গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে ধরা হচ্ছে তিনটি প্রধান ভোট ব্যাংককে। প্রথমত গার্মেন্টস কর্মী। দ্বিতীয়ত সংখ্যালঘু ভোটার। তৃতীয়ত ইসলামপন্থি ও হেফাজত কর্মীদের ভোট। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ইসলামপন্থিদের ভোট খুব বেশি সংখ্যায় ‘এধার-ওধার’ হয় না বলেই ধরে নেয়া হয়। সেই হিসেবে এই নির্বাচনের জয় পরাজয়ের ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে হাজির হতে পারে প্রায় দেড় লাখ গার্মেন্টস কর্মীর ভোট। সেই ভোট ব্যাংক দখলে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মেয়র প্রার্থীরা। জানা গেছে, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় দু্ই হাজারের বেশি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে তিন লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত। এদের প্রায় অর্ধেক অর্থাত্ প্রায় দেড় লাখ এই এলাকার ভোটার। ফলে সবারই প্রধান লক্ষ্য এই গার্মেন্টস কর্মীরা। তুরাগ নদীর উত্তরে ক্রমবিকাশমান শিল্প মহানগরী গাজীপুরে রয়েছে দুই হাজারের বেশি শিল্প-কল-কারখানা, যার অধিকাংশ তৈরি পোশাক শিল্প। তিন লাখ নারী ও পুরুষ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন এসব ফ্যাক্টরিতে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবিকার সন্ধানে আগত বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের মধ্যে অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং ভোটার হয়েছেন। ফলে গার্মেন্টস কর্মীদের সমর্থন টানতে দুই মেয়র প্রার্থীই ভিন্ন কৌশলে প্রচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৪ দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন প্রচার কাজে অংশ নিয়ে আজমত উল্লাহ খানকে শ্রমিকবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বর্তমান সরকার শ্রমিকদের কল্যাণে কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে সেসব ফিরিস্তি তুলে ধরছেন। গার্মেন্টস কর্মীদের ভোট টানতে আজমত উল্লাহ খান প্রচারণায় বলছেন, তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে গাজীপুরকে একটি শ্রমিক বান্ধব সিটিতে রূপান্তর করবেন। শ্রমিকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা, রাস্তায় রাতে নিরাপদে চলাচলের জন্য বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা করবেন। অপরদিকে অধ্যাপক মান্নান প্রচারণায় বলছেন, তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আবাসন গড়ে তুলবেন। তাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য আলাদা হাসপাতাল এবং সন্তানদের স্বল্প খরচে শিক্ষার ব্যবস্থা করবেন।
শ্রমিকদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেছেন, কোন অপপ্রচার ও মিথ্যাচারের কাছে গাজীপুরবাসী আত্মসমর্পণ করবে না। শ্রমিক স্বার্থবিরোধী সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বিগত বিএনপির আমলে। সে সময় শ্রমিকদের গুলি খেয়ে মরতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি এবং যথাসময়ে মালিকদের তা প্রদান নিশ্চিত করেছে। তাই শ্রমিকদের নিজেদের স্বার্থে আজমত উল্লাহ খানকে নির্বাচিত করা উচিত।
এদিকে একই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে শ্রমিক নেতা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের সাথে নিয়ে শ্রমিক অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভায় বক্তব্য রাখছেন। তিনি বর্তমান সরকারের সময় সংঘটিত সাভার ট্র্যাজেডি, তাজরিন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ড, জিএসপি সুবিধা বাতিলসহ নানা ইস্যু তুলে ধরে শ্রমিকদের অধ্যাপক মান্নানের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন। অপরদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৫০০টি মসজিদ, ২০০টি হাফিজিয়া ও কওমি মাদ্রাসা রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যরা রয়েছেন। এ কারণে এখানে জামায়াতসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনের বড় সংখ্যক সমর্থক রয়েছে। আওয়ামী লীগের আজমত উল্লাহ খান ও বিএনপির অধ্যাপক এম এ মান্নান নিজেদের ইসলামের পক্ষের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের। তাদের প্রকাশ্য প্রচারেও অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। তবে হেফাজতে ইসলামের গাজীপুর জেলা সেক্রেটারি মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। আমরা হেফাজতের ব্যানারে সরাসরি কাউকে সমর্থন দেইনি। কিন্তু গাজীপুরের হেফাজতের সকল নেতাকর্মী বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত। এসব কর্মী-সমর্থক ১৮ দলীয় জোটের প্রার্থী অধ্যাপক মান্নানের পক্ষেই কাজ করছেন। মান্নানের দাবি, হেফাজতে ইসলাম তার পক্ষেই নির্বাচনী প্রচার কাজে অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমপি আ ক ম মোজাম্মেল হক দাবি করেছেন, হেফাজতের অনেক নেতাকর্মী তাদের সঙ্গে রয়েছেন।
প্রচারণায় জাতীয় নেতাদের ঢল!
এদিকে এই নির্বাচনের প্রধান দুই প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণা বিরামহীনভাবে চলছে। উভয় প্রার্থীর সমর্থনে প্রচারণায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অংশ নিচ্ছেন।
গতকাল দিনভর তারা টানা বৃষ্টির মধ্যে গণসংযোগ করেন। ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী এ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান দোয়াত কলমের পক্ষে নির্বাচনী এলাকার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরা থেকে বোর্ড বাজার পর্যন্ত সড়কের দু’পাশের বিভিন্ন শিল্প-কল-কারখানা মালিক ও কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছে গিয়ে দোয়াত-কলমের পক্ষে প্রচারণা করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ানো মেয়র প্রার্থী মোঃ জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী ও গাজীপুর মহানগর সম্মিলিত নাগরিক কমিটি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক মান্নান তার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে টঙ্গী বর্নমালা রেল গেট, দত্তপাড়া, হাউসবিল্ডিং, এরশাদ নগর, আউচপাড়া, মুক্তার বাড়ী রোড, শফিউদ্দিন সরকার একাডেমী রোড, কলেজসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযাগ ও পথসভায় ভোট প্রার্থনা করে বক্তব্য রাখেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন সাবেক এমপি হাসান উদ্দিন সরকার, সালাহ উদ্দিন সরকার, মাহবুবুল আলম শুক্কুরসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
গতকাল দিনভর আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ এমপি, আমিনুর রহমান খান এমপি, নজরুল ইসলাম জিয়াকব এমপি, অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এমপি, এ্যাডভোকেট রহমত আলী এমপি, আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি, সিমিন হোসেন রিমি এমপি, তারানা হালিম এমপি, মাহফুজা মন্ডল এমপি, ফরিদা আক্তার হীরা এমপি, চেমন আরা এমপি প্রমুখ নেতৃবৃন্দ জেলার নেতাদের সাথে নিয়ে নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে আলাদা আলাদা দল বেধে গণসংযোগ ও পথসভায় অংশগ্রহণ করেন।
অপরদিকে গতকাল দিনভর অধ্যাপক মান্নানের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির ৪ সদস্য। তারা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আসম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, তরিকুল ইসলাম ও ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জিয়া পরিষদের চেয়ারম্যান কবির মুরাদ, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক জাফরুল হাসান, আবুল খায়ের খাজা, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেত্রী বিএনপির সহ-সভাপতি সেলিমা রহমান প্রমুখ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন।
এদিকে, এ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান আজ রবিবার সকাল ১১টায় তার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবেন। মহানগরীর দক্ষিণ ছায়াবীথি বোম্বাই বাড়ী ট্রাস্ট কমিউনিটি সেন্টারে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করবেন। আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে গতকাল প্রচারে নেমেছিল ঢাকার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীরা। শত শত ছাত্রীদের উপস্থিতিতে শহরের আওয়ামী লীগ কার্যালয় মুখর হয়ে ওঠে। পরে তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য লিফলেট ও পোস্টার বিতরণ করেন।
বিভ্রান্ত জাপার কর্মীরাঃ কেন্দ্রের রহস্যজনক নীরবতার কারণে গাজীপুর জাতীয় পার্টি (এ) নেতা-কর্মীরা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন প্রশ্নে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তারা মেয়র পদে ১৪ দল তথা মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র এ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান ও ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী ও গাজীপুর মহানগর সম্মিলিত নাগরিক কমিটি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক মান্নান এই দুই হেভি ওয়েট প্রার্থীর মধ্যে কাকে সমর্থন দিবে, কার পক্ষে কাজ করবে তা নিয়ে দ্বিধা দ্বন্ধে পড়েছে।
