জিএসপি স্থগিত করায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে শ্রমিকরা

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৩, ২৩:১৭
মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত হওয়ার মূল কারণ শ্রমিকদের নিরাপত্তার ঘাটতি, মজুরি যথাযথ না হওয়া, শ্রমিক নেতাদের হয়রানির অজুহাত। তবে যে শ্রমিকদের জন্য এমন খড়গ, সে শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা মনে করেন এতে শ্রমিকদের বরং ক্ষতিই হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মত একই পথে যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা কানাডার মত বড় ক্রেতারা হাঁটতে থাকে তাহলে ক্ষতি হবে এদেশের শিল্পখাতের। এতে কর্মহীন হবে লাখ লাখ শ্রমিক। এর ফলে শ্রমিক অধিকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। এই অবস্থায় জিএসপি সুবিধা অব্যাহত রেখে বা এটিকে প্রয়োজনে তৈরি পোশাক খাতে সমপ্রসারণ করে শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নে মালিক ও সরকারকে চাপ দেয়ার কৌশল নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। সেই সাথে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে পশ্চিমা বিশেষতঃ মার্কিন ক্রেতাদেরও চাপ দেয়ার আহ্বান জানান তারা। একই মত ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের। গতকাল শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, শ্রমিকদের কল্যাণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তৈরি পোশাক খাতের ৪০ লক্ষাধিক শ্রমিক, যার সিংহভাগই নারী। যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকেই শুধু বিপন্ন করবে না, বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন সামাজিক পরিকল্পনাসমূহ। এ অবস্থায় দেশের শিল্প-কারখানার শ্রম পরিবেশ উন্নয়নে সরকার গৃহীত কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে জিএসপি সুবিধা স্থগিতের সিদ্ধান্ত মানবিক কারণে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে এফবিসিসিআই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ‘ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে’ পড়বে। এ সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবো। কারখানা ভবন ও অগ্নিকাণ্ড থেকে শ্রমিকদের রক্ষা করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করলেও সেখানে ওয়ালমার্টসহ মার্কিন ব্র্যান্ডগুলো স্বাক্ষর করেনি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিচালনা পর্ষদের এই বিকল্প সদস্য বলেন, মজুরি বাড়ানো, শ্রমিকদের কারখানায় কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য তাদের এই আগ্রহকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু এর ফলে জিএসপি বাতিলে আখেরে ক্ষতির শিকার হবে শ্রমিকরা। ইতিমধ্যে মালিকরা পুঁজি বানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু গ্রাম থেকে আসা এ খাতের ৪০ লাখ শ্রমিক বিশেষত এ খাতের ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, শ্রমিকদের অধিকারকে কেন্দ্র করে জিএসপি স্থগিত অন্যায়, অযৌক্তিক। তিনি বলেন, আমরা (শ্রমিকরা) এখন ডাল-ভাত খাই। মাছ-ভাতের জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু মার্কিন এই সিদ্ধান্তে আমাদের ডাল-ভাত পেতেই টানাটানি হবে। কারণ, জিএসপি স্থগিতে মালিকরা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে শ্রমিকরা। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আগামী শুক্রবার তার সংগঠনের পক্ষ থেকে সমাবেশ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা, এক মাসের বেতনের সমান ঈদ বোনাস ও গণমুখী শ্রম আইন করার দাবির পাশাপাশি মার্কিন বাজারে আমাদের পণ্যের জিএসপি বহাল রাখার দাবিও জানাবো। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, ২০১১-১২ অর্থবছরের বাংলাদেশ মোট রপ্তানি করেছে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে মোট রপ্তানির ২১ শতাংশ। তবে এর মধ্যে ৯৯ শতাংশেরও বেশি পণ্য জিএসপি সুবিধা পায়নি। জিএসপির আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ হাজার ধরনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তবে এর মধ্যে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক নেই। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ক্রীড়া সরঞ্জাম, তামাক, প্লাস্টিক পণ্য ও সিরামিক পণ্য এই সুবিধার আওতায় রপ্তানি করে থাকে। গত অর্থবছরে জিএসপির আওতায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের এই ধরনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি হয়েছে। এতে তারা শুল্ক ছাড় পেয়েছেন ২০ লাখ ডলারের মতো। অন্যদিকে ৪৯০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা শুল্ক বাবদ ৭৫ কোটি ডলার দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকে। জিএসপি স্থগিত করার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টিসহ কয়েকটি বাম রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। এসব দলের পক্ষ থেকে মার্কিন এ সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। এফবিসিসিআইয়ের উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়ে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে এফবিসিসিআই। গতকাল ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকার যখন শিল্প-কারখানায় কর্ম পরিবেশ উন্নয়ন ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সে মুহূর্তে জিএসপি স্থগিতের সিদ্ধান্ত দুঃখজনক। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা না পেলেও এই সুবিধা স্থগিত করায় প্লাস্টিক, সিরামিকসহ বেশকিছু পণ্য দেশটিতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এ সিদ্ধান্ত উভয় দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সংকট সৃষ্টি হবে, বাণিজ্য বৃদ্ধি সংকুচিত হওয়া, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগও হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে উভয় দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন গতিধারাকে ব্যাহত করতে পারে বলে এফবিসিসিআই আশংকা প্রকাশ করেছে। একই সাথে এই সংকট সমাধানে সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠনসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে এফবিসিসিআই। পুনর্বহালের আহ্বান ইএবি’র জিএসপি প্রত্যাহার করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এ সুবিধা আবার পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছে রপ্তানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি)। গতকাল ইএবি’র সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, সামপ্রতিক তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহতের পর সরকার, মালিকপক্ষ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় কারখানায় কমপ্লায়েন্স রক্ষায় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সমপ্রতি মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং অতি সম্প্রতি কংগ্রেসম্যান জর্জ মিলার সরেজমিনে সফর করে কর্মপরিবেশ উন্নতিতে গৃহীত যৌথ পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য মজুরি বোর্ড গঠন, কারখানায় শ্রমিক অধিকার রক্ষায় ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে একতরফা হিসেবে অভিহিত করেছে ইএবি।