বেশ কিছুদিন ধরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির (ভারতের মুদ্রা) মূল্য কমছে। ফলে ভারতের আমদানিকারকদের পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত রুপি গুনতে হচ্ছে। অনুত্সাহিত হচ্ছে আমদানি। এদিকে ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হওয়ায় বাংলাদেশের রফতানিকারকরা রফতানির বিপরীতে আগের তুলনায় কম টাকা পাবেন। যা বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য নেতিবাচক। একদিকে রুপির অবমূল্যায়ন অন্যদিকে টাকা শক্তিশালী হওয়ায় ভারতে বাংলাদেশের রফতানিতে প্রভাব পড়তে পারে। বাড়তে পারে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি।
এদিকে রুপির মূল্য কমায় ভারতের রফতানিকারকরা লাভবান হবে। রফতানির বিপরীতে তারা আগের তুলনায় বেশি রুপি পাবেন। আর বাংলাদেশে টাকার মূল্য বাড়ায় আমদানির বিপরীতে আগের তুলনায় কম টাকা খরচ করতে হবে। বিধায় বাংলাদেশ আমদানি বাড়াতে চাইবে। এমনিতেই ভারত থেকে প্রচুর আমদানি করে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় রফতানি কমে আমদানি বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বেড়ে যেতে পারে।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার এক ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য সর্বোচ্চ ৫৯ দশমিক ৯৩ ছিল। যা ভারতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অচিরেই রুপি শক্তিশালী হওয়ার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর কারণ, ভারত সরকার বিদেশি বিনিয়োগ অনুত্সাহিত করছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। একইসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত থেকে তাদের দেয়া প্রণোদনাও তুলে নিচ্ছে। ফলে সামনে রুপি আরো অবমূল্যায়িত হতে পারে। এদিকে বাংলাদেশে ডলারের বিপরীতে টাকা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। অব্যাহতভাবে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি এবং রফতানি বৃদ্ধি ও আমদানি কমায় ডলারের বিপরীতে টাকা ৮৮ টাকা থেকে কমে ৭৭ টাকায় নেমে এসেছে। টাকা শক্তিশালী হওয়ায় বাংলাদেশের রফতানিকারকরা রফতানির বিপরীতে কম টাকা পাচ্ছেন। ফলে রফতানিকারকরা অনুত্সাহিত হচ্ছেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে দাম স্থিতিশীল রেখে রফতানিকারক ও প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রেরকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে চাইছে। এদিকে টাকার মূল্য বাড়ার পাশাপাশি রুপির মূল্য কমায় ভারতে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশ যা আমদানি করে তার বেশিরভাগই প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিধায় দামের পরিবর্তন হলেও চাহিদার পরিবর্তন কম হয়। তাই বাংলাদেশের আমদানি কমবে না। তবে রুপির অবমূল্যায়ন হওয়ায় ভারতে আমাদের রফতানি কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই বাণিজ্য ঘাটতি কমবে না।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অব কমার্সের (ডিসিসিআই) সভাপতি মো. সবুর খান ইত্তেফাককে বলেন, টাকা শক্তিশালী হলে অর্থনীতির জন্য ভালো হলেও রফতানিকারকরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বাংলাদেশ যেহেতু বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল তাই টাকার মান স্থিতিশীল থাকাই ভালো। তিনি আরো বলেন, ভারত অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে চাচ্ছে। এক্ষেত্রে রুপির অবমূল্যায়ন হওয়া তাদের জন্য ইতিবাচক। কারণ রুপি অবমূল্যায়ন হওয়ায় তাদের আমদানি অনুত্সাহিত হবে, পাশাপাশি রফতানি উত্সাহিত হবে। ফলে দেশীয় শিল্পায়ন উত্সাহিত হবে। তাই বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যে কিছুটা প্রভাব পড়বে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এমনিতেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। গত অর্থ বছরে বাংলাদেশের সাথে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় সোয়া চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ধীরে ধীরে দেশটির সাথে এ ঘাটতি আরো বেড়ে যাচ্ছে। আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের সঙ্গে চোরাই পথে আসা পণ্যের হিসাব করলে ঘাটতির পরিমাণ আরো অনেক বেড়ে যাবে। কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংকের দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে ভারত থেকে আসা ৮৩ শতাংশ পণ্য আসে চোরাই পথে। এ অবস্থায় ভারতে বাংলাদেশের রফতানি প্রভাবিত হলে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়তে পারে। মূলত ভারতের রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির কারণেই ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে। তবে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ভারতের বাণিজ্যে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ও বাংলাদেশের আখাউড়ার মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনে সম্মত হয়েছে ঢাকা ও দিল্লী। নতুন এ সংযোগ আন্তঃসীমান্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। গত দুই বছরে উত্তর-পূর্ব ভারতের ৭টি অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর ‘সীমান্ত হাট’ স্থাপনে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের কিছু পণ্যে ভারত শুল্ক সুবিধা দিলেও অশুল্ক বাধার কারণে এর মাধ্যমে খুব একটা উপকৃত হচ্ছে না বাংলাদেশ।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতে যখন বিভিন্নমুখী সমস্যা দেখা যাচ্ছে সে সময়ে ভারতে রুপির মূল্য কমতে থাকায় বিশ্ববাজারে পোশাক রফতানিতে ভারতের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। পোশাক খাতের জন্য যেসব কাঁচামাল আমদানি করতে হয় ভারত সরকার তাতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়ে শিল্প উদ্যোক্তাদের উত্সাহ দিতে চেষ্টা করছেন।
