আপন নিবাসের নিশানা ধ্রুব নয়। স্থির মনে হলেও সংসার ও সময়ের ঊর্মিমালা তার স্থিরতা ভেঙে কখন যে কোথাকার কোন গন্তব্যে ভাসিয়ে নেবে, কার সাধ্য তাকে ধ্রুব জ্ঞান করে! সমপ্রতি প্রয়াত কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে তাঁর আপনা নিবাসে যেতে দেখে তাই মনে হলো। আত্মীয়তার বন্ধনে বাধা পিতার অধিক পিতা এই মানুষটির আকস্মিক চলে যাওয়া আমাকে প্রবলভাবে ব্যথিত করেছে।
থেমে থাকে না সংসারের নিয়ম গতি কিংবা রীতি। সহস্র বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও মানুষকে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছাতেই হবে; কিবা সে জীবিত কিবা সে মৃত। আপন ঘরে পৌঁছাতে হলে সংসার-নিয়ম মেনে তবে যেতে হয়। সদ্যপ্রয়াত কবির জন্যও তা-ই হলো।
কবির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা মনে নেই। আমি নানাবাড়ি থেকে ভাটারা স্কুলে অধ্যয়নকালে রাস্তা বা রেলস্টেশনে কবির সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়নি। স্কুলে অধ্যয়নকালে অবকাশ নামে একটি অরাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে একদিন কবির দেখা পেলাম কোনো এক বিকেলে স্কুলমাঠে। তখন কবির প্রথম কাব্য ‘তিন রমণীর ক্বাসিদা’ বেরিয়েছে। গ্রন্থটি নিয়ে বেশ আলোচনাও হচ্ছে। সেদিন অবকাশের বৈকালিক আয়োজনে কবির সে কাব্য থেকে পাঠ করেন অবকাশের অন্যতম সদস্য রফিক ভাই (বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তা)। আরও কেউ কেউ পাঠ করেন। অতঃপর কবিকণ্ঠে শোনা হলো কবিতা। তিনি কাব্যের প্রথম কবিতাটি পাঠ করেন। উক্ত কবিতার প্রথম কবিতার তৃতীয় স্তবকে আছে, ‘পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহঙ্কার আমার কবিতা’। কবিতাটি পাঠান্তে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি নিজেকে পৃথিবীর সর্বশেষ কবি বললেন কেন? তিনি খানিক মৃদু হেসে উত্তর দেন, পৃথিবীর সব কবি তা-ই মনে করেন। তখন বয়সে অনেক নবীন, তাঁর বিদগ্ধ উত্তরের কোনো কিনারা পাইনি সেদিন। এখন হয়তো তাঁর কিছুটা অনুমান ও অনুভব করতে পারি।
খুব মনে পড়ছে, সাহিত্য পড়ার অদম্য বাসনা নিয়ে একদা কবিগৃহ মহসীন হলের হাউজ টিউটরের বাসায় আগমন করি। দুই দিবস ও রজনী তাঁর সান্নিধ্যে খাবার গ্রহণ ও আলাপচারিতা শেষে চলে যাই। কিন্তু আমার ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করা সম্ভব হয়নি বলে কবির সঙ্গে যোগাযোগও অনেকটা কমে আসে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে হঠাত্ আত্মীয়তার বন্ধনে সে যোগাযোগ একদা নিবিড় হয়ে ওঠে। তারপর কোনো কোনো মধ্যরাত্রি সাহিত্য, কবিতা, নাটক প্রভৃতি নিয়ে অনেক আলোচনাই তো তাঁর সঙ্গে হয়েছে। এখন তা কেবল অতীত ও স্মৃতি হয়ে রইল মাত্র।
আলোচনা প্রসঙ্গে নানাবিধ কথাই হতো তাঁর সঙ্গে। বাংলাদেশের কবিতা ও কবিগণের মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক আলোচনায় উঠে আসত। নিজের লেখার প্রকৃত মূল্যায়নের কথা বললে তিনি বলতেন—কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নে আমি বিশ্বাস করি না। আমার প্রকৃত মূল্যায়ন করবেন আমার পাঠকবৃন্দ। সত্য কি? কবির উদার চিত্তের অনুভবকে অস্বীকার করি কী করে! এ প্রসঙ্গ থাক।
কবির দ্বিতীয় কাব্য ‘পার্থ তোমার তীব্র তীর’ অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করলে কবির কাব্যতৃষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়; যেমন—
কিন্তু আমি অন্য রকম পার্থ আছি
আমার রথের শীর্ষদেশে যে-পতাকা ছিঁড়তে পারো
এমন আশা নিষ্ফলতা।
তোমরা বামন, হ্রস্ব খাটো, তোমাদের ঐ মাপের কাঠি
একটু ছোট আমার জন্য, তোমাদের ঐ ঘরের কপাট
বড়ই নিচু, আমি একটু দীর্ঘদেহী—
আমার ঘরের ছাদটুকু তাই করে নিলাম একটু উঁচু।
উপরোদ্ধৃত অংশটি কবি ‘আত্মপক্ষ’ কবিতায় অসম্ভব এক শিল্পদ্রোহে উচ্চারণ করেন। এবং তা থেকে তাঁর শিল্পপ্রজ্ঞা ও কাব্যনিষ্ঠা সম্পর্কে সম্যক ধারণ পাওয়া সম্ভব। তিনি একাধারে কবি, সফল অনুবাদক, শিক্ষক, প্রশাসক প্রভৃতি বহুবিধ গুণের অধিকারী। তিনি ‘একবিংশ’ নামক উঁচুদরের একটি কবিতা ও সাহিত্যসংশ্লিষ্ট লিটল ম্যাগাজিন ২৮ বছর ধরে সম্পাদনার কাজটি করেন অত্যন্ত নিভৃতে। তাঁর সকল সাহিত্যকৃতিই হয়তো আজ আলোচনা-পর্যালোচনার বিষয়। আশা করি, দেশের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যক-সমালোচক ও বিদগ্ধজনেরা তাঁর কাব্যকৃতি ও মনীষা নিয়ে আলোচনায় এগিয়ে আসবেন। তবেই তাঁর প্রকৃত পরিচয় পাব নিশ্চয়।
কবিকৃত ‘জন্মবাউল’ কাব্যগ্রহ্নটির উত্সর্গপত্রে তিনি লিখেন—রিপন শামীম মতিয়ার—পুত্রপ্রতিম তিনজনকে। ত্রয়ী জামাতার প্রথমোক্ত জন আমি। তিনি কন্যাজামাতাদের পুত্রপ্রিতিম হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর এই স্নেহের দানকে অস্বীকার করি কীভাবে! তাঁর সে স্নেহস্মৃতির অনেক দৃশ্যচিত্রই আজ মনে পড়ছে। আষাঢ়ের ধারাবরিষণে সেসব কেবলই রোদনধ্বনি—স্মৃতবিস্মৃত আবেগ অনুভবের নানা কথা।
একদা ‘যুগান্তর’ সাময়িকীতে ‘বৈশাখী কবিতার পঙিতমালা’ শীর্ষক প্রবন্ধ রচনায় হাত দিয়েছি। আমার উক্ত লেখার অন্বিষ্ট ছিল বাংলাদেশের প্রধান কবিগণের বৈশাখ সংশ্লিষ্ট কবিতা নিয়ে আলোচনা করা। আমার অভিপ্রায় তাঁকে জানাতেই তিনি তাঁর লেখা অন্যান্য বৈশাখসংশ্লিষ্ট কবিতার পাশাপাশি ‘তিন রমণীর ক্বাসিদা’ কাব্যের ‘বাড়ি যাবো, বাড়ি’ কবিতাটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। উক্ত কবিতায় আছে—
বাড়ি যাবো, বাড়ি যাবো বাড়ি...
পথ ছাড়ো অন্ধকার, পথ ছাড়ো দূরত্বের দূরগামী পথ
বাড়ি যাবো, বাড়ি...
বৈশাখের বটবৃক্ষ তালুতে কপোল রেখে বলে, হায়,
এ-ছেলেকে কিছুতেই ফিরতে দেয়া চলবে না; নগরীর পথ
দালানের পরভৃত কোকিলের পঞ্চস্বর ডেকে বলে, শোন
তার কোন বাড়ি নেই,..
তবু বাড়ি যাবো, বাড়ি যাবো, বাড়ি
পথ ছাড়ো সুসময়, প্রতিশ্রুত সুখনিদ্রা, নিমগ্ন বালিশ
পথ ছাড়ো জীবনযাপন ব্যথা, পথ করে দাও।
আজ যাবো
ঝিনাই নদীর জল হাঁটুতে কাপড় তুলে পার হবো
মধ্যরাতে ডাক দেবো
মা মাগো এসেছি আমি! সেই কবে গভীর নিশীথে
তোমার নিমাই পুত্র ঘর ছেড়েছিল, আজ কাশী বৃন্দাবন
তুলাধুনা করে ফের তোর দীর্ণ চৌকাঠে এসেছি।
সত্যি, কবি সমগ্র দেশ ও বিশ্ব পরিভ্রমণ-অন্তে যেন উপরোক্ত কবিতার মতোই মাতৃকোলের স্নিগ্ধ ছায়ায় অবশেষে আশ্রয় নিলেন। হয়তো আর কোথাও তাঁর যাওয়া হবে না। অনুরূপ ‘জন্মবাউল’ কাব্যের নামভূমিকা-সম্বলিত কবিতাও এ স্থলে স্মরণযোগ্য—
সুখ এসে বাসা বাঁধে বাগানের লতাপুঁই গাছের মাচায়,
খড়কুটো ঘর বোনে, গান গায়, আর শুধু পুচ্ছ নাচায়—
‘এসো বন্ধু, মনে হয় কত কাল দেখিনি তোমায়!’
আমরা বেঁধেছি ঘর, তুমি আমি দুইজন, তারপর গেছে কত কাল :
আমাদের যৌবনের যত হাসি যত গান সবি আজ হলুদ কঙ্কাল।
কবি প্রিয়তমা পত্নীর কবরের পাশে শয়ন করে হয়তো তাঁরই রচিত কবিতার চরণের মতো সত্য হয়ে উঠবেন। নিয়তি রীতির ঘরে টঙ্কার তোলে। কাব্যসত্য হয়তো জীবনসত্যের অপর নাম। তবে কবির অমোঘ কাব্যবাণীকে শরণ্য জ্ঞান করি। পার্থ হে কবি—খোন্দকার আশরাফ হোসেন— আপনার কাব্য ও সাহিত্যকৃতি ও অবশ্য শরণ্য!
