পারস্পারিক নির্ভরশীলতা এবং ক্যারিয়ার

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৩, ১৯:৪৭
ব্যয়বহুল এই সময়ে সংসারের খরচ একার পক্ষে চালানো অনেক কঠিন। তাই পরিবারের স্বাচ্ছন্দের জন্য ঘরের কাজের পাশাপাশি চাকরি করে বাড়তি উপার্যনের জন্য নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন নারীরা। এতে সংসারে আসছে উন্নতি আর নারীরা হচ্ছেন সাবলম্বী। কিন্তু সংসারের সব কাজ করে বাইরে কাজ করার ঝক্কি অনেক। তাই এর জন্য সবথেকে জরুরি পরিবারের পুরুষ সদস্যটির সাহায্য। এই নিয়ে এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন- রাবেয়া বেবী এবং সামিহা সুলতানা অনন্যা বর্তমানে যৌথ পরিবারের সংখ্যা খুব কমে গেছে। শহরে বেশিরভাগ পরিবারই এখন অণু পরিবার এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ই কর্মজীবী। স্বামী-স্ত্রী দুজনের আয়ে সন্তানকে নিয়ে সুখের পরিবার গড়ে উঠলেও সন্তানকে দেখাশোনা ও পরিবারের সকল কাজ যখন স্ত্রীকেই করতে হয় তখন তা নারীকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দেয়। আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ঘর সংসার করার গুরু দায়িত্ব এসে পড়ে শুধু নারীর উপর। পাশাপাশি তাকে চালিয়ে যেতে হয় চাকরি। তাই সংসারের নানা কাজে, সন্তানকে দেখাশোনায় স্বামীর সহযোগিতা একান্ত জরুরি। স্বামী-স্ত্রী দুজনের আয়ে যেমন সংসার চলে তেমনি দুজনকে সংসারের কাজগুলো ভাগ করে নিতে হবে। একজন স্বামী যখন তার পরিবারকে সময় দেয়ার পাশাপাশি রান্নাবান্নাসহ নানা কাজে তার স্ত্রীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে তখন সমাজের পক্ষ থেকে তাকে নানা মন্তব্য শুনতে হয়, বন্ধুদের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত হতে হয়। তার এই সহযোগিতামূলক মনোভাবকে সমাজের পক্ষ থেকে তিরস্কার করা হয়। তাই আমাদের সমাজের প্রচলিত এই মনোভাবের পরিবর্তন আনতে হবে। শিশুর বয়স তিন চার বছর হওয়া পর্যন্ত সময়টা সবচেয়ে কঠিন। সেসময় বাবা ও মা দুজনকেই বাচ্চার দেখাশোনার কাজ ভাগ করে নিতে হবে। কর্মপরিবেশের অভিজ্ঞতা বিনিময় করার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর যেমন এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, তেমনি সংসারের কাজ ভাগাভাগি করে করার মাধ্যমে সুখের সংসার গড়ে তোলা সম্ভব হবে। স্ত্রীর অফিসের কোন এ্যাসাইনমেন্ট থাকলে তাকে সাহায্য করতে সেদিনের রান্নাটা স্বামীই সম্পন্ন করতে পারে পাশাপাশি সন্তানের পড়াশোনাটাও লক্ষ্য রাখতে পারে। সন্তানকে পড়ানো থেকে শুরু করে রান্নাবান্না, দাওয়াত, ঘর গোছগাছসহ সব কাজ পারস্পরিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে ভাগ করে নিতে হবে। বর্তমানে কিছু কিছু পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একে অপরের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। কোন কোন স্বামী তার স্ত্রীর জীবনের চলার পথকে সহজ করে দিতে বন্ধুত্বপূর্ণ হাত বাড়িয়ে দেয়। তেমনি এক পরিবারের সাথে তাদের সুখী জীবনের অভিজ্ঞতা জানতে কথা হচ্ছিল এক দম্পতির সাথে। তারা জানান, আমাদের দুই ছেলে। বড় ছেলের বয়স দশ আর ছোট ছেলের দুই বছর। আমার স্বামী আমিনুল ইসলাম বাচ্চাদের দেখা শোনাসহ সব বিষয়ে আমাকে সহযোগিতা করে। আসলে বলা যায় আমরা দুজনে মিলে সংসারের সব কাজ সমানভাবে ভাগ করে করি। আমাকে সহযোগিতার কথা তখনই আসে যখন আমাদের সমাজ ছোটবেলা থেকে আমাদের শিখিয়ে দেয় ঘরসংসার করা মেয়েদের কাজ আর আয় করা পুরুষের কাজ। কিন্তু এখন আমরা অনেক মেয়েরাই পুরুষের মতো করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করি। আমাদের আয় সংসারে ব্যয় হয়। তাই এই দিক দিয়ে বিবেচনা করলেও স্বামী-স্ত্রীর দুজনেরই সমানভাবে সংসারের দায়িত্ব পালন করার কথা। কিন্তু আমরা ভাবি মেয়েরা ধর্যশীল, তারা বাচ্চাদের আদর আবদারে নিজেদের মাতৃত্ব দিয়ে সব সহ্য করে নেয়। তারা বাচ্চা লালন পালনসহ ঘরকন্যার কাজে অভিজ্ঞ, কারণ তাদের এই শিক্ষা দেয়া হয়। কিন্তু আমি আমার স্বামীর ক্ষেত্রে দেখেছি ও বাচ্চাদের অনেক বিষয় আমার চেয়ে বেশি ধর্যশীল। বাচ্চাদের পরিষ্কার করা, পড়ানো প্রভৃতি কাজ বাচ্চারা তার কাছে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। নারী পুরুষ বলে আলাদা করা নয় বরং যে ধৈর্য নিয়ে যে কাজ করবে সে সেই কাজে পারদর্শী হবে। স্বামীর সহযোগিতার জন্যই আজ আমি শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনই করছি না ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে পারছি এবং একজন পুরুষ যেভাবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে সেভাবেই দায়িত্ব পালন করে এগিয়ে যেতে পারছি। এই সহযোগিতা আমার স্বামীসহ আমার বেশ কিছু সহকর্মী, বন্ধুদের মাঝে আমি দেখতে পাই। তবে তাদের মানসিকতা পরিবর্তন হলেও তাদের পরিবারের কিংবা আমাদের সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। তাই এই সকল স্বামীরা মায়ের সামনে, সমাজের রীতি-নীতি ভেঙ্গে ঘরসংসারের কাজে পূর্ণ সহযোগিতার ইচ্ছা থাকলেও সব ক্ষেত্রে বেরিয়ে আসতে পারে না। যেমন আমার স্বামী তার মা অর্থাত্ আমার শাশুড়ির সামনে রান্না ঘরে কিছু করতে যেতে ইতস্তবোধ করে। কিংবা তাকে রান্না ঘরে যেতে দেখলে আমার শাশুড়িই বলেন, কি লাগবে বল, এই বলে তিনি তার কাজ করে দেন। আমাদের এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। ক র ণী য় যখন যে সময় পাবেন সেই সন্তানের দেখাশুনা করবেন। যে কাজ যত্ন নিয়ে করা হবে সেই কাজেই সে পারদর্শী হবে। বাচ্চার ঘুম পাড়ানো, খাওয়ানো, পরিষ্কার করার মতো কাজগুলো বাবাও যত্ন নিয়ে করতে পারেন। দুজনই কর্মজীবী হলে সন্তানকে গৃহপরিচালিকার কাছে না রেখে যতোটা পারেন নিজেরা যত্ন নিন। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখুন। বাচ্চাদের খেলাধূলার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দিন। মাঝে মাঝে নিজেরা তার সাথে খেলবেন। স্ত্রীর আয় সংসারের উন্নতিতে সহায়ক হয়। তাই স্ত্রীর ক্যারিয়ার চিন্তাকে উত্সাহিত করুন। রান্না শুধু মেয়েদের কাজ নয়। দুজনে ভাগ করে করুন।