ডিজিটাল ভাইরাসে বিকলাঙ্গ চলচ্চিত্র

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৩, ১৯:৩৪
এ দেশে স্যাটেলাইট চ্যানেলের হিড়িক শুরু হওয়ার পর থেকে অনেকগুলো প্রবণতার পাশাপাশি নতুন এক প্রবণতা শুরু হয়েছিল। তা হলো নাটকের বিভিন্ন চমকদারি পোস্টার! যা তার আগে শহুরে বাঙালির দৃষ্টিগোচর হয়নি! টিভি নাটক যখন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সারাদেশ এমনকি দেশের বাইরেও প্রচার হচ্ছে। অথচ তখন কি এক কিম্ভুত প্রচারের আশায় এই হাস্যকর পোস্টারগুলো দেখা যায় শুধুমাত্র চ্যানেলের অফিসের সামনের দেয়ালে। সেই পোস্টার দেখলেই বুঝা যেত নাটকের কি হাল! জোর করে এই নাটক দেখানোর ফলাফল যে ভালো হয়নি তা এখন টের পাচ্ছেন অনেকেই। এ নিয়ে এর আগেও ‘মন্তব্য’ কলামে লিখেছিলাম। এমনকি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে এ নিয়ে একাধিক স্কিড প্রচার হয়েছে। নাটকের সেই ভগ্নদশা এখনও কাটেনি। বরং নাটকের জনপ্রিয়তা এমন তলানিতে ঠেকেছে যার উত্কৃষ্ট উদাহরণ চড়া মূল্যে নাটক কেনা চ্যানেল টুয়েন্টি ফোর দেশ সেরা নাট্যকার নির্মাতাদের প্রোডাকশন কেনার পরও দর্শক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় তারা এখন চ্যানেলের ধারাই বদল করে পুরোদস্তুর নিউজ চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। এটা আর যাই হোক আমাদের ফিকশন নির্মাতাদের জন্য চরম ব্যর্থতা। আজকের প্রসঙ্গ সেখানে নয়। কিন্তু প্রায় একই প্রসঙ্গের সিঁড়ি বেয়ে যেন বেহাল দশার দিকে এগোচ্ছে আমদের চলচ্চিত্র। ‘ডিজিটাল’ নামের ভাইরাসে চলচ্চিত্রের নতুন সম্ভাবনার শরীর যেন আজ বিকলাঙ্গ হতে শুরু করেছে। দেশে কোনো কিছুর সহজলভ্যতা আর একই বিষয়ের যথেচ্ছাচার যে সবকিছুর সম্ভাবনা ধুলিস্যাত্ করে দিতে পারে তারই ধারাবাহিক মহড়া যেন চলছে এখন আমাদের চলচ্চিত্রে। ‘ডিজিটাল’ নামে আমাদের দেশে কিছু প্রতিষ্ঠান এমন কিছু নকল আর নিম্নমানের চলচ্চিত্র তৈরি করছেন। তাতে যেটুকু সিনেমা হলে দর্শক ফেরার কথা ছিল তা উল্টো স্রোতে থমকে যেতে শুরু করেছে। চলচ্চিত্র মুক্তির আগে একটা বড় প্রক্রিয়ার কথা জানতাম। তা হলো ‘ক্যাম্পেইন’। সেই ক্যাম্পেইন বলেই কিছু থাকছে না এখনকার চলচ্চিত্রে। কোনো চলচ্চিত্র রিলিজের পর আলাদা প্রচারের মহড়া বা স্ট্যান্ট নেওয়া হচ্ছে না ইদানীং। তাই সারাদেশে এখন একটি শ্যাম্পুর মডেলের যে পরিমাণ ব্র্যান্ডিং হয় তার সিকিভাগও হয় না চলচ্চিত্রে। তাই অনেক উঠতি মডেলকে বলতে শুনি, ‘চলচ্চিত্র আগে তারকা হওয়ার বড় মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু নিজের ইমেজ ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য এখন কর্পোরেট বিজ্ঞাপনই বড় সোপান।’ যাই হোক এখানেও প্রশ্ন থাকে যে, কর্পোরেট বাজারে এখনও চলচ্চিত্র নাকি ঢুকতেই পারেনি। এখনও কোনো চলচ্চিত্র প্রযোজক নাকি তার চলচ্চিত্রে তার হিরোকে দিয়ে কোনো পানীয় খাবার দৃশ্য দেখিয়ে সেই কোম্পানি থেকে ৫ টাকা স্পন্সর জোগার করতে পারে না! কিংবা হয়তো তারা এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসারও সাহস পাননি! মেনে নিলাম বিষয়টা আমাদের কাছে এখনও অন্ধকারেই। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে জ্যাজ মাল্টিমিডিয়ার প্রযোজনায় ‘পোড়ামন’, ‘প্রেম প্রেম পাগলামি’ নামের যেসব চলচ্চিত্র আসছে, তার চেয়ে তো ওই স্যাটেলাইট চ্যানেলের পাশের দেয়ালে সাঁটা নাটকের ক্যাম্পেইন ভালো ছিল। আজ এতগুলো চ্যানেল, সেখানে কোনো বিশেষ প্রচার নেই। নির্মাতা প্রযোজক যেন ধরেই নিচ্ছেন ছোট্ট সাইজের কিছু পোস্টারে ‘ডিজিটাল’ শব্দটি দিলেই হুড়মুড়িয়ে সিনেমা হলে দর্শক চলে আসবে। আর দুয়েক জায়গায় বিলবোর্ড। ব্যস। ‘পোড়ামন’-এর কথায় আসা যাক, ২০১০ সালের ৫ নভেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত ভারতের প্রভু সলোমনের কাহিনী ও পরিচালনায় তামিল ব্লকবাস্টার ‘মায়না’ ছবিটির একটি দুর্বল অনুকরণ এই চলচ্চিত্র। জাকির হোসেন রাজু তার নিজস্ব ক্যারিয়ারে দুয়েকটি মৌলিক চলচ্চিত্রে যেটুকু অর্জন করেছিলেন, এই অল্প বাজেটের নকল ছবি দিয়ে কি তার দর্শকের প্রতি কোনো আস্থা তৈরি করতে পারলেন? একসময় চ্যানেল আইয়ের অল্প বাজেটের চলচ্চিত্রকে ‘প্যাকেজ ফিল্ম’ বলে দোষারোপ করেছেন অনেকেই। কিন্তু সেখানেও তো মন্দের ভালো হিসেবে ছবিগুলো নান্দনিকতায় কমার্শিয়াল ছবির রূপ না পেলেও কমার্শিয়ালের আদলে আর্ট ফিল্ম হিসেবে একটা স্থান করে নিয়েছে। তাই এ দুটি প্রক্রিয়ায় আমাদের চলচ্চিত্র সম্পর্কে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এ ব্যর্থতা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের। চলচ্চিত্র নির্মাতারা এখন হয় কোনো চ্যানেলের অ্যাসাইনমেন্ট ওয়ার্কার কিংবা কোনো ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানের। চলচ্চিত্রের পোস্টারে যেদিন থেকে পরিচালকের ব্যানার হেড বাদ হয়ে তা শাকিবের ছবি যখন হয়েছিল, সেদিনও যেমন অশনি সংকেত দিয়েছিল, ঠিক তেমনি এখন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম পোস্টারে থাকছে বড় ফন্টে আর ছোট্ট করে শুধু পরিচালকের নাম। এমনকি ছবির চিত্রগ্রাহক যিনি চলচ্চিত্রের অন্যতম ভূমিকা পালন করেন তার নামটিও থাকে না। ‘ডিজিটাল’ চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা কি তবে এটাই আমরা ধরে নেব! সাম্প্রতিক কয়েকটি ইন্টারভিউতে শহীদুল ইসলাম খোকন, মনতাজুর রহমান আকবর, সোহানুর রহমান সোহান প্রত্যেকেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন এই সকল ধোঁকাবাজি দিয়ে চলচ্চিত্র নামকাওয়াস্তে রিলিজ শুরু করলে দর্শকেরা বিরক্ত হয়ে ভালো বাজেটের ছবিও দেখতে হলে ঢুকবে না। প্রাসঙ্গিকভাবেই বারবার জ্যাজ মিডিয়ার কথায় যেন উঠে আসে। কারণ বিতর্কের সাথে এই প্রতিষ্ঠানের নাম যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর আগে সংগীত পরিচালক শওকত আলী ইমনের সাথে তারপর শাকিব খানের সাথে হাতাহাতি এমনকি অস্ত্র প্রদর্শনের মতোও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে। এরপরও এই বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান তাদের এই নকল চলচ্চিত্রগুলো কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় ছাড়পত্র পায়, সেটিই একটি বড় প্রশ্ন! তবে কী আমাদের লেখালেখি বা প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকারদের এত এত সমালোচনাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে এই ডিজিটাল ভাইরাসে বিকলাঙ্গ করার লাইসেন্স তারা পেয়ে গেছেন। সবশেষ শাকিব আর মাহীর ‘ভালোবাসা আজকাল’ চলচ্চিত্রে শুধুমাত্র একটি অতিথি চরিত্রে শাকিব খান কাজ করলেও সেখানে শাকিবকে মূল হিরো হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। অর্থাত্ ছবিটি রিলিজের আগেই এটি নিয়েও এক ধরনের প্রতারণা শুরু হয়ে গেছে। তবে কি ‘ডিজািটাল ’ নামের সমার্থক শব্দই কি প্রতারণা। এ প্রসঙ্গে শাকিব খান ইন্টারভিউতে বলেছেন, ‘আমি তার চলচ্চিত্রে একটি অতিথি চরিত্রে কাজ করে খানিক উপকার করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন ওরা ছবির মূল হিরো হিসেবে প্রচার করে আমার ক্যারিয়ারের বারোটা বাজাতে চাইছে। তবে কী উপকার করতে গিয়ে আমি দোষ করে ফেললাম নাকি?’ কিন্তু এই প্রতারণার প্রক্রিয়ায় একদিক যেমন ‘ডিজিটাল’ ভাইরাসে বিকলাঙ্গ হতে শুরু করেছে চলচ্চিত্র। অন্যদিকে একাধিক মেধাবী নির্মাতা যখন ভালো ছবি নির্মাণে উদ্যোগী হচ্ছেন। তাদের দর্শকেরাও পড়তে যাচ্ছেন নানান বিভ্রান্তিতে। প্রশ্নগুলো তাই বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই যেন বর্তায়। কীভাবে এই সব চলচ্চিত্র ছাড়পত্র পায়। সম্প্রতি এফডিসি কর্তৃপক্ষ ছবির রেজুলেশনের একটি নীতিনির্ধারণী করে দিয়েছেন। এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু মূল বিষয় হলো, এই নকল গল্প আর দুর্বল নির্মাণ বা এই দুর্বল প্রচার কি চলচ্চিত্রের ইমেজের ক্ষতি করছে না? আজকের তরুণেরা তাদের ফেসবুক, টুইটারে এইসব চলচ্চিত্র নিয়ে কী লিখছেন তা কি তাদের দৃষ্টিতে পড়ে না। হ্যাঁ, এটা অনেকেই বলার চেষ্টা করেন যে, তরুণদের আরও দেশপ্রেমিক হতে হবে। তারা নাকি অযথা বাংলা ছবির নামে ব্যঙ্গ করেন। কিন্তু একটি ভালোমানের চলচ্চিত্র তো দেখে এসে নিশ্চয়ই অযথা শত্রুপরায়ণ হয়ে এই তরুণেরা তাদের ফেসবুক বা ব্লগে খারাপ কিছু লিখবে না! যেখানে সিনেমা মানেই বড় ক্যানভাস। যেখানে এখন টলিউডের সামান্য হিরো এন্ট্রির দৃশ্যে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির অ্যানিমেশন ব্যবহার করা হচ্ছে খরচের তোয়াক্কা না করে। আর এখানে কোনোমতে ডিজিটাল ভার্সন বানিয়েই বলে দেওয়া হচ্ছে উন্নতমানের চলচ্চিত্র! যে ‘উন্নতমান’ দেখে হয়তো ‘নিম্নমান’ শব্দটিও লজ্জায় মুখ লুকায়! পুরো ডিজিটাল চলচ্চিত্রের বাজেট নাকি ৩৫ থেকে ৪০ লাখ। তবে কি ডিজিটালের আরেক সংজ্ঞা কমবাজেটের চলচ্চিত্র! আর এই ডিজিটালের বলি হচ্ছেন যেন মাহি, বাপ্পীসহ নতুন কিছু মুখ। চলচ্চিত্রের স্বপ্ন দেখতে এসে অনেকে প্রতারিতও হচ্ছেন। আর যারা কাজ করছেন তারা না পাচ্ছেন চলচ্চিত্র তারকার মর্যাদা না পারছেন চলচ্চিত্র তারকা হিসেবে লেবাস লাগানোর পর ছোট পর্দার অফারগুলোও গ্রহণ করতে। হয়তো এই পথেই কোনো একদিন অধরা স্বপ্ন ধরা দেবে বলে তারা ডিজিটালের বলি হচ্ছেন ইচ্ছে করেই। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন নেই বলে ‘ফরমালিনমুক্ত’ বলে অনেকেই যেমন বিষাক্ত ফলের বাজারে সয়লাব করছেন। ডিজিটাল শব্দটিও বোধকরি সেই পথেই পচন ধরতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাই এই বিষয়ে কঠোর দৃষ্টি খুবই প্রয়োজন। নয়তো অশ্লীলতার বাজার থেকে আপাত রেহাই পাওয়া এই চলচ্চিত্রের নতুন সম্ভাবনার শরীর না জানি নতুন আরেক রোগে পেয়ে বসে!