গোর খোদকের খবর রাখে না কেউ

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৩, ২২:২২
রাজধানী, বিভাগীয় শহর, এমনকি অনেক জেলা ও উপজেলা শহরের পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গোরখোদকরা কবর খোঁড়ার কাজ করলেও সাবেক মিরপুর ইউনিয়ন এবং ১৯৯৯ সালে রূপান্তর ২১,৬৫৩ জনসংখ্যার অনুষ্ঠিত ৯.২২ বর্গকিলোমিটার আয়োতনের কুষ্টিয়ার মিরপুর পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে পারিবারিক কবরস্থান ব্যাতিত ১১টি গোরস্থানে ৬৩ জন গোরখোদক যুগের পর যুগ বিনা পারিশ্রমিকে কবর খোঁড়ার মহতি কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ কবর খোঁড়ার এই মহতি কাজের সাথে জড়িত গোরখোদকদের খবর রাখে না কেউ। সরেজমিন পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড ঘুরে গোরখোদকদের সাথে আলাপকালে শেষ ঠিকানা নির্মাণকারী গোরখোদকরা ভিন্ন ভিন্ন কথা বললেও তাদের বেশিরভাগের কথা থেকে উঠে এসেছে কবর খোঁড়ার কাজটি তারা করছেন একান্তই নিস্বার্থভাবে। এ কাজ থেকে তারা অতীতেও কোন পারিশ্রমিক নেননি ভবিষ্যতেও পারিশ্রমিক পাবেন এমন আশাও তারা করেন না। গোরখোদক ও মুদি দোকানদার আনছার আলী (৬০) নিজে ৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হলেও তিনি কবর খোঁড়ার কাজ করেন ৮নং ওয়ার্ড যোগীপোল মহল্ল¬ায়। তিনি ৪০ বছর ধরে নিজ আত্মীয়-স্বজনসহ শতাধিক ব্যক্তির কবর খুঁড়েছেন। কবর খোঁড়ার নানা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আনছার আলী বলেন, একটি কবর খুঁড়তে ২ থেকে ৩ ঘন্টা সময় লাগে। মৃতব্যক্তি পুরুষ হলে মাঝা পর্যন্ত এবং মহিলা হলে বুক পর্যন্ত খুঁড়তে হয়। পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে কবর খোঁড়া কেন কমবেশি করতে হয় তা তিনি জানেন না। কবর খোঁড়ার জন্য শীত-গ্রীস্ম বর্ষা, দিন-রাত কোন নির্ধারিত সময় নেই। দিনের বেলায় মৃত ব্যক্তির কবরের জন্য বাঁশ কেটে খাবাসী ও রেলিং তৈরিতে অনেক ব্যক্তি সহযোগিতা করলেও রাতের বেলা গহীন গোরস্থানে ২ জন গোরখোদক ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না। তখন একজন গোরখোদকের টয়লেটসহ অন্যান্য প্রয়োজন দেখা দিলে একজন গোরখোদককে সব ভয় উপেক্ষা করে কবর খোঁড়ার কাজ চালিয়ে যেতে হয়। অনেক বছর আগে রাতে একটি কবর খোড়ার সময় আনছার আলী নতুন কবরের পাশে পুরাতন কবরের একটি সুড়ঙ্গ দেখে ভয়ে কবরের উপরে উঠে আসেন এবং পরে হারিকেন জালিয়ে কবরে নেমে দেখতে পান সুড়ঙ্গপথে পুরাতন কবরের মৃতদেহটিকে সর্বাঙ্গ উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে। শুধু কঙ্কালটি অবিকল পড়ে রয়েছে। গোরখোদকদের কাছে মৃতব্যক্তি জীবদ্দশায় কে কোন রাজনৈতিক দল করতো কি করতো না এটা তাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। তারপরও গত বেশ কয়েক বছর আগে পৌরসভার মিরপুর মহল্ল¬ায় ২ জন মৃত ব্যক্তির কবর খোঁড়ায় অপারগতা জানানোরও ঘটনা ঘটে। জানা যায়, জীবদ্দশায় ওই দুই ব্যক্তি সমাজের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের সাথে কোন কারণ ছাড়াই ঝগড়া কলহে সার্বক্ষণিক লিপ্ত থাকতো। যার কারণে গোরখোদকরা তাদের কবর না খোঁড়ায় সিদ্ধান্ত নেয়। পরে অন্যত্র থেকে পারিশ্রমিক দিয়ে গোরখোদক এনে ওই দুই ব্যক্তির কবর খোড়ার কাজ সম্পন্ন করা হয়।