পশ্চিম চীনের দালির তিন প্যাগোডার চত্বরে অনেক হাঁটাহাঁটি হয়েছে। আমরা বেশ ক্লান্ত। কুকে বলি, ভাই হাঁটাহাঁটি না করে এখন কী দেখা যায়?
কু বলে, সে ব্যবস্থাই আছে। এখন আমরা লাঞ্চ সেরে নৌকা ভ্রমণে যাব। সারা বিকেল নৌকায় থাকা!
বাহ! চমত্কার আয়োজন।
দুপুরের খাবার শেষে আমাদের নিয়ে আসা হয় এক ঘাটে। টোল প্লাজা আছে, আছে ঘাটে বাঁধা সারি সারি ট্রলার। নৌকা দেখেছি অনেক, ট্রলারও, কিন্তু এমনটি দেখিনি। আমাদের ভাটি অঞ্চলে চমত্কার কিছু ঘুণ্টি নৌকা আছে। এ নৌকাগুলো সেই সব ঘুণ্টি নৌকার চৈনিক, যান্ত্রিক সংস্করণ।
এই নৌকাগুলোর গলুই আছে, কিন্তু তার মাথাটিতে হয়তো ড্রাগনের কোনো এক সন্তানের মুখ। বসার যে জায়গাটি, তার ওপরে যে ছাদটুকু আছে, সেটা যেন বাই-রীতির কোনো এক ঘরের ছাদ। সেই অবিকল টালি, টালির শেষ মাথায় মোষের শিং-এর মতো ঢেউ খেলানো মোটিফ।
নৌকাঘাটে ভিড়-ভাট্টা তেমন একটা নেই। ঘাটে দাঁড়িয়ে এই হ্রদটিকে একটু দেখার চেষ্টা করেছি মাত্র এ সময়ের মধ্যেই আমাদের চীনাভাষী গাইড কু একটি নৌকা ভাড়া করে ফেলেছে।
নৌকার আরোহীদের জন্য বেশ আরাম-আয়েসের ব্যবস্থা আছে। নৌকার পাটাতনে বিছিয়ে দেওয়া আছে বেতের চেয়ার, ওপরে ছাউনি, দু-পাশ খোলা। বিকেলের এই সোনারোদ পিঠে মাখতে মাখতে বেশ উপভোগ করা যাচ্ছে এ হ্রদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
হারুন ভাই আয়েস করে একটা ইজি চেয়ারে বসে থাকেন। আমাদের নৌকা ছুটে চলে। ডানপাশে দালি শহর, বাঁ-পাশে ঘন জঙ্গলের কোনো এক দ্বীপ।
পশ্চিম দিকে এই লেক ক্যাংশান পর্বতমালার মধ্যে ঢুকে গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হ্রদের উচ্চতা প্রায় দুই কিলোমিটার, উত্তর-দক্ষিণে ৪২ কিলোমিটার লম্বা আর পূর্ব-পশ্চিমে গড়ে ৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার চওড়া। হ্রদের সর্বোচ্চ প্রশস্ততা ৮ কিলোমিটার। গড় গভীরতা ১১ মিটার, সর্বোচ্চ গভীরতা ২১ দশমিক ৫ মিটার। আর এ হ্রদের পানি ধারণক্ষমতা ২ দশমিক ৫ ঘনকিলোলিটার।
কু বলে, এই হ্রদের নাম জানো? বললাম—ইরহাই হ্রদ, লেখা আছে। কু তার ডান কানের লতিতে হাত দিয়ে বলে—এই হ্রদের নাম হচ্ছে, এটা।
মানে?
ওপর থেকে দেখলে এই হ্রদটিকে মানুষের কানের মতো দেখায় বলে এর এই নাম। কানকে চীনারা ‘ইরহাই’ বলে। এ কারণে এর এই নাম।
কুর কাছ থেকে এই হ্রদের নাম শুনে আমি হারুন ভাইয়ের কাছে গিয়ে বসি। তাঁকে নামের শানে নজুল শোনাই। তিনি খুবই পুলক বোধ করেন। দুপুর বেলা পাহাড়ের ওপর মন্দির থেকে মন্দিরে হেঁটে হেঁটে তিনি বেশ ক্লান্ত। ক্লান্তি একেবারেই স্পর্শ করছে না কায়েস ভাইকে। কারণ, হ্রদের স্বচ্ছ নীল জল, ওপারের দ্বীপ থেকে প্রতিফলিত গাছপালার রূপ, পাশের পাহাড়ের লাল-কালো মাটির নানা রকমের পাথরের রূপ তাঁকে খুবই মুগ্ধ করে রেখেছে। তিনি ছবি তুলতে ব্যস্ত।
এই কর্ণ হ্রদে ছোট-বড় মিলিয়ে তিনটি দ্বীপ আছে। জিনসুও, চিওয়েন আর উজি দ্বীপ তিনটি ভাসছে কর্ণ হ্রদের জলে। আর আছে একটিমাত্র প্রাসাদ নিয়ে ছোট্ট একটি ভূ-খণ্ড, এর নাম পুতু। আমরা চলেছি সবচেয়ে বড় যে দ্বীপ সেটি দেখতে। এর নাম জিনসুও।
কর্ণ হ্রদের শান্ত জলরাশি ঠেলে ঠেলে আমাদের নৌকাটা ভেসে চলেছে। হ্রদের এখানে একটি বাঁক। বাঁকটি বেশ চমত্কার। মনে হচ্ছে হ্রদটি বুঝি এখানেই শেষ হয়ে গিয়েছে। পানির ধারা সরু হয়ে গিয়েছে, সামনের দৃষ্টিসীমা ঢেকে দিয়েছে পাহাড়। কিন্তু সামান্য একটু বাঁক ঘুরতেই আবার বিশাল জলাধার। চারিদিকে থই থই নীল জলের ধারা। সে জলের ওপর সূর্যের তীর্যক আলো পড়ে চিকচিক করছে। এখানে হ্রদের সৌন্দর্য অপরূপ। এই কর্ণ হ্রদের এ রকম নয়টি বাঁক আছে, প্রতিটি বাঁকই নাকি এ রকম সুন্দর।
চীনা কবিরা এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন ‘উন্মুক্ত আয়না’। কেউ বলেছেন ‘নীল আয়না’। আবার কেউ বা বলেছেন ‘আকাশের আয়না’।
ঠিক এ সময়েই ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ে একটি পর্বতের চূড়া। পর্বতের চূড়ার ওপরে মন্দিরের মতো দেখতে একটি স্থাপনা। বোঝা যায়, আমরা জিনসুও দ্বীপের কাছাকাছি চলে এসেছি।
এই জিনসুও কর্ণ লেকের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। পুরো দ্বীপটি গড়ে ৩৭০ মিটার চওড়া। আর এই দ্বীপের ২০০টির মতো বাই পরিবার বসবাস করে।
দূর থেকে জিনসুও দ্বীপের পর্বতের একের পর একটি সারিকে ঢেউ আর পাহাড়গুলোকে কর্ণ লেকের ঢেউয়ের প্রতিফলিত রূপ বলে মনে হয়। সে কারণেই এই দ্বীপের নাম জিনসুও। জিনসুও চীনা শব্দ, এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘সমুদ্রের ঢেউ’।
আমাদের নৌকা এসে ভেড়ে জিনসুওর ঘাটে। ঘাটে সারিসারি সাজানো পর্যটন নৌকা। আমাদের নামতে হয় লাল পাথুরে পথে। এই পথ ধরে একটু এগিয়ে গেলেই জিনসুও দ্বীপের প্রবেশ-ফটক। যেহেতু পুরো দ্বীপেই বাই উপজাতীয়দের বসবাস, সে কারণে এর প্রধান ফটকটি চীনের অন্যান্য স্থানের ফটকের অবয়বের থেকে একটু আলাদা। চীনা ঐতিহ্যের লাল রংয়ের প্রধান ফটকের শরীর থেকে হারিয়ে গেছে। এখানে জায়গা করে নিয়েছে বাই উপজাতীদের সৌভাগ্যের রং—সাদা।
এই ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চারিদিকে গ্রানাইড পাথর। একদমই বুনো প্রকৃতির গ্রানাইডের স্তূপ। এই বুনো প্রকৃতি থেকেই সংগৃহীত কিছু কিছু গ্রানাইড খণ্ডে পাওয়া গেছে এ রকম মনুষ্য আকৃতি। সেসব সংগৃহীত গ্রানাইড খণ্ডকে আর একটু গোছগাছ করে এ রকম সাজিয়ে রাখা হয়েছে পর্যটকদের জন্য।
হাঁটতে থাকি একদমই প্রাকৃতিক গ্রানাইড পাথরের রাস্তা ধরে। এই রাস্তার একদিকে খাড়া গ্রানাইড পাথরের পাহাড় আর একদিকে পাহাড়কে কেটেকুটে সমতল করে স্থানীয় বাইরা গড়ে তুলেছে তাদের বসতবাড়ি। বাইদের ঐতিহ্যিক সাদা সাদা বাড়িঘরগুলোকে পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে যাই সামনে।
যেহেতু পুরো এলাকাটাই পর্যটন এলাকা, সে কারণে স্থানীয় বাই সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ঐতিহ্যিক হাতের কাজের বিভিন্ন সওদাপাতি সাজিয়ে বসেছে রাস্তার ধারেই। বাই সম্প্রদায়ের বুটিক এবং এম্ব্রয়ডারির কাজের সুনাম পুরো চীনজুড়ে। সে কারণে এখানে বাই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যিক পোশাক-আশাকের চাহিদা প্রচুর। আর বাই সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের পোশাক-আশাক ঝুলিয়ে রেখেছে এ রকম গ্রানাইড পাথরের সাথে। আবার কেউ কেউ তাদের ঘরের সাথেই ঝুলিয়ে রেখেছে সেসব।
এই চমত্কার দ্বীপটিতে আমরা কিছুক্ষণ থাকব। কিন্তু দেখব কী!
জুং বলে—এই দ্বীপের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু যে পাহাড়, তার ওপরে একটা মন্দির আছে। সেই মন্দিরে আমরা যাব এখন।
আবার মন্দির! কিছুক্ষণ আগে না এতগুলো মন্দির দেখে এলাম?
জুং বলে, এ মন্দিরটি অন্য রকম। আসো, ভেতরে গেলেই বঝুবে।
আমরা হাঁটতে থাকি।
এখানেও সেই মার্বেল আর গ্রানাইট বিছানো পথ। হঠাত্ দেখি কতগুলো পড়ে আছে রাস্তার পাশে।
পুরো চীনের সবচেয়ে উত্কৃষ্ট মানের মৃত্ ও চীনা মাটির পাত্র তৈরি হয় এই জিনসুও দ্বীপে। ধারণা করা যায়, সেসব মৃত্পাত্রই পোড়ানো হয়েছে এই সব চুলাতে।
সিঁড়ি দিয়ে বেশ খানিকটা উঠে আসার পরে নিচে তাকাই। এখান থেকে কর্ণ হ্রদকে সব থেকে সুন্দর দেখাচ্ছে। এত ওপর থেকে দেখে মনে হয় কর্ণ হ্রদ যেন তার সৌন্দর্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে। শান্ত হ্রদের জল কোথাও কোথাও বাতাসে তীর তীর করে কাঁপছে। এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যই হয়তো পুরাকালে নানজি সাম্রাজ্যের রাজকুমার ঝ্যাং এখানে তৈরি করেছিলেন গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ। পরবর্তী সময়ে নানজি সাম্রাজ্যের সব রাজা-রানিই গ্রীষ্মকালে অবসর কাটাতে ছুটে এসেছেন এই প্রাসাদে। আর এখানে বসে কর্ণ হ্রদের আয়নায় আকাশের প্রতিচ্ছবি দেখতেন। সেই কারণেই হয়তো এই প্রাসাদের নাম হয়ে গেছে স্কাই মিরর প্যাভিলিয়ন।
উঠে আসি স্কাই মিরর প্যাভিলিয়নের ওপরের ধাপে। এখানে একটি বাগানের ভেতরে বসার ব্যবস্থা। গাছ-গাছালির ফাঁক-ফোঁকরে গ্রানাইট পাথরের বেঞ্চ আর মাঝখানে মার্বেল পাথরের টেবিল। সেকালে হয়তো এখানে এই জায়গায় বসেই নানজি রাজা-রানিরা কর্ণ হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। আমরাও ওপর থেকে পাখির চোখে কর্ণ হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকি।
আমরা এগোতে থাকি পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে। একটু সামনে যেতেই পৌঁছে যাই স্কাই মিরর প্যাভিলিয়নের মূল ফটকের সামনে। এত ওপরে ওঠার পর পৌঁছালাম মাত্র মূল ফটকে। সে কারণেই হয়তো একটু পর পর বাগানের ভেতরে এ রকম বসার আয়োজন ।
স্কাই মিরর প্যাভিলিয়নের মূল ফটকটি চীনের অন্য সব রাজকীয় স্থাপনার মূল ফটকের থেকে আলাদা কিছু নয়। সেই তিনটি প্রবেশপথের সমন্বয়ে ফটক। মাঝখানে প্রবেশপথটি একটু বড়, পাশের দুটো অপেকক্ষাকৃত ছোট। এখানে অবশ্য একটি পার্থক্য আছে। এই ফটকটি সাদা। যেহেতু বাই সম্প্রদায়ের কাছে সাদা সৌভাগ্যের রং, সে কারণেই হয়তো এই ফটকটি সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি করা হয়েছে।
এখানে এই প্রধান ফটকের পাদদেশে দাঁড়িয়ে স্কাই মিরর প্যাভিলয়নকে সব থেকে সুন্দর দেখা যায়। সিঁড়ি মাড়িয়ে উঠতে থাকি প্যাভিলিয়নের সর্বোচ্চ চূড়ায়। এখানে সিঁড়ি পথের উপরিভাগটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে ছাউনি দিয়ে। ছাউনির ছাদে বাই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যিক চিত্রকলায় উঠে এসেছে দ্বীপবাসীর জীবনচিত্র।
ওপরে উঠেই গ্রানাইড পাথরের পায়েহাঁটা পথ। দু-ধারে ফুলের বাগান। এমনিতেই অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও পাখির ডাকের জন্য এই জিনসুও দ্বীপের সুনাম চীনের সর্বত্র। ফুল চোখে পড়লেও পাখির ডাক আর আমাদের শোনা হয় না। ওপর থেকে কর্ণ হ্রদের সৌন্দর্য দেখি। দূরের পাহাড়গুলো আবছা হয়ে আসছে। সূর্যটা পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকাচ্ছে। সূর্যের আলোর আভাটুকু ছড়িয়ে পড়েছে হ্রদের জলে, হ্রদের জল ঝিকমিক করছে।
স্কাই মিরর প্যাভিলয়নে ঢোকা হয় না আমাদের। ওপর থেকে নিচের লোকালয় দেখি; দেখি দ্বীপের রাস্তাঘাট। আমাদের নামতে হবে ওই রাস্তাতে। সন্ধ্যার আঁধার গ্রাস করতে থাকে সূর্যের শেষ আলোকরশ্মি। আমরা নিচে নামতে থাকি।
উঠতে যতটা সময় লেগেছিল, নামতে ততটা সময় লাগে না আমাদের। চেপে বসি আমাদের ভাড়া করা নৌকায়। নৌকাটা ছুটে চলে দালি শহরের দিকে। এই কর্ণ হ্রদ দালির নতুন শহরকে ছুঁয়ে গেছে। সেখানে দালি পর্যটন কর্তৃপক্ষ একটি নৌবন্দর গড়ে তুলেছে, আমরা নামব সেখানে।
স্থানীয় চীনা পর্যটকেরা নৌকার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে কর্ণ লেকের ডুবন্ত সূর্যকে বিদায় জানাচ্ছে। সূর্যের লাল আভাতে চীনা তরুণ-তরুণীদের মুখায়বগুলো দেখা যায় না, শুধু তাদের একরঙা অবয়ব হিসেবেই উপস্থিতি থাকে আমার ক্যামেরার ফ্রেমে। সূর্যটা এবার সত্যি সত্যি হারিয়ে যায় পাহাড়ের আড়ালে আমার ক্যামেরার সুইচ অফ করতে হয় আলোর স্বল্পতার কারণে। আমিও বাই বাই জানাই কর্ন হ্রদকে আর দূরে আঁধারের স্তূপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাংশেন পর্বতমালাকে।
