একাত্তরের ২৯ মার্চের পর থেকে দেশে ছিলেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি। ২৯ মার্চে বাংলাদেশ থেকে করাচিতে চলে যান তিনি। সেখানে তিন সপ্তাহ অবস্থান করেন। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ছিলেন লাহোরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র নিয়ে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক শেষ পর্বের পরীক্ষা শেষ করেন আগস্ট মাসে। এরপর ১২ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান। ১৯৭৪ এর এপ্রিল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। গতকাল সোমবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ নিজের পক্ষে দেয়া সাক্ষ্যে সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এসব কথা বলেছেন।
অষ্টম দিনের মতো দেয়া জবানবন্দির শুরুতে সালাহউদ্দিন কাদের আগের দিনের জবানবন্দির একটি অংশ সংশোধন করেন। তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালে তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তিলাভের পর এক জনসভায় বঙ্গবন্ধুকে এ উপাধি দেয়া হয়েছিল। সেই জনসভাতে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দমন অভিযান এবং নির্বিচার গণহত্যার পর ঢাকা এক আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়। আমি এবং আমার বন্ধুরাও এর বাইরে ছিলাম না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সব সদস্যও ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বিকালে আমি করাচির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। আমাকে তেজগাঁও বিমান বন্দরে দিয়ে এসেছিলেন আমার বন্ধু ও আত্মীয় (কাজিন) কাইয়ুম রেজা চৌধুরী। পিআইএ’র ম্যানেজার হামিদ জং এর সহযোগিতায় আমি ফ্লাইটে একটি সিটের ব্যবস্থা করেছিলাম। করাচি বিমানবন্দরে আমাকে নিতে এসেছিলেন আমার স্কুলজীবনের বন্ধু মুনীব আর্জুমান্দ এবং মাহমুদ হারুনের ব্যক্তিগত সহকারী। করাচির ভিক্টোরিয়া রোডে হারুনদের পারিবারিক বাসস্থানে আমি অবস্থান করেছিলাম। মাহমুদ হারুনরা তিন ভাই ছিলেন। তাদের বাবা স্যার আব্দুল্লাহ হারুন ছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলে আমার পিতার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক। হারুন ভাইয়েরা ৫০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
তিনি বলেন, আমি করাচিতে তিন সপ্তাহ অবস্থান করেছিলাম। সে সময় ইউসুফ এ হারুনের সঙ্গেও আমার কয়েক দফায় দেখা হয়েছে। তখন তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ডন গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের মালিক হারুন ভাইয়েরা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের পুরোটা সময়ই বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তির পর হিথ্রো বিমান বন্দর নেমে বঙ্গবন্ধু প্রথম যার সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি হলেন মাহমুদ এ হারুন। ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ইউসুফ এ হারুন ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে এসেছিলেন।
এরপর তিনি জবানবন্দিতে বলেন, সাদিক স্কুলে আমার ক্লাসমেট ও রুমমেট ছিলেন মোহাম্মদ মিয়া সুম্র। পরে তিনি ২০০৮ সালে পাকিস্তানের কেয়ারটেকার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সুম্র এবং মুনীব আর্জুমান্দ এর সঙ্গে করাচি অবস্থানকালে আমার যোগাযোগ ছিলো। তারা আমার করাচি অবস্থানের ব্যাপারে লিখিত এফিডেভিট দিয়ে আমাকে জানিয়েছেন। তারা এ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতেও আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ভিসা দেয়া হয়নি।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আরো বলেন, করাচিতে অবস্থানকালে ঢাকার বন্ধুদের মধ্যে সালমান এফ রহমান, নিজাম আহমেদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরী, ওসমান সিদ্দিকী, রেজাউর রহমানের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। আমি সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার বন্ধু ওসমান সিদ্দিকীর বাবা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। তাকে দিয়ে আমি ছাড়পত্র নিয়ে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসে ভর্তি হই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষবর্ষে ভর্তি হয়ে স্নাতক সম্পন্ন করি। সেখানে আমি বন্ধু শামীম হাসনাইনের দেখা পাই (বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি)। তাকে ১৯৬৬ সাল থেকে আমি চিনতাম। নটর ডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েও আমরা বন্ধু ছিলাম। তিনি বলেন, জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসের পুরোটাই আমি লাহোরে ছিলাম। এ সময় আমি ও শামীম হাসনাইন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে দীর্ঘ সময় কাটাই। আগস্টে আমার ফাইনাল পরীক্ষা হয়। ১৯৭১ সালে লাহোরে থাকা অবস্থায় সালমান এফ রহমান আমার সঙ্গে তিন-চারবার সাক্ষাত্ করতে এসেছিলো। ১৯৭১ সালের আগস্টে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ইসহাক খান কাকওয়ানি, রিয়াজ নুন, নাঈম আহমেদ. সালমান এফ রহমান, সিদ্দিক খান কানজু, মুনিব আরজুমান্দ খান এবং আমি মারিতে তিন সপ্তাহের জন্য বেড়াতে যাই।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের সম্ভবত আট অক্টোবর আমার বাবা লাহোরে আসেন। তিনি এ্যাম্বাসাডর হোটেলে অবস্থান করছিলেন। জবানবন্দির এই পর্যায়ে এসে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। রুমাল দিয়ে চোখ মুছে তিনি বলেন, সম্ভবত ১০ জুলাই আমি তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করি। এটাই ছিলো বাবার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাত্। জবানবন্দিতে তিনি বন্ধুদের বর্তমান অবস্থান তুলে ধরে বলেন, তাদের অনেকেই ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিতে চাইলেও ইসলামাবাদস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন তাদের ভিসা দিচ্ছে না।
এরপর তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী ড. আনিসুজ্জামান একজন শোনা সাক্ষী। তিনি নিজেকে ধর্ম নিরপেক্ষ উদার হিসাবে তুলে ধরেছেন। যেখানে আমি একজন রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী। তার শোনা সাক্ষ্যের বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। এ সময় তিনি আরো দুই সাক্ষীর সাক্ষ্যের কথা উল্লেখ করলে রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর বলেন, এটা সাক্ষীর বক্তব্য নাকি আইনজীবীর বক্তব্য। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি। বরং আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিচ্ছি।
তখন বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর বলেন, আপনি ঘটনার সময় দেশে ছিলেন না, এটা বলেন। ২৩টি অভিযোগের সঙ্গে আপনার সংশ্লিষ্টতা নেই এবং রাজনৈতিক কারণে এসব মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে, তা বলেন। সাক্ষীদের নাম নিয়ে তাদের সাক্ষ্যের বিষয়ে বলার দরকার নেই। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, মাননীয় ট্রাইব্যুনালকে তো আমি বলেছি, বক্তব্য বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে গেলে থামিয়ে দেবেন। আমি আগামীকাল (মঙ্গলবার) জবানবন্দি শেষ করে দেব। তখন ট্রাইব্যুনাল মামলার কার্যক্রম আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করে আসামিপক্ষকে আরেকজন সাক্ষী আনার কথা বলেন।
