ভাষণ

‘নারীদেরকে পুরুষ আলাদা করে রেখে তারা নিজেদেরকেও বঞ্চিত করছে’

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৩, ১৯:৪৮
১৯৮০ সালে সর্বভারতীয় নারী সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নারীদের উন্নয়নের লক্ষ্যে করণীয় নিয়ে ইন্দিরা গান্ধী এই ভাষণ প্রদান করেন বিগত কয়েক দশক যাবত্ সর্বভারতীয় নারী সম্মেলন নারীদের কথা বলার জন্য একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যদিও আমি কখনো কোনো নারীদের সংগঠনের সদস্য ছিলাম না, তবুও এই সংগঠনগুলোর কাজ নিয়ে আমার বরাবরই আগ্রহের কমতি নেই। আমি এটা জেনে আনন্দিত হয়েছি যে, এই সম্মেলনটির নামকরণ করা হয়েছে সরোজিনী নাইডুর নামে। আর এই সম্মেলনটি আমাদের দেশেই আয়োজিত হচ্ছে। তিনি বর্তমানে ভারতের জীবিত নারীদের মধ্যে সর্বাগ্রে প্রণিধানযোগ্য নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য; তা সেটা রাজনীতি কিংবা লেখনীতেই হোক। এখানে আগা খান এবং তার স্ত্রী বেগম আগা খানের নাম স্মরণীয়। তারা ভারতের অত্যন্ত কাছের বন্ধু। তারা আমাদের দেশে শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি উন্নয়নের জন্য অনেক প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। তাদের সেই মহতি উদ্যোগ ছাড়া আমাদের আজকের এই উন্নয়ন অনেক কঠিন হতো। আমরা তাদেরকে চিরকাল স্মরণ করবো। আজ আমরা যে সুন্দর এবং সুবিশাল মিলনায়তনে মিলিত হয়েছি সেটাও তাদেরই বানানো। আমি দেখতে পাচ্ছি এখানে উপস্থিত নারীরা কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কবি, সাহিত্যিক, উকিল। আশা করি আপনারা প্রত্যেকে এই ভবনে এসে মুগ্ধ হয়েছেন আমার মতোই। আমি প্রায়ই বলে থাকি যে, আমি ফেমিনিস্ট নই। তবে নারীদের ক্ষমতায়ন, ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে নারীরা যেভাবে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে, সামাজিক আইন-কানুনগুলো যেভাবে নারীদের বিকাশের জন্য বাধা সৃষ্টি করে, সে সম্পর্কে আমি পূর্ণ সচেতন। যুগ যুগ ধরে পুরুষ মানসিক, সামাজিক এবং শব্দ দিয়ে নারীদেরকে দমিয়ে রেখেছে। নারী-পুরুষ সবাই এটা মেনে নিয়েছে। সম্প্রতি ‘নারী এবং কাজ’ নামে একটি বই পড়ছি। এই বইটি পড়ে আমি জানতে পেরেছি যে, শাব্দিকভাবে বা ভাষায় কিভাবে নারীদেরকে হেয় করা হয়েছে। আমি উদ্ধৃতি দিচ্ছি, ‘খুব ছোট বয়স থেকেই একজন নারী বুঝতে শুরু করে যে, সে ‘নারী’। দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রতিনিয়ত তাকে সেটা বোঝানো হয়। বাস্তবিকভাবে নারীকে কোনো স্বাধীন সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয় না। নারীকে পুরুষের একটা অংশ মনে করা হয়।’ লেখক পরে আরো বলেছেন, আপনারা নিজেদের চারপাশে খেয়াল করুন। দেখবেন আমাদের কাছে পুরুষ হলো শাসক, নারী শাষিত। পুরুষ নেতা, নারী তার অনুসারী। পুরুষ উত্পাদক, নারী ভোক্তা, পুরুষ শৌর্য-বীর্যের প্রতীক আর নারী দুর্বলতার প্রতীক। আর এভাবেই নারীরা মানসিকভাবে প্রথমে পিছিয়ে পড়ে। এরপর বাস্তবিকভাবে তারা পিছায়। তবে আমাদের একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, নারীদেরকে পুরুষ আলাদা করে রেখে তারা নিজেদেরকেও বঞ্চিত করছে। নিজেদের অগ্রগামিতাকেও থমকে দিচ্ছে। আমরা নারীদের অগ্রগতিকেও পুরুষের সাথে তুলনা করে পরিমাপ করি। আমি মনে করি এটা এক ধরনের বাধা। নারীর স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রথম ধাপই হলো নিজেকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, চিন্তা চেতনায় স্বাধীনতা আনা। আমি মনে করি নারীদেরকে আরো সচেতন, সাবলম্বী এবং কর্মঠ হতে হবে। কারণ নারীরা নিজেদের যে দায়িত্বগুলো আছে সেগুলো এড়াতে পারে না। ঐতিহ্যগতভাবেই আমাদের উপমহাদেশের নারীরা রক্ষণশীল। কিন্তু তাই বলে তাদের মেধায় যে ঘাটতি আছে এমটা নয়। চাইলে তারা পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: প্রথমত, অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে নারীদের উপর আরোপিত বৈষম্যগুলো দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিগ্রহ ঠেকাতে হবে। কারণ কোনো সহিংসতায় সবতেকে ঝুঁকিতে থাকে নারীরা। তৃতীয়ত, নারীদেরকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আশার বিষয় হলো আমরা আমাদের সমাজে প্রচলিত নারীদের সম্পর্কে পুরাতন যে বৈষম্যমূলক ধারণা ছিল সেগুলোর বাতাবরন থেকে বেরিয়ে আসছি। যৌন ব্যাপারে নারীর অধিকারগুলোরকে প্রাধান্য দিতে হবে। উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে বৈশ্বিকভাবে কাজ করতে হবে। তবেই সম্ভব নারী মুক্তি। আমাদের হাতে সময় কম। তাই দ্রুত শুরু করতে হবে এই কাজগুলো।