শিল্পকে ব্যাখ্যা করা খুবই দুরূহ কাজ। সকলের ব্যাখ্যা একরকম হবে, এটা ভাবাও ঠিক নয়। একরকম হয়ও না। কারও কারও সংবেদনে একই সুরের মূর্চ্ছনা তুললেও কথা বা ব্যাখ্যা ভিন্ন হবেই। সে জন্যেই শিল্পের ব্যাখ্যা বৈচিত্র্যময় হয়, সেটাই স্বাভাবিক।
প্রত্যেক শিল্পীই নিজেকে প্রকাশ করতে চান। সেই চাওয়ার মধ্যে প্রত্যেক শিল্পীরই নিজস্ব পথ ও মত আছে, দর্শন আছে, শিল্পভ্রমণের আভিজ্ঞতা আছে। পাশাপাশি শিল্পীর সীমাবদ্ধতাও আছে। অর্থাত্ প্রত্যেক শিল্পী তাঁর ভাবনা, কল্পনা ও অভিজ্ঞতায় যতটুকুন পারেন ততটুকুই চেষ্টা করেন। তার বেশি তিনি পারেন না, পারবারও কথা নয়। কিন্তু শিল্পী তাঁর সংবেদনশীল মনকে প্রকাশ করতে চান—এটাই বড় সত্য।
জীবন-জীবিকার জন্য এ জগতে চারুকলা বা সাহিত্যচর্চা ছাড়াও হাজার রকমের কাজ আছে। সেই সকল কাজে অর্থযোগ অন্তত চারুকলা বা সাহিত্যে চর্চার চাইতে সহজ এবং সেখানে হূদয়ক্ষরণের ঝুঁকিটাও কম। তারপরও এ ধরনের সুকুমারবৃত্তিতে কেউ কেউ কেন আসেন? ভাবুন, যাঁর নাম জীবননান্দ তিনি জীবনের আনন্দযোগ থেকে বঞ্চিতই ছিলেন, বলা যায়। আবার যিনি ভ্যান গগ, যাঁর ‘সানফ্লাওয়ার’ নামের ছবি সারা পৃথিবী আলোকিত করে ফেলেছে, অথচ তিনি কাটা কানের যন্ত্রণা পুরোজীবন বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন। একমাত্র মৃত্যুই তাঁকে সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছে।
বিশিষ্ট সংবেদনশীল শিল্পী ও শিল্পশিক্ষক গণেশ হালুইয়ের মতে, এই বিশ্বপ্রকৃতিতে মানুষ যখন গুহায় বাস করত, যখন প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে বাঁচত, সেই তখন থেকেই মানুষের মধ্যে এক ছন্দবোধ জাগে। সেই ছন্দবোধ এক অঙ্গসঞ্চালনের স্বরূপ। যার মধ্য দিয়ে তারা আনন্দ প্রকাশ করেছে। এই প্রকাশই রূপ নেয় নৃত্যে, সংগীতে এবং ছবিতে। বিশ্বপ্রকৃতির এই যে নিঃশব্দ সাড়া, সেটাই মানুষের মধ্যেও এক বৃহত্তর সাড়া জাগায়। এবং এই সাড়ায় স্পন্দিত হয়ে উঠলেই এই বোধগুলি প্রকাশ ঘটে। তিনি বলেন, ‘কলসি ভরে গেলে কানা বেয়ে উপচিয়ে যে জলের ধারা বয়, তা-ই হলো শিল্প। শিল্পে ঘাটতির কোনো স্থান নেই।’
২.
সমসাময়িক শিল্পকলার হালত কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত ‘২০তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী’র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে গিয়ে বোঝা গেল। হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। জাতীয় পর্যায়ের চারুকলা প্রদর্শনী এটি? নাকি চারুকলার বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী? মনটা বাস্তবিকই খারাপ হলো।
তবুও ভালো কিছু কাজ অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেই উল্লেখযোগ্য কাজগুলি অগণিত-অসংখ্য অনুল্লেখ্য কাজের ভিড়ে দমচাপা পড়ে মরে গেছে। প্রদর্শনীতে স্টাডিধর্মী কাজই বেশি। নবীন চারুকলা প্রদর্শনীতে যেমন দেখতে পাওয়া যায়। ঠিক জাতীয় প্রদর্শনীর মেজাজটা পাওয়া গেল না।
জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর বিবেচনায় মাকসুদা ইকবাল নীপার ‘কালার অফ দ্য কান্ট্রি’, রাজীব দত্তের ‘হাইওয়ে সুইটস’ মেহেদী হাসানের ‘ইচ্ছের বলি’, মোহা. আলপ্তগীনের লাইট অ্যান্ড ডার্ক, মইনুল ইসলাম পলের ‘সাইলেন্ট ডিসকোর্স’, ইকবাল বাহার চৌধুরীর ‘সম্পর্ক ২৪’, জয়া শাহরীন হকের ‘হাইফোনেটেড এক্সিসটেন্স’। সৈয়দা ফারজানা হোসেন তান্নির ‘আড্ডা’ মো. মাঈনউদ্দীনের মোনাজাত, মো. হাসান মোর্শেদের ‘আমার বয়স ৪২ বছর’, এ কে এম হাসান ইমামের ‘ধ্বংস প্রাপ্ত-২১’, এ এ এম কাওসার হাসানের ‘শক্তি’, সিদ্ধার্থ তালুকদারের ইমেজ অব ২৪ এপ্রিল’ উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম। সৈয়দ হাসান ইমাম, জাভেদ জলিলের শিল্পকর্মের হদিসই মিলল না। এদের ভেতর মাসুদা ইকবাল নীপার শিল্পকর্মটি আমার মতে সমসময়ের পরিশীলিত কাজ। জয়া শাহরীন হকের ‘হাইফোনেটেড এক্সিসটেন্স’ শিল্পকর্মটিও সমকালীন বিশ্বযোগের উপস্থাপনা।
‘সমকালীন’ ‘আধুনিক’ ‘উত্তর আধুনিক’ ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে আমরা কম-বেশি পরিচিত হলেও আমাদের চিত্রকলায় এর কোনো যোগ নেই। স্পস্ট ধারণাও নেই। বলতে খারাপ শোনালেও বলছি :বিশ্বের সমকালীন শিল্পকলার গতি-প্রকৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ কিছু তরুণ উদ্যমী শিল্পীদের মাধ্যমে ঘটলেও তাঁরা এই প্রদর্শনীতে অবহেলিত থেকেছেন। কেন এটা হয়েছে, বোধগম্য নয়।
৩.
জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন এ জন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানে মধ্যবয়সী বা জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের গুরুত্ব বিবেচনা করাটা জরুরি। নবীনদের জন্য তো আলাদা প্ল্যাটফরম আছেই। সেখানেই তরুণদের নিরীক্ষাধর্মীকাজ উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে তাঁদেরকে উত্সাহিত করা যেতেই পারে। যে কাজটির ক্ষেত্র এই মাপের জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী নয়। হতেই পারে কোনো তরুণ একটা অসাধারণ কাজ করে ফেলেছেন, হঠাত্ এ রকম হয়। তখন তাঁর শিল্পের ভ্রমণটির ওপর নজর দিন। তাঁকে দৃষ্টির গোচরে আনুন। অতীতে এমন বহু হয়েছে। আখেরে দেখা গেছে, ওই শিল্পী যথারীতি একদিন লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গিয়ে জীবিকার জন্য নিজেকে অন্য কাজে সমর্পণ করেছেন। সে ক্ষেত্রে জাতীয় চারুকলা নামের প্রর্দশনীটির ওপর দায়টি বর্তায়। তাহলে আর জাতীয় পুরস্কারের মূল্যটা কী দাঁড়ায়।
আবার যে শিল্পীটি সারা জীবনের ভ্রমণ হিসেবে শিল্পচর্চাকেই বেছে নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন, নিভৃতে অথবা সরবে, যাঁদের কাছে পুরস্কারের ধারণাটাই অ্যাবস্ট্রাকটের মতো, শিল্পকলা একাডেমীর উচিত হবে জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁদের সম্মানিত করা। আর বেশি করে জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বিবেচনায় রাখতে হবে, তাঁরা ফরম নিয়ে এই বয়সে একাডেমীতে এসে অংশগ্রহণের জন্য দাঁড়িয়ে থাতে চাইবেন না। তাঁদের যথাযথ সম্মান দিয়ে জাতীয় প্রর্দশনীতে অংশ নেবার ব্যবস্থা শিল্পকলা একাডেমীকেই করতে হবে। তাহলে নবীনরাও উত্সাহিত হবেন।
সত্যি কথা বলতে কি, এবারের প্রদর্শনীতে মধ্যবয়সের শিল্পীদেরও অংশগ্রহণ ছিল না, বলা যায়। এটা সুস্থ শিল্পবিকাশের জন্য সুবাতাস নয় মোটেও। শিল্পকলা কোনো প্রইভেট সংস্থা নয়। এটা সরকারী প্রতিষ্ঠান। জনগণের ট্যাক্সের প্রতিষ্ঠান। এখানে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়ে শিল্পের বিকাশ ও প্রসার নিশ্চিত করা জরুরি।
আজকে যাঁরা স্বনামধন্য শিল্পী, তাঁরা অতীতে মাঝবয়সেই এবং যোগ্য শিল্পী হিসেবেই জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী থেকে সম্মানিত হয়েছেন। এমনও হয়েছে, কোনো শিল্পী যদি মনে করেছেন তিনি যথাযথ সম্মানটি একাডেমী থেকে পাননি, তিনি তাঁর শিল্পীর অহংবোধ থেকে পুরস্কার বর্জন করেছেন এবং পরবর্তী বছরেরই একাডেমী তাঁকে যোগ্য শিল্পব্যক্তিত্ব বিবেচনায় সম্মান জানিয়ে ভুল শুধরেছে।
৪.
এবারের প্রর্দশনী আরও বড় রকমের অবহেলার দিক ছিল এই যে, একাধিক মনোনীত শিল্পী জানেনই না তাঁদের শিল্পকর্মের মনোনয়নের কথা। একাডেমীর উচিত ছিল তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এখন মোবাইল, ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এত সক্রিয়, সে ক্ষেত্রে একাডেমীর কোনো অজুহাতই ধোপে টেকে না। জাতীয় প্রদর্শনীর জন্য মনোনীত শিল্পীর অংশগ্রহণ শিল্পকলা একাডেমী যখন নিশ্চিত করতে পারে না, তখন তো পুরো পুরস্কার মনোনয়নের বিষয়টিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রইল! বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি নিবন্ধন করছি। এটা খুবই গর্হিত কাজ হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজনও একটা বড় ধরনের অবহেলা। অনুষ্ঠানের পূর্বরাত্রে এসএমএস পাঠিয়েছে শিল্পকলা একাডেমী। শিল্পীরা সকলেই নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। কয়েক ঘণ্টার নোটিশে এটা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সারা দেশের অনেক শিল্পী আমাকে এসএমএস আর সামাজিক নেটওয়ার্কে তাঁদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। তাঁরা চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, নড়াইল, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি। অথচ জাতীয় প্রদর্শনী তাঁদের কছে উত্সবের মতো। একজন শিল্পী হিসেবে আমিও অপমানিত বোধ করেছি।
৫.
একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ছবির উপস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে গ্যালারিটিকে একটা টর্চার সেলের মতো লাগলেও আমি সকলের কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে ভীষণভাবে অর্ন্তজালকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তার করেছে এখনকার শিল্পকর্মগুলিতে। যদিও দেশি-বিদেশি ছবি বলে আমার কোনো ভাগাভাগি নেই। ভালো ছবি আকর্ষণ করবেই। প্রভাবটা সেখানে মুখ্য নয়। কিন্তু অনুকরণ অনুসরণেরও মন্ত্র জানতে হয়, এটা নোবেল বিজয়ী সিমবোরস্কার কথা। আসলে শিল্পীদের চর্চার মধ্য দিয়ে ক্রমশ পরিশীলিত ও মার্জিত হতে হয়।
