চালের বাজার অস্থির

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ২২:৪৪
চলতি বোরো মৌসুম পুরোপুরি শেষ না হতেই অস্থির হয়ে উঠেছে চালের বাজার। অথচ এবার বোরোর ফলন গত কয়েক বছরের মধ্যে ভালো। দেশে আসেনি বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগও। তারপরও গত ১৫ দিনের ব্যবধানে মানভেদে প্রতি কেজি চালে ৩ থেকে ৪ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রান্তিক কৃষকের হাতে এখন ধান না থাকায় অসাধু মিলার ও মজুদদাররা ধানের বাজার নিয়ে কারসাজি শুরু করছে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ধান ৫৫০ থেকে ৬’শ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৭১০ থেকে ৮০০ টাকা দরে। গত এক-দেড় মাসের ব্যবধানে প্রতি মণ ধানে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে চালের বাজারের উপর। ধানের দাম বাড়ার পাশাপাশি মিলাররা বিভিন্ন অজুহাতে চাহিদা অনুযায়ী চাল সরবরাহ করছে না। ফলে দাম বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে রাজধানীর বাদামতলী ও বাবুবাজার চাল আড়ত মালিক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক হাজী নিজামউদ্দিন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, গত ৪ বছর চালের দাম কম ছিল। এবার কিছুটা বেড়েছে। চালের দাম না বাড়লে কৃষক ধানের দাম পেত না। কিন্তু এখনতো কৃষকের হাতে ধান নেই, সব ধান মিলার- মজুদদারদের হাতে। তাহলে কৃষকের লাভ কিভাবে হলো? এ প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, একটা অটো রাইস মিলের উত্পাদন চালু রাখতে প্রচুর পরিমাণে ধানের প্রয়োজন হয়। যে কারণে মিলাররা প্রতিযোগিতা করে ধান কেনেন। এর প্রভাব পড়ে ধান ও চালের বাজারের উপর। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কাওরানবাজার ও নিউমার্কেটসহ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৫ দিনের ব্যবধানে রাজধানীতে বিভিন্ন চালের কেজিতে মানভেদে ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়ে মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা, বিআর-২৮ জাতের চাল ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা পাইজাম/লতা ৩৬ থেকে ৪০ টাকা, নাজিরশাইল/ মিনিকেট মানভেদে ৩৭ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। হঠাত্ করে চালের দাম বাড়ায় উদ্বিগ্ন স্বল্প আয়ের মানুষ। গতকাল কাওরানবাজারে বাজার করতে আসা আকরাম উদ্দিন বলেন, রমজান শুরু না হতেই সবকিছুর দাম বাড়তে শুরু করেছে। প্রতি বছর এ সময় চালের দাম কম থাকলেও এবার উল্টো বাড়ছে। খুলনায় কেজিতে বৃদ্ধি ৫ থেকে ৭ টাকা খুলনা অফিস থেকে রেজাউল করিম জানান, রমজানের আগেই খুলনায় চালের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রকার ভেদে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। দাম বাড়ায় বেচাকেনাও তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। খুলনার পাইকারী বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বালাম-২৮ চাল ৩২/৩৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। সেই চাল গতকাল মঙ্গলবার বিক্রি করা হয়েছে ৩৮ টাকা কেজি দরে। একই সময় মোটা দেশি যেখানে বিক্রি হতো ২৩ টাকা কেজি দরে, গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ২৮ টাকা কেজি। ৩৫ টাকা দরের ভাল মিনিকেট এক সপ্তাহের ব্যবধানে হয়েছে ৪০/৪২ টাকা। স্বর্ণা (দিনাজপুর) সপ্তাহখানেক আগে বিক্রি হয়েছে ২৯ টাকা কেজি, গতকাল বিক্রি হয়েছে ৩৪ টাকা দরে। এক সপ্তাহ আগে বুলেট বিক্রি হয়েছে ২৭ টাকা কেজি দরে, গতকাল তার দাম ওঠে ৩০/৩১ টাকা প্রতি কেজি। স্থানীয় জাত-২৮ সপ্তাহখানেক আগে ২৭/২৮ টাকা দরে বিক্রি হলেও গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৩৪/৩৫ টাকা কেজি দরে। খুলনা বড় বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী ফয়সাল স্টোরের মালিক বাবুল হোসেন বলেন, বড় ব্যবসায়ীরা চাল গুদামজাত এবং মিল মালিকরা চাল মজুদ করায় বাজারে চালের সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে দাম বাড়াচ্ছেন বিক্রেতারা। ওয়াহিদ ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল ওয়াহিদ জানান, খাদ্য বিভাগের সাথে ভুল বোঝাবুঝির কারণে রূপসা উপজেলার ২৫টি রাইস মিলের সাথে এবার সরকারি গুদামে চাল দেয়ার কোন চুক্তি হয়নি। ফলে তাদের মিলে চাল নেই বললেই চলে। বিকিকিনিও নেই। এ মিলগুলো সচল থাকলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকতো। বড়বাজারের পাইকারি বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম জানান, মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করার ফলে বাজারে চালের সরবরাহ কমে গেছে। এ প্রসঙ্গে ধান-চাল বণিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব মুনীর আহম্মদ বলেন, বাজারে সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত। রাইস মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, ধানের সংকট কিছুটা সৃষ্টি হওয়ায় চালের দাম বেড়েছে। রমজানের আগেই পিঁয়াজে দামের ঝাঁঁজ এক মাসে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ পর্যন্ত রমজান শুরু না হতেই বাড়তে শুরু করেছে পিঁয়াজের দামের ঝাঁজ। গত এক মাস ধরেই বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই খাদ্য পণ্যটির দাম। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)’র হিসাবে এই সময়ের মধ্যে দেশি পিঁয়াজ ২৬ দশমিক ৮১ শতাংশ ও আমদানিকৃত পিঁয়াজ ১৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কাওরানবাজার ও নিউমার্কেটসহ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশি পিঁয়াজ প্রতি কেজি ৩৮ থেকে ৪০ টাকা ও আমদানিকৃত পিঁয়াজ ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হয়, যা গত সপ্তাহে যথাক্রমে ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা ও ২৮ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া এক মাস আগে দেশি পিঁয়াজ প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩২ টাকা ও আমদানিকৃত পিঁয়াজ ২৬ থেকে ২৭ টাকায় বিক্রি হয়। কাওরানবাজারের পিঁয়াজ ব্যবসায়ী জসিমউদ্দিন বলেন, রমজানে পিঁয়াজের চাহিদা বাড়ে। রমজান শুরু না হলেও এখনই অনেকে বেশি করে পিঁয়াজ কিনে রাখছেন, যেকারণে চাহিদা বাড়ায় দাম বেড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পিঁয়াজের দাম বাড়ার কোন কারণ নেই। দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম বাড়তির দিকে থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পড়তির দিকে। এক মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজারে যে পিঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৭৫ ডলারে এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৫৯ ডলারে। এছাড়া রমজানে চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে পিঁয়াজ মুজদ রয়েছে। রমজানে দেশে তিন লাখ টন চাহিদার বিপরীতে মজুদ রয়েছে তিন লাখ ৬১ হাজার ৫৯৭ টন পিঁয়াজ। তাই দাম বাড়ার কোন কারণ নেই। গতকাল কাওরানবাজারে বাজার করতে এসে ক্রেতা শফিকুল বলেন, টিসিবি যদি চিনি ও ভোজ্যতেলের পাশাপাশি পিঁয়াজও বিক্রি করতো তাহলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজি করতে পারতো না। রাজশাহীতে সিন্ডিকেটের কারসাজি রাজশাহী অফিস থেকে আনিসুজ্জামান জানান, রাজশাহীতে অসাধু সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে ধান-চালের দাম বাড়িয়েই চলেছে। গত দুই সপ্তাহে রাজশাহীতে বোরো ধানের দাম বেড়েছে মণপ্রতি ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা। রাজশাহীর হাটগুলোতে আগে প্রতিমণ ধান (৪০ কেজি) ৫৫০ থেকে ৬শ’ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ৭৫০ থেকে ৯শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বাজারে ধানের সঙ্কটকে দায়ি করছেন। আর ধান সঙ্কটে বাড়ছে চালের দামও। সূত্র জানায়, ধান চালের বড় ব্যবসায়ীরা মৌসুমের সময় সিন্ডিকেট করে কম দামে ধান কেনে। কিন্তু ধান যখন কৃষকের হাতছাড়া হয় তখন কৌশলে একই সিন্ডিকেট দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটে নেয়। এদিকে মিলাররা বাজারে ধানের দাম বাড়ার অজুহাতে চালের দাম বাড়িয়ে চলেছে। বৃহস্পতিবার রাজশাহীর কুমারপাড়ার আড়তে ৮৪ কেজির প্রতিবস্তা গুটি স্বর্ণা ২৬শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দু’সপ্তাহ আগে একই চালের দাম ছিল সর্বোচ্চ ২২শ’ ৫০ টাকা। একইভাবে ২৫শ’ টাকার বিআর-২৮ চাল বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার টাকায়, ৩৮ টাকা কেজির মিনিকেট ৪০ থেকে ৪৪ টাকায় এবং ৪৫ টাকার বাসমতি ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ধান-চালের দাম বৃদ্ধির কারণে ভাটা পড়েছে সরকারের সংগ্রহ অভিযানে। সরকার কিনছে প্রতিকেজি ধান ১৮ টাকা ৫০ পয়সা এবং চাল ২৯ টাকা কেজি দরে। বাজার মূল্য বেশি হওয়ায় এই দামে মিলাররা সরকারকে চাল দিচ্ছে না। ফলে তারা নানা অজুহাতে দাম বাড়াতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দরকষাকষি করছেন। রাজশাহী জেলা মিল মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, ধান-চালের দাম বাড়ায় তারা সরকারকে চাল দিতে পারছেন না। এজন্য মিলারদের কথা বিবেচনায় কেজিতে ৩ টাকা করে দাম বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।