংলালিংকের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজশাহীর বছরের সেরা আয়োজন আম, সিল্ক ও রেশম উত্সব।