রাজধানীর উপকণ্ঠে ডেমরা—রূপগঞ্জের চনপাড়া-পশ্চিগাঁও—কেওঢালা-কামশাইর সড়ক সংস্কার না করে এর ৪শ’ গজ দূরে কৃষি জমির উপর দিয়ে পশ্চিমগাঁও— কেওঢালা সড়ক নির্মাণ কাজ বন্ধের দাবিতে দায়েরকৃত মামলার ১১ জন বিবাদী গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে শোকজের জবাব দিয়েছেন। রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বালু নদীর তীরবর্তী এলাকা পশ্চিমগাঁও, কেওঢালা, দক্ষিণপাড়া, নগরপাড়া, কামশাইর ও পূর্ব গ্রামের কৃষকদের পক্ষে রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল মোতালিব নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সহকারী জজ আদালতে গত ১৩ জুন এই মামলা দায়ের করেন। আদালত ওই সড়ক নির্মাণ কাজ কেন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হবে না মর্মে জবাব চাইলে মামলার ১১ জন বিবাদী প্রায় একই ধরনের জবাব দেন। মামলার বিবাদীরা হচ্ছে রূপগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ শাহজাহান ভুঁইয়া, রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু জাফর রাশেদ, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এটিএম শরিফুল আলম, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আওলাদ হোসেন, কায়েতপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান গোলজার হোসেন, ইউপি সদস্য আবুল হোসেন প্রধান, পশ্চিমগাঁও গ্রামের শফিউদ্দিন ভুঁইয়া, মহসীন ভুঁইয়া, মজিবুর রহমান, শাহিনুর বেগম, খন্দকার আবুল বাশার টুকু।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, পশ্চিমগাঁও-কেওঢালা-কামশাইর সড়ক সংস্কার না করে এর প্রায় ৪শ’ গজ দূরে কৃষি জমি ধ্বংস করে একটি হাউজিং প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত করতে পশ্চিমগাঁও-কেওঢালা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ৩ হাজার ৬শ’ ফুট সড়কের মধ্যে ৮শ’ ফুট সড়ক নির্মাণ কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় ৩৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। এতে এখানকার কৃষকরা প্রতিবাদ সভা, সমাবেশ ও বিক্ষোভ করে। তারা সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন নিবেদন করে। সন্ত্রাসীদের ভয়ভীতি আর হুমকিতে কৃষকরা আতংকিত হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি করা হয়। সন্ত্রাসীরা প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশও হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়। এ সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপে বিভক্তি এখন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীকের সমর্থিতরা কৃষি জমির উপর দিয়ে সড়ক নির্মাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ শাহজাহান ভুঁইয়া সমর্থিতরা পুরোনো রাস্তা সংস্কার কিংবা পূর্ণ পাকা করার পক্ষে। এ নিয়ে দু’গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যে কোন সময় পশ্চিমগাঁও এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকা করেছে এলাকাবাসী। ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) আওতাধীন এলাকাটিতে সরকারি নিয়মনীতি অমান্য করে সাধারণ কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। এছাড়া ড্যাপ প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ, রাজউক, পরিবশে অধিদপ্তর কিংবা ভূমি হুকুম দখল না করে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক এ সড়ক নির্মাণ করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। কৃষি জমি রক্ষার দাবি জানিয়ে গণস্বাক্ষর নিয়ে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করেছেন। কিন্তু কোন ফল হচ্ছে না।
এলাকাবাসী জানায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পশ্চিমগাঁও-কেওঢালা দেলপাড়া— নগরপাড়া— কামশাইর সড়কে আশপাশের লোকজন আসা যাওয়া করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসলেও ৪০ বছরের পুরোনো এ সড়ক সংস্কার কিংবা পূর্ণাঙ্গ পাকা করা হচ্ছে না। এ সড়কের দুই কিলোমিটার পাকা, আধা কিলোমিটার ইটের সোলিং ও দুই কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করলেই স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের চলাচল করতে সুবিধা হতো। দীর্ঘদিনের পুরোনো সড়ককে পতিত রেখে কৃষি জমি নষ্ট করে তার ৪শ’ গজ দূর দিয়ে নতুন সড়ক নির্মাণের কোন প্রয়োজন নেই বলে এলাকাবাসী মনে করছে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় বিতর্কিত সড়ক নির্মাণ করে সরকারি সম্পদ লুটপাট করার জন্য এ প্রকল্পে বাস্তবায়নে পাঁয়তারা করা হচ্ছে বলেও এলাকাবাসী অভিযোগ করেন। কেওঢালা গ্রামের কৃষক আব্বাস আলী বলেন, সড়ক নির্মাণ কাজ স্থগিত করলেই শেষ হবে না। কৃষি জমি ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে খাল কাটার ক্ষতিপূরণ ক্ষতিগ্রস্তদের দিতে হবে। অন্যথায় আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। মামলার বাদি রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল মোতালিব বলেন, সরকারি প্রকল্পের নাম করে বেসরকারি অর্থায়নে কৃষি জমি ধ্বংসের সুযোগ দেয়া হবে না। পুরোনো সড়ক পাকা করতে হবে এবং পুরোনো সড়কের পাশে নতুন সড়ক নির্মাণ করতে দেয়া হবে না।
এলাকাবাসী জানায়, পশ্চিমগাঁও বায়তুল আমান জামে মসজিদ-পশ্চিমগাঁও মাদ্রাসা-কেওঢালা সড়ক ত্রিভূজাকৃতির। মসজিদ এলাকা থেকে কেওঢালা পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হলে এখানকার বিল ভরাট করতে কোন বাঁধের প্রয়োজন হবে না। অনায়াসে বালু ভরাট করে হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে। শুধুমাত্র ব্যক্তি মালিকানাধীন হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বেসরকারিভাবে কৃষকদের জমি নষ্ট করে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে ১৮০ মেট্রিক টন খাদ্যের বরাদ্দের আবেদন করে সংসদ সদস্যের সমর্থিতরা এ সড়ক নির্মাণের কাজ হাতে নেয় বলে এলাকাবাসী দাবি করেছে। পশ্চিমগাঁও— কেওঢালা-নগরপাড়া ৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হলেও বালু নদীর তীরবর্তী হওয়ায় তা ধসে যাচ্ছে। ঝুঁকি এড়াতে কেওঢালা থেকে পশ্চিমগাঁও মাদ্রাসা পর্যন্ত ৩৬শ’ ফুট সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সেক্রেটারি শফিকুল ভুঁইয়া জানিয়েছেন। এর জবাবে এলাকাবাসী জানায়, বালু নদীটি ছোট। এই নদীর তীরবর্তী পশ্চিমগাঁও-কেওঢালা- নগরপাড়া- কামশাইর সড়ক নির্মাণ করা হলে নদী ভাঙ্গনে পড়বে না। তবে কোন কোন স্থানে ব্লক স্থাপন করলে ভালো হবে। এছাড়া বিএস পর্চা তৈরির সময় গ্রামবাসী সড়কের জন্য উভয় দিকে জমি প্রদান করেছে। রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আওলাদ হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জ আদালতের ১৪১/২০১৩ নং মামলায় উল্লেখিত জমি নিয়ে আমাদের কোন প্রকল্প নেই। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় ৩৪ মেট্রিক টন চালে পশ্চিমগাঁও বায়তুল আমান জামে মসজিদ থেকে ৮২৫ ফুট উত্তরে পুকুরপাড় পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু জাফর রাশেদ বলেন, সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোন প্রকল্প সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে না। রূপগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ শাহজাহান ভুঁইয়া বলেন, নারায়ণগঞ্জ আদালতের ১৪১/২০১৩ নং মামলায় ক ও খ তফসিলের জমির উপর দিয়ে কথিত নির্মাণাধীন রাস্তায় উপজেলা পরিষদ কর্তৃক কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। এতে সরকারের কোন স্বার্থ নিহিত নেই। আদালত কর্তৃক সাময়িক স্থগিতাদেশ প্রদান করলে সরকারের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে না। সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক বলেন, কোন দেশে উন্নয়ন মানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে বর্তমান সরকার কাজ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় রূপগঞ্জে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন করা হচ্ছে।
