জমে উঠেছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বিরামহীন প্রচারণায় দুই প্রধান জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী। তাদের পক্ষে প্রতিদিনই গাজীপুরে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ-বিএনপির শীর্ষ নেতারা। দলের কেন্দ ীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উভয় দলের কেন্দ ীয় নেতারা প্রতিদিনই ঢাকা থেকে গিয়ে পালা করে গণসংযোগ করছেন। গতকাল বুধবারও ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এডভোকেট আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমদ এবং ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নানের পক্ষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান প্রচারণা চালিয়েছেন। তাদের সঙ্গে দলের কেন্দ ীয় একাধিক নেতাও অংশ নেন। এছাড়া উভয় জোটের শরিক নেতারাও গাজীপুর ছুটছেন নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে, গভীর রাত পর্যন্ত তারা গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশ করছেন।
আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতারা নিজেদের প্রার্থীর গুণাবলী তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের উন্নয়ন চিত্র, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির ইস্যু এবং বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নানা অনিয়মের কথা বলে ভোটারদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন। বিপরীতদিকে, বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট নেতারা বর্তমান সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা, অনিয়ম ও হেফাজতে ইসলামের ঘটনাকে ফলাও করে প্রচার করছেন। উভয় জোটের নেতারাই স্থানীয় ইস্যুর পরিবর্তে জাতীয় ইস্যুকেই সামনে এনে ভোটারদের সমর্থন আদায়ে মরিয়া।
ইত্তেফাকের গাজীপুর প্রতিনিধি মুজিবুর রহমান জানান, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ গতকাল টিএ্যান্ডটি গেট মোড়, বাড়িয়ালি, টেক নগর পাড়া চৌরাস্তা, নলজানি টিএ্যান্ডটি গেট, কড্ডা, হক মার্কেট, ভোগড়া প্রভৃতি এলাকায় আজমত উল্লাহর পক্ষে পথসভায় বক্তব্য রাখেন। এসময় তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অন্যান্য দলের মতো ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে না। আওয়ামী লীগ সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বিরোধী দল যখন অন্য কোনভাবে কিছু করতে পারে না, তখনই তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ধর্মের নামে কুত্সা রটায়।’
দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তোফায়েল আহমদ বলেন, দেশ ও জাতির স্বার্থে আজমত উল্লাহ খানকে বিজয়ী করতে হবে। এজন্য প্রতিটি ভোটারের ঘরে-ঘরে যেতে হবে। ভোটারদের বুঝাতে হবে, কারা গাজীপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, গোপালগঞ্জের পর আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি গাজীপুর। গাজীপুরকে দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ বলা হয়। আমি আশা করি, গাজীপুরের মানুষ আমাদের ফিরাবে না। আজমত গণমানুষের নেতা, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই। প্রকারান্তরে বিএনপির প্রার্থী মান্নানের হজ্বের টাকা নিয়ে অনেক কেলেঙ্কারি রয়েছে। আজমতকে নির্বাচিত করা হলে গাজীপুরকে নতুনভাবে আদর্শ নগরী হিসাবে সাজাতে পারবেন বলে দাবি করেন সাবেক এই মন্ত্রী।
দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন দিয়ে গাজীপুরকে বিচার করা যাবে না। ঐ চারটি সিটি নির্বাচনের অবস্থা ভিন্ন ছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বরিশালে আমরা জিতিনি। খুলনায় গত নির্বাচনে আমাদের এমপি হয়নি। রাজশাহীতে গত ৩৫ বছর পর গতবার আমরা জিতেছি। সিলেটে কখনো হেরেছি, কখনো জিতেছি। সুতরাং সেগুলোর সাথে গাজীপুরের তুলনা করা চলে না। গাজীপুরে সব কয়টি আসনে আওয়ামী লীগের এমপি রয়েছে। এখানে আহসান উল্লাহ মাস্টারকে, ময়েজ উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাজউদ্দিন আহমেদকে জেলের ভিতর হত্যা করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সবসময় ত্যাগ করে গেছে। তাই গাজীপুরের মানুষ সিটি নির্বাচনে প্রথম মেয়র হিসেবে আজমত উল্লাহকে এলাকার উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ করে দেবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
অন্যদিকে ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নানের পক্ষে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান গতকাল গাজীপুর শহরের সাইনবোর্ড, বহের আলী মার্কেট, ভৈরব ও কুলিয়ারচর এলাকায় গণসংযোগ করেন। এ সময় তিনি শ্রমিক, ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় ছাড়াও একাধিক পথসভায় বক্তব্য রাখেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটারদের উদ্দেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে কোনো সিটিতেই আওয়ামী লীগ জিততে পারেনি। এখানেও এর ব্যতিক্রম হবে না। যে নৌকা আগেই ডুবতে শুরু করেছে, এখন জনগণ সে নৌকায় উঠতে চাচ্ছে না। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটেই বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান জয়লাভ করবেন। নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা হাসান উদ্দিন সরকার, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শরীফুল আলম, ডা. মাজহারুল আলমসহ দলীয় নেতা-কর্মী।
গতকাল বৃষ্টি উপেক্ষা করেও মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা দিনভর প্রচারণা চালান। ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাহ দিনভর দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রচারণা ও গণসংযোগ করেন। তিনি সকালে টঙ্গী ট্রাক স্ট্যান্ড, মিলগেট, টঙ্গী বাজার প্রভৃতি এলাকায় ভোট প্রার্থনা করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন সাবেক এমপি কাজী মোজাম্মেল হক, টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি ফজলুল হক, সাধারণ সম্পাদক রজব আলী, যুবলীগের কেন্ত্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজাহার উদ্দিন, হেফাজতে ইসলামের কেরামত আলী, অ্যাডভোকেট শাজাহান, ছাত্রলীগের কেন্দ ীয় সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ প্রমুখ। অপরদিকে অ্যাডভোকেট রহমত আলী এমপির নেতৃত্বে একটি দল কাউলতিয়ার মজলিশপুর, বাওরাইদ, মিরেরগাঁও, সালনা উত্তর, কাথোরা, কারখানা বাজার, জুলার পাড়, বাংলাবাজার, গজারিয়া পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে গণসংযোগ করেন। এ সময় আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এমপিও বিভিন্ন পথসভায় বক্তব্য রাখেন। সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি জাহানারা বেগমের নেতৃত্বেও বিভিন্ন এলাকায় আজমতের পক্ষে গণসংযোগ করা হয়। অন্যদিকে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক এম. এ মান্নান গতকাল মহানগরীর বোর্ড বাজার, সাইন বোর্ড, বাদে কলমেশ্বর প্রভৃতি এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা ও গণসংযোগ করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ ীয় সাধারণ সম্পাদক শরাফত হোসেন সপু, হাসিবুর রহমান খান মুন্নাসহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
আচরণবিধি লংঘন করলে ব্যবস্থা
কোন প্রার্থী নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন করলে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ। তিনি বলেছেন, আচরণবিধি লংঘনের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছে কমিশন। যদি কোনো প্রার্থী বারবার একই অপরাধ করেন তাহলে তার প্রার্থিতা বাতিলের মতো শাস্তি দিতে ইসি বাধ্য হবে। গতকাল শেরেবাংলা নগরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ বলেন, এখন পর্যন্ত গাজীপুরে প্রচার-প্রচারণায় কোনো প্রকার আচরণবিধি লংঘনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। আমরা আশাকরি বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চার সিটি নির্বাচনের চেয়ে গাজীপুর নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। গাজীপুরের নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সেখানকার জনগণ, ভোটার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তত্পর থাকতে হবে।
