দূষিত পানি ও জনস্বাস্থ্য

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ২১:০১
পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া কোনো জীবের পক্ষে জীবনধারণ সম্ভব নয়। মানুষের ক্ষেত্রে এটি আরো বেশি সত্যি। রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ পকেটের টাকা খরচ করে বিশুদ্ধ পানি পানের জন্য বিভিন্ন কোম্পানির জারের পানি কিনে ব্যবহার করে প্রকান্তরে প্রতারিত হচ্ছেন। জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রতারক পানি ব্যবসায়ীরা হুমকি সৃষ্টি করলেও তা দেখার যেন কেউ নেই। পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের মান পরীক্ষা ছাড়াই সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান পানি বাজারজাত করছে। বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পানিজাত পণ্য বিক্রি করায় এ খাতের বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রাজধানীসহ সারা দেশে জারে করে যে পানি বিক্রি করা হয় তার বেশিরভাগই বিশুদ্ধ নয়। মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য উত্পাদন এবং বাজারজাতকরণে উপযুক্ত মান রক্ষিত না হওয়ায় গত অক্টোবর ও নভেম্বরে ৭৪টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। এর মধ্যে পানি উত্পাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। তারপরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জারে করে পানি বাজারজাত করে চলছে। এমনকি লাইসেন্স বাতিলের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করে পানি বিক্রি করছে। পানি ছাড়া জীবন বাঁচে না। আর জীবন রক্ষায় পানি পান করে যেতে হচ্ছে হাসপাতালে। ডাক্তার ও পানি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দূষিত পানি পান করায় পেটের পীড়া, আমাশয়, কলেরা, জণ্ডিস প্রভৃতি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের অভিমত, এ রকম দূষিত পানি দীর্ঘদিন পান করতে থাকলে আরো জটিল রোগ, এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারও হতে পারে। কিডনি রোগ, আলসার, রক্তচাপ, অ্যাজমা, যক্ষ্মা ইত্যাদি রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। বিশুদ্ধ পানির নামে সারাদেশে দূষিত পানি বিক্রির ব্যবসা এখন রমরমা। দূষিত পানি যে কোনো ভেজাল খাদ্যের চাইতে কম ভয়াবহ নয় জনস্বাস্থ্যের জন্যে। এক সময় পানির অপর নাম জীবন বলা হতো। কিন্তু দূষিত পানির ভয়াবহতা লক্ষ করে এখন বলা হচ্ছে বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন। এই বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তাই এখন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, সব কোম্পানির পানিই কি বিশুদ্ধ? কোম্পানির বাইরেও একশ্রেণির ব্যবসায়ী পানি বিক্রি করছে বিনা বাধায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির খালি বোতল সংগ্রহ করে সেসবে ওয়াসার পানি ভর্তি করে চলছে বিশুদ্ধ পানি বিক্রির ভয়াবহ প্রতারণা। অভিযোগ রয়েছে, অনেক কোম্পানি জার ভর্তি যে পানি বিক্রি করছে সে পানিও ওয়াসার পানি। বিভিন্ন হোটেলে, রেস্তোরাঁয়, দোকানে ফিল্টার পানির নামে এসব পানি দেদারছে বিক্রি হচ্ছে। যারা পানির ক্রেতা তারাও জানে না, টাকা দিয়ে তারা কী বিষ পান করছে। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা বিধান করে বহুরোগ থেকে আত্মরক্ষা করা যায়। দূষিত পানি পানে নানা জটিল রোগের উত্পত্তি হতে পারে। হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, জণ্ডিসের মতো মারাত্মক ব্যাধির উেস থাকে দূষিত পানি। এক্ষেত্রে অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা দিতে না পারলে জনস্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণভাবে হুমকিমুক্ত করা যাবে না। ওয়াসা যে সব নদী থেকে পানি এনে শোধনাগারে শোধন করে রাজধানীবাসীকে সরবরাহ করছে, সে সব নদীর দশা বেশ খারাপ। এসব নদীতে এখনো পানি আছে বটে, কিন্তু সে পানি এতোই দূষিত যে তা মানুষের পানের উপযোগী করার জন্য মূল শোধনাগারে নেওয়ার আগে একটি প্রাক-শোধনাগারে নিয়ে একবার শোধন করতে হয়। অর্থাত্ এসব নদীর পানি এক দফায় শোধনযোগ্য নয়: দুটি পৃথক শোধনাগারে দুই দফায় শোধন করার পরেই কেবল তা মানুষের পানের উপযোগী হয়। কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, বাণিজ্যিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য, এমনকি পয়োবর্জ্য ফেলার কারণে বুড়িগঙ্গার পানি এতোটাই দূষিত যে তা আর পরিশোধনযোগ্যও নেই। ঢাকাবাসীর জন্য এখন ভূপৃষ্ঠের পানির একমাত্র উত্স শীতলক্ষ্যা নদীতেও যেভাবে দূষণ চলছে, তা অব্যাহত থাকলে অচিরে বুড়িগঙ্গার মতো শীতলক্ষ্যার পানিও শোধনের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পানি হলো শরীরের চাহিদার অন্যতম উপাদান। দূষিত পানি শিশুদের সবচেয়ে ক্ষতিকর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, মেধার ক্ষেত্রেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাতি যাতে মেধাশূন্য না হয়ে পড়ে তা নিশ্চিত করতে পানির মান রক্ষায় আরো কড়াকড়ি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স ছাড়া পানি বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা দূষিত পানি বাজারজাত করছে তাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ঢাকা