ব্যাংকিং পেশায় নৈতিকতা ও ব্যাংকারদের করণীয়

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ১৮:৪২
ব্যাংকিং সেক্টর হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র । সারাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এ সেক্টরকে ঘিরেই। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাংকের প্রতি গণমানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের স্থানটি অনেক ঊর্ধ্বে। ব্যাংকারগণ হলেন দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় আমানতদার। মানুষের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের টাকাগুলো স্তূপাকারে এসে হাজির হয় তাদের সামনে। তারা যদি সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক এ বিশাল সম্পদের বিনিয়োগ ঘটাতে না পারেন তাহলে জাতীয় অর্থনীতি ক্রমশ মন্দার দিকে ধাবিত হবে। এ পেশায় নিয়োজিত কর্মীবাহিনীর জ্ঞান-গরিমা, ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনা যত আধুনিক ও নৈতিকভাবে বিকশিত হবে দেশের অর্থনীতি তত উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকারগণকে সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও প্রজ্ঞার সাথে সেবা প্রদানের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। প্রত্যেককে একজন উন্নয়ন কর্মীর ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে আমাদের অর্থনীতি একটি নৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে যায়। অটোমেশন, সফটওয়্যার ও ইন্টারনেটের আশীর্বাদে এখন ঘরে বসেই সারানো যায় খুচরা ব্যাংকিং কাজগুলো। ব্যাংকিং খাতে ইলেক্ট্রনিক অগ্রগতির সাথে সাথে বর্তমানে মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তাও তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সাথে প্রেম-প্রীতি ও সুনীতির একটা সার্থক সমন্বয় চাই, চাই এক নৈতিক নান্দনিক পুনর্গঠন—এমন শ্লোগানই ভেসে আসছে আন্তঃব্যাংকিং অঙ্গন থেকে। তাই ব্যাংকিং সেক্টরে নৈতিকতার সুষ্ঠু সমন্বয় না ঘটালে মহামারী আকারে দেখা দিবে ঋণখেলাপি, নড়বড়ে হয়ে যাবে ব্যাংকিং সভ্যতা। অগ্রণী ও সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক সিইও (প্রধান নির্বাহী) সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেছেন, ‘সামপ্রতিক সময়ে আমাদের ব্যাংকিং খাতে বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে নৈতিকতাহীনতার বিষয়টি। সবখানেই দুর্নীতি আর অসততার আস্ফাালন চলছে’। সাধারণ অর্থে নৈতিকতা শব্দটি দ্বারা বোঝায় ন্যায়-অন্যায় ও বিচার সংক্রান্ত নীতি বা মূল্যবোধ। আমেরিকান হেরিটেজ ডিকশনারীর মতে ‘নৈতিক মূল্যবোধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দ বিচার করে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সত্ আচরণে প্রবৃত্ত করে’। ‘পেশা’ কথাটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে আসে অকৃত্রিম ভালোবাসা, আন্তরিকতা, দরদ, সেবা মনোবৃত্তি, নিখুঁতভাবে কর্মসম্পাদন, বন্ধুভাবাপন্ন মনোভাব, একই পরিবারের সদস্য হওয়া প্রভৃতি মানবিক ও নৈতিক দৃশ্যাবলী। পেশার সাথে মূল্যবোধের বিষয়টি জড়িয়ে থাকার কারণে পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ উন্নত দেশগুলোতে যে কোন পেশাদার সদস্যদের লাইসেন্স বা সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। ব্যাংকিং পেশার জন্য আমরা এ ফর্মুলাটি গ্রহণ করতে পারি। ব্যাংকিং সেক্টর একটি নিয়মের আবর্তে ছকে বাঁধা ঘূর্ণায়মান উদ্যোগ। প্রতিদিন সারা বিশ্বের ব্যাংকারগণ প্রায় একই ধরনের কাজ করে থাকেন। তারা যেন ছকের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে যান্ত্রিক মানব হয়ে না যান, সেজন্য কাজের ধরনে বৈচিত্র্য আনা দরকার। এমনিতেই ব্যাংকারগণ তাদের কর্মতত্পর জীবনে বহু সংকটময় পরিস্থিতির শিকার হন। দৃঢ়চিত্ততা ও অটল সংকল্পের অভিব্যক্তি না ঘটালে এ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিজেদের টিকানো মুশকিল হয়ে যাবে। সতর্কতা এবং সাবধানতা ব্যাংকারদের জীবনে সবচেয়ে প্রধান ব্রত হওয়া উচিত। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ও এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। প্রতিটি কাজ করতে হবে ধৈর্য ও পরিণামদার্শিতা সহকারে। সুচিন্তিত কর্মপন্থা ও বিচক্ষণতার সাথে প্রতিটি দিক বিবেচনা করতে হবে। নিজের মনের মধ্যে সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করতে ইতর বিশেষ পার্থক্য করা চলবে না। সকলের জন্য সমান দরদ নিয়ে কাজ করতে হবে। যে কোন ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করা থেকে দূরে থাকতে হবে। ব্যাংক নামক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। এ পেশার মাধ্যমে সেবার পণ্য নিয়ে গণমানুষের একান্ত কাছাকাছি পৌঁছা যায়। ব্যাংকিং একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা; এখানে ঝুঁকি অনেক বেশি। বিনিময়ে ব্যাংকারগণ আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। এ সংবেদনশীল পেশার লোকগুলোর নিকট জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাও অনেক বেশি। তাই ব্যাংকারগণকে অর্থনৈতিক জীবনীশক্তি হিসেবে পরিগণিত হওয়ার জন্য বিশেষ গুণাবলী অর্জন করতে হবে। অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে হতে হবে সার্থক কর্মপরায়ণ, নির্ভীক এবং দূরদর্শী মনোভাবসম্পন্ন। সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার ব্রতকে লালন করে যেতে হবে আচার-আচরণে, কথা-বার্তায় ও চিন্তা-চেতনায়। সময় ও অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব ও নিজত্বকে বজায় রেখে হাসিমুখে হাজির হতে হবে গ্রাহকদের সামনে। প্রতিটি গ্রাহককে স্বাগত জানাতে হবে সদা প্রফুল্ল মন নিয়ে। প্রযুক্তি মানুষের চিন্তা-চেতনা ও মনমানসের পরিধিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘ভারচুয়াল ব্যাংকিং’-এর গবেষণা নিয়ে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো এখন ব্যস্ত সময় অতিক্রম করছে। যেখানে ব্যাংকিং কার্যাবলী পরিচালিত হবে মানববিহীন উচ্চ প্রযুক্তির সাহায্যে। বর্তমানে আমরা বাস করছি ইলেক্ট্রনিক ব্যাংকিং-এর যুগে। এর বদৌলতে গ্রাহক এখন রাত-দিনের যে কোন সময় অনায়াসেই ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারেন। ব্যাংকিং কার্যক্রমকে দ্রুততা ও নির্ভুলতার সাথে সম্পন্ন করার অভিপ্রায়ে উন্নত প্রযুক্তি সম্বলিত কম্পিউটারায়িত প্রক্রিয়া চালু হয়েছে সর্বত্র। এমতাবস্থায় ব্যাংকারগণকে বৈষয়িক জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিক ও মূল্যবোধভিত্তিক জ্ঞানের প্রশিক্ষণ দেয়া হলে ব্যাংকিং শিল্প বিপর্যয়ের হাত থেকে রেহাই পাবে। ‘পেশাজীবীদের মধ্যে সততা ও চারিত্রিক সংহতি না থাকলে এরা নিজেদের স্বার্থে তাদের বুদ্ধিমত্তা, পরিশ্রম ও আন্তরিকতা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানে লাল বাতি জ্বালিয়ে ভেগে যায়’ এমনটিই মনে করেন ওয়ারেন বাফেট। ব্যাংকারগণকে ব্যাংকিং ডিপ্লোমা পরীক্ষা দিতে হয়। এ ডিপ্লোমা পরীক্ষা পাস করে ব্যাংকিং পেশায় কতটুকু নৈতিকতার সবক সম্মানিত ব্যাংকার পেয়ে থাকেন তা বিবেচ্য বিষয়। তবে নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক কিছু বিষয় ডিপ্লোমা পরীক্ষার সিলেবাসভুক্ত করা হলে তারা কিছুটা হলেও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ পেতে পারেন। ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়োজিত অধিকাংশ কর্মীবাহিনীই তাদের উপার্জনে অবৈধ সুবিধার অনুপ্রবেশ ঘটাতে চান না। তবে গুটিকয়েক তাদের পেশাগত নৈতিকতা ঠিক রাখেন না। তারা ভুলে যান তাদের পেশাগত নৈতিকতার কথা, জাতির নিকট তাদের দায়বদ্ধতার কথা। আজ জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তারা কিভাবে সীমিত উপার্জন দিয়ে বিশাল গাড়ি-বাড়ির মালিক হন? জনগণের বিশ্বাসের জায়গাটি সুরক্ষা করতে হলে নৈতিকতার প্রশ্নে ছাড় দেয়া নেহায়েত বোকামি ছাড়া আর কিছুই হবে না। যাদের জন্য পুরো ব্যাংকিং সেক্টরে নৈতিকতার প্রশ্নটি এখন প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে যেন কোন প্রকার গাফিলতি না হয়—এটাই জাতির প্রত্যাশা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অসত্ লোকদের দৌরাত্ম্য বাড়তে দেয়া হলে অচিরেই ব্যাংকিং সেক্টরে অশনি সংকেত বেজে উঠবে। দেশের অর্থনীতির গতিপথও পাল্টে যাবে। ব্যাংকিং সেক্টর থাকবে স্বচ্ছ, এখানে অসত্ ও নীতিহীন লোকদের উপস্থিতি আদৌ কাম্য নয়। এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকের সম্মানিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান মনে করেন, ‘... ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বার্থ নয়, সামাজিক কল্যাণের আদর্শই হবে মূল চালিকাশক্তি। নৈতিক শৃঙ্খলার বিধান অনুসরণ করে সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমন্বয় সাধন করা এ ব্যবস্থার অন্যতম কলাকৌশল’। যে কোন প্রকার ভুল অকপটে স্বীকার করে তা থেকে যথার্থ শিক্ষা নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ভুলের মধ্যে পড়ে থেকে কিংবা কাজে ফাঁকি দিয়ে কখনো মহত্ হওয়া যায় না। মহত্ হতে হলে পেশা ও প্যাশন থাকতে হবে একই। নাকের ডগায় যেন কোন প্রকার দুর্নীতি না হয় সেদিকেও রাখতে হবে সতর্ক দৃষ্টি। অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে কাজ করে যেতে হবে। বসদের কাছে সর্বদা ইয়েস ম্যান না হয়ে মাঝে মাঝে নো ম্যানও হতে হবে। পরামর্শ তাদের থেকেই নিতে হতে যাদের রয়েছে স্বচ্ছ জীবনবোধ, নৈতিক মানসিকতা। ওয়ারেন বাফেট মনে করেন, ‘যাদের কাছে জীবনের লক্ষ্য পূরণে অনুপ্রেরণা ও পাথেয় পাবে, তাদের সাহচর্য তোমার জীবনবোধকে মহত্ ও উন্নত করবে’। স্টিভ জবস বলেছেন, ‘ধার করা জ্ঞান দিয়ে কেউ প্রকৃত জ্ঞানী হতে পারে না, যার মধ্যে সারবত্তা নেই; অথচ ফটফট করে চলছে, তাকে আমি সহ্য করতে পারি না’। সুতরাং যে জ্ঞান নিজস্ব পরিসরে চিন্তা করতে শেখায়, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়ে দেয় সে জ্ঞানই ব্যাংকারদের অর্জন করতে হবে। বর্তমানে ব্যাংকিং-এ বিশাল রেজিস্টারের পরিবর্তে ব্যবহূত হচ্ছে কম্পিউটার, চেকের পরিবর্তে প্লাস্টিক কার্ড। তাই ব্যাংকারগণকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে গতানুগতির ধারার বাইরে গিয়ে চিন্তা করে প্রডাক্ট তৈরি করতে হবে। নতুন কৌশল ও নতুন পথের সন্ধানে চলতে হবে। গ্রাহককে দ্রুত এবং সঠিক সেবা প্রদান, কাগুজে লেনদেন কমানো, তথ্যাবলী যথার্থভাবে সংরক্ষণ করা, সবুজ ব্যাংকিং সফলকরণ, আন্তঃব্যাংকিং লেনদেন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা, গোপনীয়তা রক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রতিফলন দেখাতে হবে। ব্যাংকারকে অর্জন করতে হবে নির্দ্বিধায় সত্য প্রকাশের মানসিকতা, হতে হবে দক্ষতা বৃদ্ধিতে সদা সচেষ্ট, নিয়ম-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, অন্যের বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্যের প্রতি যথাযথ সম্মান, সহকর্মীদের সাথে ক্ষমাসুন্দর আচরণ ও গ্রাহকদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মানসিকতা। বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গি ও অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা পরিহার করে ইতিবাচক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা দিয়ে এদেশটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।