জমিদারি আমল

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫০
চন্দ্রদ্বীপ হতে সৃষ্ট আওরঙ্গপুর পরগনার একাংশ বর্তমান পটুয়াখালী। এখানে জমিদারী শাসন চলে প্রায় আড়াই শতাব্দীকাল ধরে। প্রবল পরাক্রমশালী সে সময়ের জমিদারগণ আজ শুধুই ইতিহাস। কোথাও কোথাও রয়ে গেছে তাদের কিছু স্মৃতিচিহ্ন। এই জমিদারী আমলের সর্বশেষ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে শহরের নতুন বাজার এলাকার জমিদার রাজেশ্বর রায় চৌধুরীর পরিত্যক্ত কাছারী বাড়ি। সেই আমলে নির্মিত টিনের ছাউনিগুলো এখন ব্যবহূত হচ্ছে পটুয়াখালী সদর উপজেলা ভূমি অফিস হিসেবে। যা সকলের কাছে একোয়ারস্টেট নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, ১৫৯৯ খ্রীস্টাব্দে সম্রাট আকবরের কানুনগু জিম্মক খাঁকে মন্ত্রী রাজা টোডরমল কর্তৃক প্রেরণ করা হয় চন্দ্রদ্বীপে। মোগল সরকার অরন্য অঞ্চলকে চন্দ্রদ্বীপ থেকে পৃথক করে বাজুহা অর্থাত্ সংরক্ষিত এলাকা নামে একটি এলাকা গঠন করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সুবাদার শায়েস্তা খানকে নিয়োজিত করা হয় এই অঞ্চলের মগ-পর্তুগীজ জলদস্যু দমনে। তিনি বিচক্ষণতা, সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে জলদস্যুদের কঠোর হস্তে দমন করতে সক্ষম হন। সম্রাট আওরঙ্গজেব এই যুদ্ধে কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য চন্দ্রদ্বীপ ও বাজুহা হতে নতুন একটি পরগনা সৃষ্টি করে শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমেদকে প্রদান করেন। তার নামানুসারে ঐ পরগনার নামকরণ হয় বুজুর্গ উমেদপুর। বাকেরগঞ্জ, পটুয়াখালী, বেতাগী, আমতলী, বরগুনা, পাথরঘাটা, বামনা প্রভৃতি এলাকা এ পরগনার অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীতে চন্দ্র দ্বীপ-বাজুহা এলাকা থেকেই সৃষ্টি হয় সেলিমাবাদ, বুজুর্গ উপমেদপুর ও আওরঙ্গপুর (পূর্বে বলা হত ঔরঙ্গপুর) পরগনা। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে আওরঙ্গপুর পরগনার সৃষ্টি হয়। সেই অতীতের বুজুর্গ উমেদপুর পরবর্তীকালের আওরঙ্গপুরই হচ্ছে আজকের পটুয়াখালী এলাকা। পটুয়াখালীর ভূমি দপ্তরের পুরানো দলিল দস্তাবেজে উল্লেখ রয়েছে আওরঙ্গপুর পরগনার নাম। সায়েস্তা নগরের জমিদার রাম গোপালের কনিষ্ঠ পুত্র জানকী বল্লভ ছিলেন আওরঙ্গপুর পরগনার প্রথম জমিদার। শুরুতেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আরম্ভ হয়। তার বৈমাত্রেয় ভ্রাতা রাম গোবিন্দ লিপ্ত হয় জমিদারি আত্মসাতের চেষ্টায়। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার স্ত্রী ভবানী দেবীর সহায়তায় জানকী বল্লভ প্রাণে রক্ষা পান। তিনি পালিয়ে তার পিতা রাম গোপালকে অভয়নীল গ্রাম থেকে নিয়ে যান ঢাকায়। নালিশ দায়ের করেন নবাবের দরবারে খানসামা এতমত্ খাঁর সহযোগিতায়। বাংলার সুবাদার আওরঙ্গজেবের পুত্র আজিম-উস-সানের নিকট থেকে ১৬৯৯ সনে জমিদারি লাভ করেন আওরঙ্গপুর পরগনার। নবাবের হুকুম হয় ‘যত ভাটা তত জানকী বল্লভ রায়ের পাটা’। সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ভাটির অঞ্চল আওরঙ্গপুর পরগনার জমিদারি পেলেন তিনি। পটুয়াখালী, মির্জাগঞ্জ ও আমতলী ছিল এই পরগনার অন্তর্গত। তখন এসকল এলাকা ছিল গভীর অরণ্য। জমিদারি লাভের পর জানকী বল্লভ পৈতৃক ভূমি বালিগাঁও গ্রাম ছেড়ে প্রথমে আসেন কলসকাঠী গ্রামে। সেখানে তিনি বসতি স্থাপন করেন। নির্মাণ করেন অট্টালিকা। পরে তিনি পটুয়াখালীর উত্তর পাড়ে লাউকাঠী গ্রামে এসে জঙ্গল কেটে আবাদ করার ব্যবস্থা করেন। ১৭৪৪ সনে বাংলা ১১৫১ সালে তিনি পুনরায় জমিদারি বন্দোবস্ত নেন নিজ গ্রামে। ঐ বন্দোবস্তের শেষভাগে লেখা আছে, ‘১১৫১ সাল, বাদশাহ দীন মোহাম্মদ শাহ আলম বন্দোবস্ত হুজুর, চৌধুরীই শ্রী জানকী বল্লভ রায়’। পরবর্তীতে জমিদারী ভাগ হয় গদাধর, মুকুন্দ, বিদ্যাধর ও রঘুনন্দন এই চারজনের মধ্যে। আওরঙ্গপুর পরগনা নয় আনী ও সাত আনী এ দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। এরা প্রথমে কাছারী স্থাপন করেন বর্তমান পটুয়াখালী জেলা শহর সংলগ্ন নদীর উত্তর পাড়ে লাউকাঠী গ্রামে। তখন দক্ষিণ পাড়ে ছিল গভীর জঙ্গল। সেখানে নদী তীরে ছিল ভয়ংকর এক দস্যুদলের আস্তানা।