কক্সবাজারে দুই লাখ পানিবন্দি

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৩, ২৩:০৫
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতে কক্সবাজার জেলার শতাধিক গ্রামে বন্যা দেখা দিয়েছে। শনিবার বিকালের দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কসহ বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। বন্যায় জেলার শতাধিক গ্রামের ২ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানির স্রোতে ভেসে ১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় জেলার নদ-নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে একই কারণে বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাহাড় ধসে জেলার আজিজনগর-ফাইতং, লামা-গজালিয়া এবং লামা-বান্দরবান সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। প্রাণহানির আশঙ্কায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসকারী লোকজনদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, টানা বৃষ্টির কারণে শনিবার বিকাল থেকে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা দেখা দেয়। তবে শনিবার রাতে বৃষ্টির মাত্রা কম থাকায় পানি কিছুটা সরে গেলেও রবিবার সকালে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় আবারও পানি বাড়তে শুরু করে। রবিবার বিকাল পর্যন্ত জেলার কয়েক হাজার বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র ঢলে শতাধিক ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত ও চলাচলের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া পানের বরজ, চিংড়ি ঘের ও ক্ষেত-খামারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক হাজার একর মত্স্য ঘেরের মাছ ঢলের সাথে ভেসে গেছে। নদী ও খালসমূহ উজানের পাহাড়ি ঢলে টইটুম্বুর হয়ে ওঠায় বৃষ্টির পানি লোকালয়ে জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে জেলার প্রধান দুই নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে। পেকুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান সাফায়াত আজিজ চৌধুরী রাজু জানান, হড়কা বান বা পাহাড়ি ঢলে শিলখালী ও টইটং এলাকায় অসংখ্য ঘর-বাড়িতে কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি প্রবেশ করেছে। এছাড়া করইয়ারদিয়া, রাজাখালী ও পেকুয়ার একাংশ বর্তমানে পানিতে ডুবে রয়েছে। বিভিন্ন সড়ক, উপ-সড়কও বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, উপজেলার বরইতলী, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া ও ফাঁসিয়াখালী এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন বসতঘরে পানি প্রবেশ করেছে। মহেশখালী উপজেলা চেয়ারম্যান আবু বকর ছিদ্দিক জানান, পাহাড়ি ঢলে ছোট মহেশখালী, কালামারছড়া ও হোয়ানকে অসংখ্য বসতবাড়ি ও কয়েকশ’ পানের বরজ বিধ্বস্ত হয়েছে। কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতার কামাল জানান, পৌরসভার সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, ফদনারডেইলসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। রামু উপজেলা চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল জানান, উপজেলার খুনিয়াপালং, রাজারকুল, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, কাউয়ারখোপ, গর্জনীয়াসহ বিভিন্ন স্থানে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। এছাড়া পাহাড়ি ঢলে উখিয়ার রাজাপালং, পালংখালী, জালিয়াপালং, টেকনাফের হীলা, হোয়াইক্যংসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। বন্যার পানিতে শনিবার ও রবিবার কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক ও চকরিয়া-মগনামা সড়কের কিছু অংশ ডুবে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয়। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবে থাকায় নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গত লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। বান্দরবানে পাহাড় ধস, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার থেকে টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী এবং লামা উপজেলার ফাইতং, আজিজনগর ইউনিয়নে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারী কয়েকটি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। গতকাল রবিবার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আহমেদ জামিলসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন। প্রশাসন ও স্থানীয়রা জানান, প্রবল বর্ষণে জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং বাঁকখালী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা সদরের আর্মিপাড়া, শেরেবাংলা নগর, স্লুইসগেট এলাকা এবং নাইক্ষ্যংছড়ির চাকপাড়া, লম্বাবিলপাড়া, দৈয়ার বাপেরপাড়া, নারিচ বুনিয়া, নতুন চাকপাড়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অপরদিকে পাহাড় ধসে জেলার আজিজনগর-ফাইতং, লামা-গজালিয়া এবং লামা-বান্দরবান অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া রুমা, থানছি এবং রোয়াংছড়ি উপজেলা সড়কেও পাহাড় ধসের কারণে যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কেএম তারিকুল ইসলাম জানান, টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশঙ্কায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়িতে ১ জনের মৃত্যু নাইক্ষ্যংছড়ি ও রামু সংবাদদাতা জানান, রামু-নাইক্ষ্যংছড়িতে ৫ দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারি লম্বাবিল এলাকার আবু ছৈয়দ (২২) প্রাণ হারিয়েছেন। তার বাবা-মা দু’জনেই সৌদি প্রবাসী। বন্যায় রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিধ্বস্ত হয়েছে চলাচলের সড়ক এবং বসতঘর। কয়েকটি স্থানে বাঁকখালী নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। রামুর বৃহত্ ব্যবসা কেন্দ্র ফকিরা বাজার, ফজল আম্বিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, অফিসেরচর এমদাদিয়া কাছেমুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, অফিসেরচর রাখাইনপাড়া বৌদ্ধ বিহারসহ অসংখ্য ব্যবসা, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবে গেছে। রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ হোসেন জানিয়েছেন, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে এক হাজার করে বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মাঝে বিতরণের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে তাত্ক্ষণিকভাবে ৫০ টন চাল ও ৬ লাখ টাকা সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এদিকে বাঁকখালী নদীর প্রবল স্রোতে গর্জনিয়া খালেকুজ্জামান সেতুর সংযোগ সড়ক যে কোন সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। সেতুটি রক্ষার জন্য ১ কোটি টাকা ব্যয়ে খাল পুনঃখনন করা হলেও শেষ রক্ষা হবে না বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা বাঁকখালী সেতু রক্ষার জন্য সিসি ব্লক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা সদরসহ রূপনগর, জারুলিয়াছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি বাজার, বিজিবি ক্যাম্প, উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের নিচতলা, বাইশারি ইউনিয়নের কাগুজিখোলা, ক্যাংগার বিল, লম্বাবিলসহ প্রায় ১০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসরত পরিবার ও নিম্নাঞ্চলে অবস্থানরত পরিবারকে উপজেলা পরিষদ কার্যালয় বা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলা হয়েছে। বাঁধ ভেঙ্গে চকরিয়া শহর প্লাবিত চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বর্তমানে চিরিঙ্গা ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার কাছ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পৌরশহরের কোচপাড়া পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে পানি । ওই এলাকার শতাধিক বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলের শতাধিক গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে বিস্তির্ণ এলাকার ফসলি জমি। উপজেলার অভ্যন্তরীণ একাধিক সড়ক ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চকরিয়া পৌরসভার ৮নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর (প্যানেল মেয়র) শহিদুল ইসলাম ফোরকান বলেন, গতকাল সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শহর রক্ষা বাঁধের একটি অংশ ভেঙ্গে গেছে। ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁধটি সংস্কার করা হলেও দুর্বল কাজের কারণে এটি ফের ভেঙ্গে গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। এদিকে ওই ভাঙ্গা অংশ দিয়ে প্রচন্ড বেগে নদীর পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে ওয়ার্ডের বেশিরভাগ বাড়ি ও শহরের বাণিজ্যিক জনপদ চিরিঙ্গা-সোসাইটি প্লাবিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। বর্তমানে চরম হুমকির মুখে রয়েছে কক্সবাজার-চট্রগ্রাম মহাসড়ক ও শহরের বিভিন্ন স্থাপনা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে নিম্নাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.জয়নাল আবদিন।