সিলেট বিএনপিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৩, ২২:১৫
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফল সিলেট বিএনপির মাঝে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা সভাপতি এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া বিএনপি ফের চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। নবনির্বাচিত মেয়র ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচনে জয়লাভের পরদিনই ইলিয়াস আলীর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার মায়ের দোয়া নেয়ায় আপাতত সিলেট বিএনপির ইলিয়াস গ্রুপও তার উপর সন্তুষ্ট। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কোন্দলে জর্জরিত সিলেট বিএনপি এখন অনেকটা ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগুতে চাচ্ছে। তবে দলের নেতৃত্ব নিয়ে ফের কোন্দল তেতে উঠতে পারে বলে অনেকে আশংকা করছেন। আরিফুল হক চৌধুরী ফের মহানগর বিএনপির শীর্ষ পদে আসীন হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে ক্ষমতাসীন থাকা সিলেট আওয়ামী লীগ সিটি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা টের পায়নি। নির্বাচনের ভরাডুবির পর তারা বুঝতে পেরেছে ঘর কতটা নড়বড়ে। জনপ্রিয় নেতা হিসাবে পরিচিত বদর উদ্দিন আহমদ কামরান কেবল দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, কোন্দল ও কতিপয় নেতার ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতির কারণেই নির্বাচনে হেরেছেন বলে অনেকে মনে করছেন। নির্বাচনে বিএনপি যেভাবে তাদের প্রার্থীকে নিয়ে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছিল, ঠিক যেন তার বিপরীত চিত্রই ছিল আওয়ামী লীগে। দলের যথাযথ সহযোগিতা না পেয়ে অনেকটা একা ও অসহায়ভাবে ভোটযুদ্ধে লড়েছেন কামরান। ভোটের দিন সব কেন্দ্রে পর্যাপ্ত এজেন্ট পর্যন্ত দিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ভোটযুদ্ধে বার বার জয়ী কামরানকে এবার হারতে হয়েছে বড় ব্যবধানে। আর এই ফল হতাশার সৃষ্টি করেছে সিলেট আওয়ামী লীগে। অনেক কর্মী-সমর্থক নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য নেতাদেরকে দায়ী করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আর নেতারা দোষারোপ করছেন একে অন্যকে। ফলে দলে চাপা কোন্দল-অবিশ্বাস দানা বেঁধে উঠেছে। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবারের সিলেট সিটি নির্বাচন মেয়র প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ইমেজ ছাড়িয়ে পুরোপুরি দলীয় নির্বাচনে রূপ নেয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট তাদের প্রার্থী আরিফুলকে নিয়ে প্রচারণায় নেমে স্থানীয় বিভিন্ন ইস্যু বাদ দিয়ে জাতীয় ইস্যুকে প্রাধান্য দেয়। বিএনপি হাইকমান্ডও সিটি নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রথমে সিলেটে বিএনপির চারজন নেতা মেয়র পদে প্রার্থী হলে হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত খোদ দলীয় চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া চার প্রার্থীকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে আরিফুল হক চৌধুরীকে সমর্থন দেন এবং বাকি তিন প্রার্থী নাসিম হোসাইন, আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী ও সামসুজ্জামান জামানকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে আরিফুলের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেন। পরে ওই তিন নেতা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন এবং আরিফুলের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। বিএনপির পাশাপাশি যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দলসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠন এবং জোটের শরীক জামায়াত, জমিয়ত, খেলাফতসহ অন্য দলগুলো আরিফুলকে জয়ী করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নামে। তাদের ব্যাপক প্রচারণায় আরিফুল শক্ত ভিত পান। ভোটের লড়াইয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৫ জুনের নির্বাচনে আরিফুলকে প্রায় ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী করে ঘরে ফেরে ১৮ দল। গত সপ্তাহে ১৮ দলের নির্বাচনোত্তর সভায়ও আরিফুল তার জয়ের জন্য নিজ দলের পাশাপাশি জোটের শরীক দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই জয়লাভ সম্ভব হয়েছে। আগামীতেও এভাবে এগিয়ে যেতে হবে। দলীয়সূত্র জানায়, সিটি নির্বাচনে জয়কে প্রেরণা হিসাবে গ্রহণ করে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনেও সিলেটের সকল আসনে জয়ের স্বপ্ন দেখছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে এখন কেবলই হতাশা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক নেতাকর্মী জানান, কামরানের নির্বাচনী প্রচারণাকালেই দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতা ভালোভাবে টের পাওয়া গেছে। নেতাদের বেশিরভাগই ছিলেন কেবল মিডিয়ার ফটোসেশনে। ছবি তোলা শেষ হলে তাদের আর পাওয়া যেত না। কয়েকজন কামরানের প্রধান নির্বাচনী অফিসে বসে খোশগল্গ আর আড্ডায় মেতে থাকতেন। ভোটের লড়াইয়ে জেতার জন্য দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার মতো তেমন কেউ ছিলেন না। খোদ কামরানও ভোটের আগে বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তখন আর করার কিছু ছিল না। নির্বাচনে বড় ব্যবধানে হারেন অতীতে সকল নির্বাচনে জয়ী হওয়া বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। দলীয়সূত্র জানায়, পরাজয়ের জন্য কামরানও দুষছেন দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতাকর্মীদের উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতাকে। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তিনি বলছেন, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক নেতাকেও তিনি নির্বাচনে কাছে পাননি। পরাজয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত বলতে গেলে নিজ বাসাতেই অবস্থান করছেন কামরান। অনেকে বাসায় গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কুশল বিনিময় করছেন। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে পেয়ে কামরান অনেক সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন। দলীয়সূত্র জানায়, সিলেট আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে অচিরেই কেন্দ্রের নির্দেশে কাজ শুরু হবে। ব্যর্থতার জন্য কোন কোন নেতাকে দলের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। পদও হারাতে পারেন ‘বড়’ নেতাদের কেউ কেউ।