ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশের আট নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীরা গতকাল সোমবার থেকে আমরণ অনশন শুরু করেছেন। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে মাসিক বৃত্তি বৃদ্ধি, বিশেষ বিসিএস-এর ব্যবস্থা ও সুনির্দিষ্ট নিয়োগবিধি প্রণয়ন, স্নাতকোত্তরসহ উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অ্যাপ্রোন পরিধানের অনুমতি প্রদান উল্লেখযোগ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধির সঙ্গে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তাদের ৬ দফা দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তবে বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ বেসিক গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট নার্সেস এসোসিয়েশনের (বিবিজিএসএনএ) নেতৃবৃন্দ কর্মকর্তাদের জানান, অতীতে কয়েক দফা সময় এবং আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু গত ৬ মাসে কোন দাবি-ই বাস্তবায়ন হয়নি। তাই নুতন করে আর কোন সময় দেয়া সম্ভব নয়। নেতৃবৃন্দ দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী গতকাল থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন তারা।
গতকাল অপরাহ্নে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন ঢাকা নার্সিং কলেজ প্রাঙ্গণে অনশনরত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করেন সেবা পরিদফতরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মিসেস তাসলিমা বেগম। তিনি বলেন, নার্সিং কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী নিয়োগ বিধি বাস্তবায়নে কার্যক্রম চলছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে ৬ দফা দাবি মেনে নেয়ার ব্যাপারে তিনি আশ্বাস দেন। কিন্তু নেতৃবৃন্দ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকেন।
বিবিজিএসএনএ-এর সভাপতি রাজিব কুমার বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক সালমা আক্তার বলেন, ছয় দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। অনশনে তাদের ৬ জন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে তারা জানান।
পদোন্নতি যেন ‘সোনার হরিণ’
এদিকে সারাদেশে সরকারি হাসপাতাল, নার্সিং কলেজ, ইন্সটিটিউট ও সেবা পরিদফতরসহ সকল সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত নার্সিং কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অবস্থা এমন যে অনেকের অবসরের সময় ঘনিয়ে এলেও পদোন্নতি নামের ‘সোনার হরিণে’র দেখা পাননি এখনো। জানা গেছে, গত ৩৫ বছরে সম্প্রতি একজন মাত্র নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন। তার চাকরি আগামী ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে। তিন দফা চলতি দায়িত্ব পালন শেষে তাকে সম্প্রতি পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি অবসরে গেলে ‘লেকচারার’ পদের সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
প্রসঙ্গত, সেবা পরিদফতর কর্মকর্তা, নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকসহ সকল কর্মকর্তার পদমর্যাদাই ‘সিনিয়র স্টাফ নার্স’ এর। দেশের ৮টি নার্সিং কলেজের শিক্ষকসহ সেবা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তাই উচ্চপদে ‘চলতি দায়িত্ব’ পালন করছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, নার্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। দেশের বাইরে তাই নার্সদের বিশেষ মূল্যায়ন ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ দেশে নার্সিং পেশার মত এত অবহেলার পেশা আর নেই। নিয়োগ বিধি বা নীতিমালা তৈরি না হওয়া তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেবা পরিদফতর থেকে কয়েক দফা নিয়োগ নীতিমালা তৈরির প্রস্তাব দেয়া হলেও নানা মারপ্যাঁচে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। রোগীদের বৃহত্তর স্বার্থে নার্সিং পেশায় নিয়োজিতদের শিক্ষা, পদোন্নতিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ।
বরিশাল ১৬ শিক্ষার্থী অসুস্থ
বরিশাল অফিস জানায়, সকাল ১০টায় জেলা নাসির্ং কলেজ ক্যাম্পাসে প্রায় ৩শ’ শিক্ষার্থী অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। বিকালের দিকে ১৬ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েন। এদের মধ্যে নিপা বৈরাগী, খাদিজাতুল কোবরা, উম্মে সাদিয়া ওহাব ও দিপা বিশ্বাসকে শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, ৬ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেছে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল থেকেই চট্টগ্রাম মেডিক্যালের পাশে নার্সিং কলেজ প্রাঙ্গণে অনশন শুরু করেন তারা। শিক্ষার্থীরা জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের অনশন কর্মসূচি চলবে। এর আগে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, ক্লাস বর্জন ও সমাবেশ করেন।
