গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিজের সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ভরসা হিসাবে কাজ করছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের। অন্যদিকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান পুঁজি করছেন বর্তমান সরকারের নানা ব্যর্থতাকে।
আজমত উল্লাহ খান তিন দফায় টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ছিলেন। সেই সুবাদে এলাকার প্রতিটি অলি-গলিতে রয়েছে তার উন্নয়নের স্বাক্ষর। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটারদের মধ্যেও রয়েছে তার শক্ত অবস্থান। টঙ্গী পৌরসভার অধীন বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে তার অবদান রয়েছে। এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ-মাদ্রাসায়ও তার অবদানের কথা ভোটাররা স্মরণ করছেন। এছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা, ব্যক্তিগত দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততার বিষয়টিকেও বিবেচনা করছেন ভোটাররা। কার্যত এই বিষয়গুলোই আজমত উল্লাহর পক্ষের প্রধান উপকরণ। এর বাইরে গাজীপুরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করার কৃতিত্ব তিনি দিচ্ছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগকে। এর বাইরে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের বিবরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কিভাবে গাজীপুরকে সাজাবেন তার রূপরেখাও দিচ্ছেন।
টঙ্গীবাজার এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী মনসুর আহমদ বলেন, ‘ময়মনসিংহ এলাকা থেকে এসে এখানে বাড়ি করে গত ১৬ বছর আমি এ এলাকায় বাস করছি। আজমত উল্লাহকে কখনও এলাকায় সন্ত্রাসী-মাস্তানি কিংবা কোনো খারাপ কাজে ইন্ধন যোগাতে দেখিনি। তিনি টঙ্গীর মেয়র থাকলেও জাতীয় রাজনীতি করতেন। এলাকায় যেখানেই সমস্যার কথা শুনেছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন। যাকে ভোট দিলে এ এলাকার আরও উন্নয়ন হবে, আমরা তাকেই ভোট দেব।’
এদিকে ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী এম এ মান্নান নিজের প্রচারণায় প্রাধান্য দিচ্ছেন বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু ও বর্তমান সরকারের নানা ব্যর্থতাকে। বিশেষ করে শেয়ারাজার, হলমার্ক, পদ্মা সেতু ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারির কথা ফলাও করে প্রচার করছেন তিনি ও তার পক্ষের লোকজন। বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির সঙ্কটের পাশাপাশি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঘরে-ঘরে মানুষকে চাকরি দিতে না পারার প্রসঙ্গও তুলে আনছেন নির্বাচনী প্রচারণায়। এসবের সঙ্গে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, পয়ঃনিষ্কাশন ও যানজট সমস্যার বিষয়টিও সামনে এনে ভোটারদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন। এছাড়া বিএনপি সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে এলাকায় নিজ হাতে করা উন্নয়নে ফিরিস্তিও হাজির করছেন ভোটারদের সামনে।
মেয়র পদে মূল দুই প্রতিদ্বন্দ্বি যখন নিজেদের অতীত উন্নয়ন, নিজ নিজ সরকারের সাফল্য এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ করায় ব্যস্ত তখন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটাররা বেশি করে ভাবছেন এলাকার সমস্যার কথা। ঢাকার আব্দুল্লাহপুর ও তুরাগ নদ পার হলেই টঙ্গী। আর এখান থেকেই শুরু নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সীমানা। প্রথমেই রয়েছে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড। টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) কর্মচারী হানিফ বললেন, ‘ভোট এলে সবাই শুধু ভালো ভালো কথা বলে, সব করে ফেলবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ভোট গেলে আর এসবের কথা মনে থাকে না।’ হানিফ বলেন, ‘এ এলাকায় সবসময়ই যানজট লেগে থাকে, বর্ষা না থাকলেও গোটা এলাকার রাস্তাঘাট সারাবছরই কর্দমাক্ত ও আবর্জনায় ভরে থাকে। কিন্তু দেখার কেউ নেই।’
জাপার ভোট নিয়ে ধোয়াশা: এরশাদের জাপার ভোট শেষ পর্যন্ত কার বাক্সে যাবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি পুরো গাজীপুরেই বিরাজ করছে। জেলা জাপার সভাপতি কাজী মাহমুদ হাসান মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে গেলেও তিনি অন্য কারও পক্ষে প্রচারণায় নেই, কাউকে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক সমর্থনও জানাননি। আজ সোমবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা জাপার অবস্থান পরিষ্কার করা হবে।
টঙ্গী-গাজীপুরের বিভাজন রেখা: আজমত উল্লাহ দীর্ঘদিন টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ছিলেন। সে কারণে তার কর্মকাণ্ড ছিল টঙ্গীকেন্দি ক। গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও গাজীপুর সদর ও আশপাশের এলাকায় তিনি কোনো ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে পারেননি। অন্যদিকে এম এ মান্নানের বাড়ি গাজীপুর সদরে হওয়ায় টঙ্গী এলাকার সঙ্গে তার দূরত্ব সবসময়ই। তাছাড়া প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে নিজ নির্বাচনী এলাকায় কিছু কাজ করলেও তার তেমন প্রভাব এবারের ভোটে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শুধু দুই প্রার্থী নন, ভোটারাও এই বিভাজনরেখায়। যার কারণে আজমত বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন গাজীপুর সদরে, আর মান্নানকে তুলনামূলক বেশি শ্রম দিতে হচ্ছে টঙ্গীতে।
বিভিন্ন জেলা থেকে গাজীপুরে এসে বসতি গড়া ভোটাররাও এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব ফেলবে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ফরিদপুর, উত্তরবঙ্গ ও নোয়াখালী অঞ্চল থেকে বহু লোক এসে এখানে বসতি গড়েছেন। বাহির থেকে এসে বসতি গড়া ভোটারের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। প্রধানত দুই রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত হলেও তারা প্রকাশ্যে কারও পক্ষে-বিপক্ষে মাঠে নেই। তবে প্রধান দুই মেয়র প্রার্থী বিভিন্ন মাধ্যমে এসব ভোটারকে পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন।
