৪‘শ বছর যারা চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য শাসন করেছেন তাদের মধ্যে সর্বগুণসম্পন্ন শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন কমলা রানি। শুধু তাই নয়, রাজকুমারী কমলা রানি ছিলেন প্রথম ও শেষ মহিলা যিনি রাজ্য শাসন করে চন্দ্রদ্ব্বীপ তথা মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসে নারী সমাজের ক্ষমতায়নে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বরিশাল, ফরিদপুর ও খুলনা জেলার অংশবিশেষ নিয়ে ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য। চতুর্দশ শতকে চন্দ্রদ্বীপ ছিল বাকলা নামে পরিচিত। বাকলার রাজধানী ছিল বাউফলের কালাইয়া বন্দরের অদূরে কচুয়া নামক স্থানে। কালের বিবর্তনে ও তেঁতুলিয়া নদীর করাল গ্রাসে রাজধানী কচুয়ার কোন চিহ্ন নেই ।
বাক্লার রাজধানী কচুয়া থেকেই দনুজমর্দন দেব তার পুত্র রমাবল্লভ, তত্পুত্র কৃষ্ণবল্লভ , এরপর পর্যায়ক্রমে হরিবল্লভ, জয়দেব এবং তার কন্যা কমলা রানি এরা ৪‘শ বছর চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য শাসন করে গেছেন । রাজা জয়দেবের মৃত্যুর পর তার কন্যা কমলা রানি ১৪৯০ সালে সিংহাসনে বসেন । রানি নেই আছে শুধু কালের সাক্ষী হয়ে চন্দ্রদ্বীপ রাজাদের শৌর্যবীর্যের স্মৃতিচিহ্ন কমলা রানির দীঘি । তাও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত প্রায় । কথিত আছে কমলার নামেই দীঘির নামকরণ করা হয়েছে । ওই দীঘিতে ডুবেই কমলার মৃত্যু হয়েছে। আর এ কারণে ইংরেজ লেখকরা বাউফলকে বউ-ফল নামে অভিহিত করেন । আনুমানিক ১৫ শতকের দিকে তেঁতুলিয়া নদীর কোল ঘেঁষে স্থানীয় মাপের তিন দরুন তের কানি (২২০ একর) জমির চারিদিকে ৩০ থেকে ৪০ ফুট পাড় উঁচু করে খনন করা হয় এ দীঘি । দীঘি খননের পেছনে যে সমস্ত কল্প কাহিনী জনশ্রুতি হয়ে আছে তা হলো কমলার শাসন আমলে চন্দ্রদ্বীপে কায়স্থ ও ব্রাক্ষণদের বসবাস ছিল বেশি এবং ওই সময় তেঁতুলিয়া নদীতে মগ, পর্তুগীজ ও জলদস্যুদের বেপরোয়া উপদ্রব ছিল । ফলে হিন্দু রমণীরা নদীতে ভয়ে স্নান করতে ও জল আনতে যেত না । এ ছাড়া তেঁতুলিয়া নদীর পানি লবণাক্ত হওয়ায় প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট নিবারণের জন্য কমলা রানি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে একটি বিশাল দীঘি খননের ইচ্ছা প্রকাশ করেন স্বামী কালা রাজার কাছে । দীঘি খনন করতে ব্যয় হয় ওই সময় ৯ লক্ষ টাকা । এ প্রসঙ্গে দীঘি খননের পালা গানে উল্লেখ আছে —
“তিন দরুন তের কানি জমি
৯ লক্ষ টাকা ব্যয় , দীঘি
কাটলেন সাগরের সম
ধন্য ধন্য রব পড়ে যায়!”
দীঘির পশ্চিম পাড়ে শ্বেত পাথর দিয়ে ঘাট বাঁধানো হয়। কিন্তু দীঘি কাটা হলেও দীঘিতে পানি ওঠে না। রানি স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন, দীঘির মাঝে পূজা অর্চনা দিলে পানি উঠবে । রানি তাই করলেন । পানিতে দীঘি ভরে গেল, কিন্তু রানি পাড়ে উঠতে পারেননি । দীঘিতে ডুবে তার মৃত্যু হয় । দীঘি নিয়ে এলাকায় বহু কেচ্ছা কাহিনী আছে । দীঘির উঁচু পাড়ে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি । পানিশূন্য দীঘির মাঝে চাষাবাদ হচ্ছে। একদিন ইতিহাসের পাতা থেকে হয়তো মুছে যাবে চন্দ দ্বীপ রাজাদের শৌর্যবীর্যের এ স্মৃতিটুকুও ।
