খুলনা জেলায় চিংড়ির উত্পাদন হ্রাস পেয়েছে। গত বছর উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এ জেলায় প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকার চিংড়ি কম উত্পাদন হয়েছে। এজন্য চাষিরা ক্ষেতে সময়মত পানি না পাওয়া, এনজিও কর্মীদের লবণ পানি বিরোধী প্রচারণা ও চিংড়িতে ভাইরাস আক্রান্ত হওয়াসহ নানাবিধ কারণকে চিহ্নিত করেছেন মত্স্য কর্মকর্তারা। এদিকে উত্পাদন কমে যাওয়ায় সাদা সোনা হিসাবে খ্যাত চিংড়ি চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন চাষিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে কয়টি খাত রয়েছে চিংড়ি তার মধ্যে অন্যতম। দেশের মোট চিংড়ি উত্পাদনের সিংহভাগই খুলনা অঞ্চলে হয়ে থাকে। গত অর্থবছরে (২০১২) খুলনা মেট্রোপলিটন সিটিসহ জেলার নয় উপজেলায় ১৩ হাজার ৪৯৭ টন বাগদা চিংড়ি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে অর্জিত হয়েছে ১০ হাজার ৩৮০ টন চিংড়ি। অর্থাত্ গত বছর লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৩ হাজার ১১৭ টন চিংড়ি কম উত্পাদন হয়েছে। যা টাকার অংকে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা কম। একই বছর গলদা চিংড়ি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ হাজার ১২০ টন। সেখানে উত্পাদন হয়েছে ৮ হাজার ৯০৫ টন। এখানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১৫ টন চিংড়ি কম উত্পাদন হয়েছে। যাতে টাকার ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। সব মিলে গত বছর প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকার চিংড়ি কম উত্পাদন হয়েছে। উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার জন্য সময়মত ক্ষেতে পানি দিতে না পারা, চাষিদের অনভিজ্ঞতা ও চিংড়ি ভাইরাস আক্রান্ত হওয়াকে দায়ী বলে মনে করছেন মত্স্য কর্মকর্তারা।
এদিকে, চলতি বছর খুলনা জেলায় বাগদা চিংড়ি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার ৫০৯ টন। এছাড়া গলদা চিংড়ি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৯২৮ টন। তবে এবছরও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফিস ফার্ম ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ফোয়াব) সভাপতি মোল্লা শামসুর রহমান শাহীন বলেন, চিংড়ি চাষের জন্য খামারিরা (চাষি) ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ, চিংড়ি চাষ সম্পর্কে অপপ্রচার ও চিংড়ি চাষের জন্য সহায়ক নীতিমালা না থাকার কারণে চিংড়ি চাষ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক নীতিমালা বাস্তবায়ন ও চিংড়ি চাষিদের ভর্তুকি দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।
সূত্র মতে, খুলনা জেলায় বর্তমানে বাগদা চিংড়ি চাষির সংখ্যা ৩৪ হাজার ৭৭২ জন ও গলদা চাষির সংখ্যা ২৪ হাজার ৫৭১ জন। এছাড়া রেজিস্ট্রেশনকৃত বাগদা চিংড়ি ঘেরের সংখ্যা ২৪ হাজার ২১১টি এবং গলদা ঘেরের সংখ্যা রয়েছে ৩৫ হাজার ৫৪৫টি। বর্তমানে ৩৭ হাজার ১১২ হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ি ও ১৫ হাজার ২২৮ হেক্টর জমিতে গলদা চিংড়ি চাষ হচ্ছে।
জেলা মত্স্য জরিপ কর্মকর্তা বিধান চন্দ্র মন্ডল জানান, দেশের অধিকাংশ নদী পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। যে কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে চাষিরা মত্স্য ঘেরে সময় মত পানি তুলতে পারছেন না। এছাড়া অসংখ্য বাগদা চিংড়ির ঘেরে লবণ পানি উত্তোলনের ঘটনায় মামলা থাকায় চাষিরা সেখানেও পানি তুলতে পারছেন না। তাছাড়া জমির মালিকানা বিরোধের কারণে জমি কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় মত্স্য ঘেরের আয়তন ছোট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে লবণ পানি বিরোধী ইস্যু নিয়ে কয়েকটি বেসরকারি এনজিও সংগঠনের প্রচারণায় চিংড়ি চাষে চাষিরা উত্সাহ হারাচ্ছে। কিছু কিছু চাষির অনভিজ্ঞতার কারণে চিংড়ি ভাইরাস আক্রান্ত হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ওই চাষি পুনরায় চিংড়ি চাষ করতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে চিংড়ি চাষে চাষিদের মধ্যে অনাগ্রহ সৃষ্টি হওয়ার কারণে উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে না।
