মোবাইল ফোনেই যেন তারুণ্যের ভুবন

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ২২:৪১
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শুভ। পরিবারের সঙ্গে থাকেন উত্তরায়। লেখাপড়ার পাশাপাশি নানা সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তার। সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে নিয়মিত বিচরণ করেন। আগে নানা ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হলেও এখন স্মার্ট ফোনের কল্যানে সবকিছুই তার হাতের মুঠোয়। মোবাইলে তিনি সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো দেখছেন, মন্তব্য করছেন, পড়াশোনার বিষয়ও শেয়ার করছেন বন্ধুদের সঙ্গে, অভিধান থেকে শুরু করে দরকারি যে কোন তথ্য মুহূর্তেই খুঁজে নিতে পারেন মোবাইল ফোনে। তাই মোবাইল ফোন ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না তার। মোবাইল ফোনেই যেন শুভর পৃথিবী। শুভ’র মতো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের সবার কাছেই মোবাইল ফোন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। মোবাইল ফোন ছাড়া তাদের এক মুহূর্তও কাটে না। কথা বলার পাশাপাশি মোবাইল ফোনে বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহার। তাই বাংলাদেশে এখন স্মার্ট ফোনের চাহিদা বাড়ছে দ্রুত গতিতে। মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ফয়সল আলীম জানালেন এমন তথ্যই। তার মতে, দেশে এখন অর্ধকোটি মানুষের হাতে রয়েছে স্মার্ট ফোন। গত এক বছরে বৈধ পথেই দেশে এসেছে সাড়ে ২৪ লাখ স্মার্ট ফোন। আগামী এক বছরে আসবে আরো অর্ধকোটি স্মার্ট ফোন। তিনি বলেন, দিন দিন এই চাহিদা বাড়ছে। গত দুই বছর হল অল্প টাকায় স্মার্ট ফোন পাওয়ার কারণে তরুণরা এদিকে বেশি ঝুঁকেছেন। তার মতে, আগামী তিন বছরের মধ্যে ৮০ ভাগ মোবাইল ব্যবহারকারীর হাতে উঠবে স্মার্ট ফোন। দামও আরো কমে লাগালেই থাকবে। তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপনের মতে, মোবাইল ফোন জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার ফল এখন মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ফরম কিনতে লাইনে দাঁড়াতে হয় না। মোবাইল ফোনেই সব মিলছে। এখন তো টাকা পয়সার লেনদেনও হচ্ছে মোবাইল ফোনে। এই ফোনেই তরুণ প্রজন্ম হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলেছে গোটা বিশ্বকে। বিটিআরসির হিসাবে বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল ফোনের গ্রাহক প্রায় সাড়ে ১০ কোটি। আর ইন্টারনেটের গ্রাহক ৩ কোটি ৩৮ লাখ। এর মধ্যে ৩ কোটি ৩২ লাখ মানুষ মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। সম্প্রতি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারে সক্ষম যন্ত্রের বিক্রি বাড়ছে। তবে এর মধ্যে মোবাইল যন্ত্রের সংখ্যাই বেশি। ডেস্কটপ কম্পিউটারের চেয়ে গ্রাহকদের মূল পছন্দে পরিণত হয়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা-সংবলিত মোবাইল ডিভাইসগুলো। এ ডিভাইসগুলোর অন্যতম স্মার্ট ফোন। মোবাইল ডিভাইসগুলোর বিক্রির পরিমান ২০১৩ সালে শতকরা ৫ দশমিক ৯ ভাগ বেড়েছে গত বছরের তুলনায়। বছর শেষে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ডিভাইসের সংখ্যা দাঁড়াবে ২৩৫ কোটিতে। মোবাইল ডিভাইসের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে গ্রাহকদের আগ্রহই বড় ভূমিকা রাখছে। জরিপে আরো বলা হয়, চলতি বছর প্রচলিত ডেস্কটপ কম্পিউটারের বিক্রি শতকরা ১০ দশমিক ৬ ভাগ কমে যাবে। সিটিসেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেহেবুব চৌধুরী বলছিলেন জীবনের সঙ্গে মিশে যাওয়া এই মোবাইল ফোনের পেছনের কথা। ১৯৮৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম মোবাইল ফোন আসে বাংলাদেশেই। আর প্রথম মোবাইল ফোন সেবা নিয়ে আসে যে প্রতিষ্ঠান তার নাম সিটিসেল। দেড় লাখ টাকা দামের সেই মোবাইল ফোনে কথা বলতে প্রতি মিনিটে খরচ হতো ৩২ টাকা। অভিজাত ব্যবসায়ী বা সরকারি ঊর্ধ্বতনরাই তখন এই মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন। মোবাইল সেটটির সাইজও ছিল বেশ বড়। ২০০০ সালে নোকিয়া আর সিমেন্স প্রথম ছোট আকৃতির মোবাইল ফোন বাজারে আনে। সেই বিশাল সেট বদলে মানুষের হাতে আসতে থাকে ছোট আকৃতির ফোন। দামও কমতে শুরু করে। আর ২০০৬ সালে মোবাইল ফোনে ডেটা সার্ভিস চালু হয়। এরপরই দ্রুত বদলে যেতে থাকে সবকিছু। এখন অনেকটা সাশ্রয়ী দামের স্মার্ট ফোনের কল্যাণে তরুণদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে পুরো পৃথিবী। একটি বেসরকারি ব্যাংকে উচ্চ পদে চাকরি করেন জাহিদ জামান (ছদ্ম নাম)। তার ছেলে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছেলের হাতে স্মার্ট ফোন দিয়ে খুব খারাপ অভিজ্ঞতাই হয়েছে তার। অল্প বয়সেই ছেলের হাতে মোবাইল তুলে দেয়ায় বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ইন্টারনেটে পর্নোছবি দেখে, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে ছেলেটি। যদিও এই সংকটগুলো টের পাওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে ছেলেকে ওই পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। জাহিদ জামানের মতো অনেক অভিভাবকের এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে সন্তানের অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহার থেকে। বাংলাদেশের এখন প্রতিটি ঘরেই অভিভাবকদের একই রকমের অভিজ্ঞতা। অন্য অভিভাবকদের প্রতি জাহিদ জামানের পরামর্শ, অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিলেও সার্বক্ষণিক নজরের মধ্যে রাখতে হবে। আর স্মার্ট ফোনের ব্যাপারে আরো সতর্ক থাকতে হবে। মোবাইল ফোন অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ খান বললেন, কোন প্রযুক্তির খারাপ দিক নেই? কে কিভাবে ব্যবহার করছে সেটিই আসল কথা। তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে তথ্য প্রযুক্তির সার্বক্ষণিক যোগ সূত্র ঘটিয়েছে এই মোবাইল ফোন। আর তরুণদেরই যে কোন নতুন প্রযুক্তি বেশি আকর্ষণ করে। মোবাইল ফোনের কোন অপশনটি তরুণদের বেশি টানে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মোবাইল কোম্পানির নেটওয়ার্ক এড়িয়ে ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো বেশি ব্যবহার করেন তরুণরা। কারণ ওয়াইফাইতে তাদের কোন বিল পরিশোধ করতে হয় না। কিন্তু মোবাইল কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে তাদের বিল পরিশোধ করতে হয়। যদিও ওয়াইফাই সুবিধা এখনও যথেষ্ট নয়। তারপরও যেখানে গেলে ফ্রি কানেকশন পাওয়া যায় তরুণরা সেই সব জায়গায় ব্যবহার করে। গত ফেব্রুয়ারিতে স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে টেলিনরের ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের প্রধান আব্রাহাম ফ্স ইত্তেফাককে বলেছিলেন, ‘এনএফসি’ (নেয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন) সেবার মাধ্যমে মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করা যাবে মানিব্যাগের বিকল্প হিসেবে। এনএফসি’র জন্য বিশেষভাবে তৈরি স্মার্ট ফোন হ্যান্ডসেটে একটি বারকোড সংযুক্ত থাকবে। এই বারকোড ব্যবহার করে গ্রাহকরা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে কেনাকাটাসহ সব ধরনের ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে পারবেন। এই সেবা কার্যক্রম প্রচলিত মোবাইল ব্যাংকিং এর চেয়ে পৃথক। প্রচলিত মোবাইল ব্যাংকিং-এ এসএমএস কিংবা মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে নির্ধারিত ব্যাংকের একাউন্ট ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ‘এনএফসি’ সেবায় হ্যান্ডসেটের বারকোডটিই কাজ করবে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। বারকোডের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডেই লেনদেনের পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন হয়ে যাবে। ফলে বিদ্যুত্, পানি কিংবা গ্যাস বিল পরিশোধের কাজটি নিমিষেই সম্পন্ন হয়ে যাবে। যে কোন কেনাকাটার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনও হবে ঝুঁকি ছাড়াই। বাংলাদেশে এনএফসি কার্যক্রম শুরু করার ব্যাপারে আগ্রহী গ্রামীণফোনের মূল প্রতিষ্ঠান টেলিনর। আর এই সার্ভিস চালু হলে মোবাইল ফোনই হয়ে উঠবে জীবনের সবচেয়ে বড় অনুসঙ্গ।