একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) স্থগিতের ফলে অন্য বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরেক দেশ কানাডাও বাংলাদেশের পণ্যের বড় আমদানিকারক। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের দেয়া জিএসপি সুবিধার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে আপাতত সামান্য প্রভাব পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তা অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাঁদের মতে, এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের অনীহা তৈরি হতে পারে। কারণ শ্রমমানের উন্নতি হয়নি-এমন অভিযোগ তুলে ওবামা প্রশাসন বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেছে। এদিকে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছে।
তবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ ডেলিগেশনের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সে পথে হাঁটবে না। কারণ এটি অনেক বড় সিদ্ধান্ত। ইইউ জানে এ ধরনের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যসহ অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। ওই কর্মকর্তার মতে, ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে তার ৯০ শতাংশই তৈরি পোশাক। আর এই ৯০ শতাংশ পণ্যেই বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পেয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সাথে ইইউ’র সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন সম্পর্ক নেই।
কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি স্থগিতের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা হয়তো নেই। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা কানাডা যদি একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। ইতিমধ্যে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনেও এ শঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। গতকাল বিবিসি’র ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের জিএসপি স্থগিত করায় এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও একই রকম হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ইউরোপ নতুন করে চিন্তা শুরু করবে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক জিএসপি সুবিধা না পেলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে এই সুবিধা পায়। এই সুবিধার আওতায় সেখানে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধায় আমরা রপ্তানি করছি। তারা একই চিন্তা করলে আমাদের জন্য তা বিপদের কারণ হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের পুরো রপ্তানিখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। তিনি এ থেকে উত্তরণে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা, মজুরি, ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সরকার ও মালিক পক্ষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের জন্য সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যর্থতাকে দায়ী করে তিনি বলেন, সরকার ও রাজউকসহ দায়িত্ব পালনকারী সংস্থা, পোশাক উদ্যোক্তা ও তাদের সংগঠন (বিজিএমইএ) কেউই যথাসময়ে দায়িত্ব পালন করেনি। সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি বিভিন্ন স্বল্পোন্নত দেশসহ আফ্রিকার অনেক স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) জোর লবিংও এতে কাজ করেছে।
গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের রপ্তানি পণ্যে এককভাবে তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি পোশাক রপ্তানি হয়। এটি বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ। এই রপ্তানি পণ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে কোন শুল্ক দিতে হয় না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তারা এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা ও তাদের মজুরিসহ অনিষ্পন্ন বিষয়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেয় তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সেই সাথে সেসব দেশের ভোক্তাদের চাপও তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। তবে তিনি মনে করেন, সামপ্রতিক সময়ে তারা কারখানায় কর্ম পরিবেশ (কমপ্লায়েন্স) রক্ষায় সহায়তায় এগিয়ে আসছে। সেই কারণে তাদের কাছ থেকে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া না আসার সম্ভাবনাই বেশি। তবে তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগে ইউরোপের ক্রেতারা নতুন করে চিন্তা করবে - এটাই স্বাভাবিক।
অবশ্য তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী যুক্তরাষ্ট্রের মত এত কঠিন সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেবে না বলেই মনে করেন। তিনি বলেন, তারা তুলনামূলক সহনশীল। শ্রমিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় তারা আমাদের সাথে একযোগে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা যা চায় তা তো রাতারাতি করা সম্ভব নয়। সারা দেশে শিল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এর জন্য সময় প্রয়োজন। তবে তিনি মনে করেন, শ্রমিক নিরাপত্তার জন্য সরকার ও পোশাক মালিকদের সামপ্রতিক উদ্যোগ ও মজুরিসহ অন্যান্য উদ্যোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করবে। একই সাথে তিনি মনে করেন হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য তাদের নেয়া উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেসের (জিএসপি) আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ হাজার ধরনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তবে এর মধ্যে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক নেই। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ক্রীড়া সরঞ্জাম, তামাক, প্লাস্টিক পণ্য ও সিরামিক পণ্য এই সুবিধার আওতায় রপ্তানি করে থাকে। গত অর্থবছরে জিএসপির আওতায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের এই ধরনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি হয়েছে। এতে তারা শুল্ক ছাড় পেয়েছেন ২০ লাখ ডলারের মতো। অন্যদিকে ৪৯০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা শুল্ক বাবদ ৭৩ কোটি ডলার দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকে।
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট রপ্তানি করেছে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে মোট রপ্তানির ২১ শতাংশ (৫০০ কোটি ডলার)। তবে এর মধ্যে এক শতাংশ পণ্যেও জিএসপি সুবিধা পাওয়া।
হতবাক বিজিএমইএ
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক এ সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। গতকাল সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে সংগঠনের সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ একতরফা সিদ্ধান্তে আমরা হতবাক, আশাহত হয়েছি। তিনি বলেন, এটি তাদের প্রতিক্রিয়ার একটি অতিরিক্ত বহিঃপ্রকাশ। বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা তৈরি পোশাক খাত পাচ্ছে না। দেশটিকে জিএসপি’র বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
