দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ছে না প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা উপকূলের কৃষকদের। ধানের নায্যমূল্য না পাওয়া, বারবার ফসল বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এবার আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশংকায় মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ, পূর্ণিমার জোয়ার এবং ব্যাপক বৃষ্টিপাতের ফলে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার কয়েক হাজার হেক্টর জমির আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। এসব বীজতলার অধিকাংশই নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চল থেকে নেমে আসা পানি ও পূর্ণিমার জোয়ারে গত ২৫ জুন থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে থাকে। এ সময় ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুর জেলার আমনের বীজতলা নষ্ট হয়। গত দুইদিন পূর্ণিমার প্রভাবে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে উপকূলীয় এলাকায়। ফলে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ঝালকাঠি ও বরিশাল জেলার নিম্নাঞ্চল। বর্তমানে এ বিভাগের অধিকাংশ আমনের বীজতলা ২/৩ ফুট পানির নীচে রয়েছে। বরিশাল ও ঝালকাঠিসহ কয়েকটি জেলার উঁচু এলাকার বীজ ৫/৬ সেন্টিমিটার বড় হয়েছে। সেখান থেকে আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে কিছু বীজ রক্ষা পাবে বলে আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। কিন্তু বরগুনা ও ভোলা জেলার যেসব বীজতলা এখনো ছোট সেখানে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ৪/৫ ফুট পানি উঠায় সবই নষ্ট হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। ফলে এসব এলাকার কৃষকের কপালে দুঃচিন্তার রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত মৌসুমে আমনের নায্যমূল্য না পাওয়ায় অধিকাংশ কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে এবার আমন চাষ করছেন। কিন্তু শুরুতেই হোঁচট খেয়ে তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
জেলা কৃষি সমপ্রসারণের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বরিশালে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৪২ হেক্টর। এ টার্গেট পূরণে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির বীজতলা দরকার হবে। কৃষকরা জানান, চলতি মাসের মধ্যেই রোপা আমনের বীজতলা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে তারা মাঠে নেমেছিলেন। কারণ তা না হলে উত্পাদন কমে যাওয়াসহ নানা রোগবালাই দেখা দিবে। কিন্তু জোয়ারের পানি তাদের সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে।
সদর উপজেলার সাহেবেরহাট, চরমোনাই, মেহেন্দীগঞ্জের ভাসানচর, আন্দারমানিক, হিজলার বাউশিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, তাদের বীজতলার বীজ প্রায় ৩/৬ সেন্টিমিটার লম্বা হয়েছে। মুলাদী, বানারীপাড়া, উজিরপুর, গৌরনদী, বাবুগঞ্জসহ অনেক উপজেলার কৃষকরা অঙ্কুরোদগমকৃত ধান বীজতলায় ফেলেছেন মাত্র ৩/৪ দিন আগে। চরকাউয়া, নিয়ামতি, টুঙ্গিবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকার বীজতলা এখন কমপক্ষে ২/৩ ফুট পানির নিচে ডুবে আছে। যারা মাত্র এক সপ্তাহ পূর্বে বীজতলা তৈরি করেছেন তাদের নতুন করে বীজতলা তৈরি করা ছাড়া কোন উপায় নেই বলে কৃষকরা জানান।
নগর সংলগ্ন রায়পাশা-কড়াপুর, কাশিপুর, চরবাড়িয়া ও সায়েস্তাবাদ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জোয়ারের পানি না ঢুকতে পারলেও বৃষ্টির পানিতে অনেক বীজতলা নষ্ট হচ্ছে। গত তিনদিন উপকূলে পূর্ণিমার প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তর ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাতে পানি জমে থাকায় বীজতলায় বীজের গোড়ায় পচন ধরতে শুরু করেছে বলে কৃষকরা জানান।
বরিশাল কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের শস্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ রমেন্দ্রনাথ বাড়ৈ জানান, বীজতলায় ২/৩ দিন স্থায়ীভাবে পানি জমে থাকলে সদ্য ফেলা বীজ ধান নষ্ট হয়ে যায়। তবে যেসব বীজতলা আংশিক ডুবেছে সেখানে তেমন ক্ষতি হবে না বলে তিনি জানান।
