বগুড়ার কাহালু উপজেলায় যোগাড়পাড়া গ্রামে বহুল আলোচিত ট্রাকভর্তি গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পর ১০ বছর চলে গেছে। অথচ আজ পর্যন্ত ওই গুলি ও বিস্ফোরক চালানের গন্তব্য কোথায়, কে বা কারা এ চালানের মালিক তাদের শনাক্ত করা যায়নি। অভিযোগ মতে, ঘটনার প্রায় দুই মাস পরে এলাকার নিরীহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে দায়সারা গোছের চার্জশিট দেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তকারী কর্মকর্তা মুন্সি আতিকুর রহমান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, এই গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধারের মামলায় সঠিক তদন্ত হয়নি। মোটা অংকের টাকা উেকাচ নিয়ে মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে অবসরে থাকা এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ২০০৪ সালের আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় সাজানো জজ মিয়া নাটকের অন্যতম রূপকার। গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধারের মামলার প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত প্রসঙ্গে নিজের বক্তব্য জানতে গতকাল ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে মুন্সি আতিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
২০০৩ সালে ২৭ জুন সন্ধ্যায় সিলেট থেকে ট্রাক ভর্তি গুলি ও বিস্ফোরকের চালানটি যোগাড়পাড়ায় নাগর নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছায়। গোপন সূত্রে সংবাদ পেয়ে পুলিশ বিস্ফোরক ও গুলি উদ্ধার করে। এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে কাহালু ও দুপচ্াচিয়া থানায় চারটি মামলা দায়ের করে। এই ঘটনায় তখন দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। কোন কোন মহল দাবি করে, এই গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্য জঙ্গী সংগঠনের এবং অন্য একটি মহল ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফার চালান। নাগর নদী দিয়ে আত্রাই ও রানীনগর পর্যন্ত সহজেই যাওয়া যায়। ওই সময় আত্রাই ও রানীনগর ছিল জঙ্গীদের বড় ঘাঁটি। আলোচিত মামলা প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে ওই সালের ১৬ জুলাই সিআইডিতে মামলার তদন্তভার ন্যাস্ত হয়। এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমানকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। মাত্র দুই মাসের মাথায় ১৩ সেপ্টেম্বর অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের মামলায় ছয় জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়।
চার্জশিটভুক্তরা হলেন যোগাড়-পাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আফলাকুর রহমান পিন্টু, তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম বিথি, ট্রাক মালিক আশিষ দেব বর্মণ, পিন্টুর দুই আত্মীয় বগুড়া শহরের বাসিন্দা আতিকুর রহমান দুলু ও হারুনুর রশীদ এবং ট্রাক চালক আলতু মিয়া। এদের মধ্যে পিন্টু ও ট্রাক মালিক পলাতক। অপর চার জন জামিনে রয়েছেন।
একাধিক সূত্রের মতে, উক্ত ট্রাকের মালামাল রাখার জন্য পিন্টুর বাড়ি ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া করা হয়। বগুড়ার দুই আত্মীয় এই মালামাল রাখার জন্য পিন্টুকে বলেছিলেন। তদন্তে বিষয়টি অন্ধকারে রাখা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে চারজন মামলার কার্যক্রম স্থগিত করতে উচ্চ আদালতে আবেদন করেছিলেন। পরে মামলাটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন স্থগিত ছিল। তবে এই মামলার অধিকতর তদন্ত করে রহস্য উদঘাটন করা উচিত ছিল বলে শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। তাদের মতে, ওই সময় মামলাটি তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়। বগুড়ার পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আলোচিত মামলাটির বিচার কাজ বগুড়ার আদালতে আবার শুরু হয়েছে।
কাহালু (বগুড়া) সংবাদদাতা আব্দুস ছালেক জানান, ২০০৩ সালের ২৭ জুন বিকেলে সিলেট থেকে গুলি ও বিষ্ফোরক ভর্তি একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ট-১১-৩৩৬৬) প্রথমে যোগাড়পাড়া গ্রামের কাছে ইয়াছিন আলীর ইটভাটার পাশে এনে রাখা হয়। এরপর সেখানে সন্ধ্যা রাতে ট্রাক থেকে গুলি ও বিস্ফোরক খালাস করার সময় দুপচাঁচিয়া ও কাহালু থানার পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ট্রাকসহ ৫০ হাজার চায়নিজ রাইফেলের গুলি ও ৮৫ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করে। তবে ট্রাকে আনা অবশিষ্ট গুলি ও বিস্ফোরক ওই গ্রামের সৈয়দ আফলাকুর রহমান পিন্টুর বাড়িসহ আশপাশের স্থানে রাখা হয়। কিন্তু ওই রাতে পুলিশি অভিযানের কারণে গুলি ও বিস্ফোরকগুলো পাশে নাগর নদী ও পুকুরে ফেলে দেয়া হয়। এরপর পুলিশ সেখানে মাসব্যাপী অভিযান চালিয়ে মোট ৯৯ হাজার ৯৮৯টি চায়নিজ রাইফেলের গুলি এবং ১৭৪ কেজি শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় পিন্টুকে প্রধান আসামি করে কাহালু ও দুপচাঁচিয়া থানায় ৪টি মামলা দায়ের করা হয়। তবে এ মামলায় পিন্টুর স্ত্রী বিথি, ট্রাক চালক আলতু মিয়াসহ আরো দুই আসামি জামিনে রয়েছেন এবং মামলার প্রধান আসামি পিন্টু ও হবিগঞ্জের আশিষ দেব বর্মন এখনও পলাতক রয়েছে। এদিকে ২০০৫ সালে আসামি পক্ষ থেকে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য একটি রিভিশন মামলা দায়ের করলে আদালত মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়।
গোলাবারুদ উদ্ধার ঘটনার ১০ বছর গড়িয়ে গেলেও এর মূল হোতা কে তা আজও জানা সম্ভব হয়নি। মামলায় পিন্টুকে প্রধান আসামি করা হলেও দরিদ্র পিন্টুর পক্ষে এতবড় গুলি-বিস্ফোরকের চালান আনা সম্ভব নয় বলে অনেকের ধারণা। এদিকে ঘটনার রাতে জোরদার পুলিশি অভিযান চলায় অবস্থা বেগতিক দেখে পিন্টু কাদামাখা শরীরে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। সূত্রমতে, বর্তমানে সে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর এলাকায় বসবাস করছে।
এদিকে মামলাটি নিষ্পত্তি না হবার কারণে গুলি-বিস্ফোরক বহনকারী মালিকবিহীন ট্রাকটি এখনও কাহালু থানায় পড়ে আছে।
