যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তাদের শাস্তি কার্যকর নিয়ে সরকারের দোদুল্যমানতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। গতকাল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, সরকার ভোটের রাজনীতির জন্য জামায়াত ও হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সমঝোতা করছে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের অস্তিত্বের স্বার্থে এ সরকারের শাসনামলেই যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানান বক্তারা। বক্তারা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর না হলে সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তির ভোট হারাবেন। তরুণদের ভোট হারাবেন।
গতকাল ধানমন্ডির ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে আয়োজিত স্মরণসভায় শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার ও ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। সূচনা বক্তব্য রাখেন নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান করা হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের খসড়া রচয়িতা ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও বেশ কয়েকটি মাইলফলক রায় প্রদানকারী বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের পক্ষে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন তার কন্যা তানিয়া আমীর। আর সংগঠন হিসাবে এ পদক প্রদান করা হয় গণজাগরণ মঞ্চকে। গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে এ পদক গ্রহণ করেন মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার। সবার হাতে পদক তুলে দেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর।
বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, ভবিষ্যত্ প্রজন্ম শহীদ জননী জাহানারা ইমামের প্রেরণায় স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে¬—এটাই প্রত্যাশা। মুক্তিযোদ্ধারা যে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন তা যেন স্বপ্নই থেকে না যায়। তাহলে তাদের রক্তের ঋণ আমরা কখনোই শোধ করতে পারবো না।
শাহরিয়ার কবির বলেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ব্যক্তির পাশাপাশি মৌলবাদী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
মুনতাসীর মামুন বলেন, এ সরকারের শাসনামলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর না হলে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তির ভোট হারাবেন। তরুণ প্রজন্মের ভোট হারাবেন।
শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসে তাহলে তারা চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের হত্যাযজ্ঞকে হার মানাবে।
ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শেষ হয়ে যায়নি। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত ও কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে।
ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, জামায়াত ইসলামীকে যে কোন অবস্থায় নিষিদ্ধ করা দরকার। যে দল বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না— তাদেরকে কোনভাবেই বৈধতা দেয়া চলে না।
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুদ্ধাপরাধের বিচার দ্রুতই স্বল্পসময়ে শেষ হয়েছে। আমাদের দেশের বিচার প্রক্রিয়াকে কেন এত দীর্ঘ করা হচ্ছে! এটা বিচারের নামে প্রহসন। যা আমরা দেখতে চাই না।
বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, রাজধানীর শাহবাগে ‘প্রজন্ম চত্বরে’ শহীদ জননীর ছবি সম্বলিত বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানান ছাত্র-তরুণ-জনতা।
গতকাল জাহানারা ইমামের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যাগে অস্থায়ী বেদী নির্মাণ করা হয়। সকাল ৮টায় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকরা। এরপর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের পক্ষে কে এম শফিউল্লাহ, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী প্রমুখ।
শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ফ্রন্ট, ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, লালন চর্চাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।
এছাড়া জাহানারা ইমামের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শাহবাগে গতকাল বিকালে দেশাত্মবোধক ও জাগরণী গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা। আর সন্ধ্যায় প্রজ্বলিত হয় ‘মঙ্গল প্রদীপ’।
