সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি হলেও গাজীপুরে আর সেই পরিস্থিতি নেই। ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত চারটি সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে সরকার সমর্থক প্রার্থী এবার জয় পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা ঢেলে দিয়েছেন। অপরদিকে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট চাইছে চারটি জয়কে পাঁচে নিয়ে যেতে। গাজীপুর সিটি নির্বাচন তাই স্থানীয় নির্বাচনের গণ্ডি পেরিয়ে চলে এসেছে জাতীয় রাজনীতির ময়দানে। সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষের জাতীয় নেতারা ঘাম ছুটিয়ে চলেছেন নিজ নিজ প্রার্থীকে বিজয়ী করতে। সব রাজনৈতিক দলের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে যেন গাজীপুরে।
এদিকে, এই নির্বাচনে জয় পেতে বিএনপি যে কতটা মরিয়া তা বোঝা যাচ্ছে দলটির তত্পরতার মধ্য দিয়ে। গতকাল দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, গাজীপুরে দলীয় ৩০০ প্রিজাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতিকদের কথার ঝাঁঝ বাড়ছে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে প্রধান দুই জোট সমর্থিত দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় কেন্দ্রীয় নেতাদের ভিড় ততই বাড়ছে। প্রতিদিন গাজীপুর মহানগরীর ৫৭টি ওয়ার্ডে সরকার দলীয় কেন্দ্রীয় নেতারা ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পক্ষে এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতারা ১৮ দল ও গাজীপুর মহানগর সম্মিলিত নাগরিক কমিটি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক মান্নানের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যে স্থানীয় নানা ইস্যুর পাশাপাশি সমসাময়িক জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুগুলো সমানতালে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রচারণার কারণে এখানে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ বিরাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নির্বাচনে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টি (এ) চেয়ারম্যান এইচ. এম. এরশাদের সাথে বৈঠকে জাতীয় পার্টির সমর্থন চেয়েছেন। বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবী জানিয়েছেন। নির্বাচনে কারচুপি হলে গাজীপুর থেকেই সরকার পতন আন্দোলন শুরু করার আগাম হুমকি দিয়ে রেখেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি ও আ. স. ম হান্নান শাহ। ফলে প্রতিদিনই স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী এ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আহমদ হোসেন, এ্যাড. রহমত আলী এমপি, মোজাম্মেল হক এমপি, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এমপি, আবু জাহের এমপি, আব্দুল মান্নান এমপি, ফজলে রাব্বী এমপি, জাহানারা বেগম এমপিসহ এক ঝাঁক হেভিওয়েট নেতা পর্যায়ক্রমে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।
অপরদিকে ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা, গাজীপুর মহানগর সম্মিলিত নাগরিক কমিটি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম. এ মান্নানের টেলিভিশন প্রতীকের পক্ষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ এমপি, ব্রিগেঃ জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ, নজরুল ইসলাম খান, তরিকুল ইসলাম, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আঃ হাই, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, রুহুল আলম চৌধুরীসহ বহু কেন্দ্রীয় নেতা বিভিন্ন এলাকায় গণ সংযোগ ও পথসভায় বক্তব্য রাখেন। ১৮ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, সরকারের ব্যর্থতা, দুর্নীতি, হলমার্ক, ডেসটিনি, পদ্মা সেতু কেঙ্কেকারি, জিএসপি সুবিধা বাতিল, রানা প্লাজার ঘটনা, তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ড, হেফাজতের উপর নির্যাতন প্রভৃতি জাতীয় ইস্যু গুরুত্ব পাচ্ছে।
টঙ্গী থেকে কাজী রফিক জানান, দুই প্রধান প্রার্থীর পক্ষে নেমেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা চষে বেড়াচ্ছেন গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা। নিজেদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে দুই জোটই প্রচার-প্রচারণায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। টঙ্গী ও গাজীপুর জুড়ে তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে সিটি এলাকা। গতকাল গণসংযোগকালে হাসান উদ্দিন সরকার বলেন ‘সরকারের দুঃশাসনের জবাব দিতে অধ্যাপক এম এ মান্নানকে ভোট দিন।’ এদিকে ১৪ দল সমর্থিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব স্থানীয় এমপি জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, এ নির্বাচনে ১৪ দল প্রার্থী এড. আজমত উল্লা খান বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।
দলীয় প্রিজাইডিং কর্মকর্তা
নিয়োগের অভিযোগ
ইত্তেফাক রিপোর্ট :গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে নিরপেক্ষতা প্রমাণের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, নির্বাচনে ৩ শতাধিক প্রিজাইডিং অফিসারকে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানাব, সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েনে ব্যবস্থা নিন। দলীয় কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। এদিকে, ১৮ দলের শরিক লেবার পার্টি চেয়াম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেছেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার ভোট কারচুপি কিংবা জোরপূর্বক ফলাফল নিজেদের দিকে নেয়ার চেষ্টা করলে তাত্ক্ষণিক সরকার পতনে ১৮ দলের পক্ষ থেকে লাগাতার হরতাল কর্মসূচি দেয়া হবে।
