বাংলাদেশে উত্পাদিত বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের মধ্যে নারিকেল হচ্ছে অন্যতম। আমাদের দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে নারিকেল উত্পন্ন হয়ে থাকে। বিশেষ করে নোয়াখালী, সন্দ্বীপ, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সেন্টমার্টিন, বাঁশখালী, বরিশাল, ভোলা, খুলনা, সুন্দরবন অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর পরিমাণে নারিকেল উত্পন্ন হয়ে থাকে। তবে এসব এলাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আজ পর্যন্ত নারিকেল চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এসব এলাকায় বাণিজ্যিকভিত্তিতে নারিকেল চাষের উদ্যোগ নেয়া হলে বছরে কোটি কোটি টাকা আয়ের সুযোগ হত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নারিকেল বহুবিধ কাজে ব্যবহূত হয়ে থাকে। নারিকেল কোন অংশ ফেলনা নয়। নারিকেল গাছের পাতা, ডাল, ফল, ফুল, নারিকেলের ছোবরাসহ প্রতিটি অংশ বিভিন্ন কাজে লাগে। কচি ডাবের পানি তৃষ্ণা নিবারণে এবং বিভিন্ন অসুখে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। নারিকেলের কোপড়া (নারিকেলের ভিতরে শাস) থেকে তৈল উত্পন্ন হয়ে থাকে। নারিকেল তেল বহুবিধ কাজে ব্যবহূত হয়। নারিকেলের তেলের বাজার মূল্য অনেক বেশি। নারিকেলের কোপড়া থেকে তৈল উত্পাদনের সময় খৈল উত্পন্ন হয়। যা গরু-ছাগলের খাদ্য এবং ফসলি জমিতে সার হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। নারিকেল তৈল প্রসাধনসামগ্রী হিসেবে আমাদের দেশে বহুলভাবে ব্যবহূত হয়। নারিকেলের কোপরা বা শাস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু নাস্তা তৈরি করা হয়। নারিকেলের খোসা থেকে যে আঁশ পাওয়া যায় তা সাধারণত কয়ার নামে পরিচিত। এই কথায় এখন সম্ভাবনাময় একটি শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। নারিকেলের কয়ার থেকে উত্পাদিত বিভিন্ন সামগ্রী এখন বিদেশে পর্যন্ত রপ্তানি হচ্ছে।
কয়ার ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, নারিকেলের কয়ার থেকে ম্যাট, দড়ি, পাপোস, ফোম, গদি, মেট্রোস, জাজিমসহ বিভিন্নসামগ্রী তৈরি করা হচ্ছে। যা সীমিত আকারে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। নারিকেলের কয়ার থেকে উত্পাদিত কয়ার রোপের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে দেশের স্বল্পসংখ্যক রপ্তানি কারক কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, বেলজিয়ামে কয়ার কেপ রপ্তানি করছে। বরিশাল, খুলনা, বাগেরহাট অঞ্চলে গ্রামের মহিলারা সম্পূর্ণ হাতের সাহায্যে উন্নতমানের কয়ার রোপ তৈরি করছে। কয়ার থেকে কয়ার নেটও তৈরি করা হয়। এই কয়ার নেটও বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। বিদেশে গাছের বাঁধনের কাজে এই নেট এবং রোপ ব্যবহার করা হয়। প্রতি বছর কয়ার রোপ এবং কয়ার নেট রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। দেশের কয়ার রোপ এবং কয়ার নেট রপ্তানি কারকের দাবী “সরকার যদি এ ব্যাপারে তাদেরকে সহযোগিতা করে তাহলে রপ্তানির পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি করা যাবে এবং দেশের জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হত। নারিকেলের কয়ার থেকে যেসব সামগ্রী তৈরি করা হচ্ছে সেগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি করা গেলে সেগুলো বিদেশে রপ্তানিতে আর কোন সমস্যা থাকবে না। নারিকেলের ভিতরের আঁটিও অনেক কাজে লাগে। নারিকেলের ভিতরের শক্ত খোসা দিয়ে হুক্কা, পেয়ালা, বোতাম এবং বিভিন্ন ডেকোরেশনেরসামগ্রী তৈরি করা হয়। নারিকেলের খোসার বোতাম এবং ডেকোরেশনসামগ্রী বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
এনজিও কর্মকর্তা ফৌজিয়া আমান বলেন, নারিকেলের খোসা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ডেকোরেশনসামগ্রীর ব্যাপারে গ্রামীণ মহিলাদেরকে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে অনেক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হত এবং নারিকেলের খোসা দিয়ে তৈরি ডেকোরেশনসামগ্রী মান উন্নত হত। এ ব্যাপারে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। এতে দেশের অর্থনৈতিক কল্যাণ হত। নারিকেল গাছের পাতা গ্রাম দেশে বাড়ি-ঘরের চালে ব্যবহূত হয়। নারিকেলের ফুলের গায়ে ক্ষত করে যে মিষ্টি রস সংগৃহীত হয় তা দিয়ে মদ এবং ভিনেগার তৈরি করা হয়। নারিকেল গাছের শেকড় নানা রোগের প্রতিশেধক হিসেবে কাজ করে। অর্থকরী ফল নারিকেল যদিও আমাদের দেশের ফল নয়। আজ থেকে কয়েকশত বছর আগে সুদূর ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলো থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে নারিকেল আমাদের দেশে আসে। নারিকেলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকার কারণে পাকিস্তান আমলে তত্কালীন পাকিস্তান সরকার আমাদের দেশে উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যাপকভিত্তিতে নারিকেলের চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। তত্কালীন পাকিস্তান আমলে আমাদের দেশের দ্বীপাঞ্চলগুলোতে ব্যাপকভিত্তিতে নারিকেলের চাষ করায় এখন এসব অঞ্চলে প্রতিবছর ব্যাপক পরিমাণ নারিকেল উত্পন্ন হয়ে থাকে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের দেশে ব্যাপকভিত্তিতে নারিকেল চাষের আর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। আমাদের দেশে নারিকেলের শাসের ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ২১৫ হাজার মেট্রিক টন। এই ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ নারিকেলের শাস আমদানি করতে হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হচ্ছে। অপরদিকে শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নারিকেল তৈল এবং নারিকেলের শাস রপ্তানি করে প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। তাছাড়া ডাবের পানি বোতলজাত করে বিদেশে রপ্তানি করছে সেসব দেশ। সেসব দেশের জাতীয় আয়ে নারিকেলে সম্পদ বিশেষ অবদান রাখছে। আমাদের দেশে নারিকেল চাষে সমৃদ্ধি আনা সম্ভব। নারিকেলের বিভিন্ন উত্পাদন রপ্তানিকারী দেশগুলোর মত আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে নারিকেলের চাষ করলে ব্যাপকভিত্তিতে নারিকেল উত্পাদন করে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। আমাদের দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। বেকার তরুণ ও যুবকদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারিকেল চাষের ব্যাপারে উত্সাহিত করতে হবে। এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিলে সফলতা সহজেই আসবে বলে সবার ধারণা।
