পটুয়াখালী শহর পত্তনেরও অনেক আগের কথা। গভীর অরণ্যে ঘেরা সুন্দর বনাঞ্চলের মাঝে উঁচু মাটির টিলার উপর দাঁড়িয়ে এক মন্দির। একদল কাপালিক ছাড়া অন্য কোন জনমানবের পদচারণা ছিল না সেই ভূখণ্ডে। ঐ মন্দিরে চৈত্র অমাবশ্যায় কালী পূজায় দেবীর নামে উত্সর্গ করে দেয়া হতো নরবলি। পাশের নদী দিয়ে যাতায়াতকারী লোকজন ঢাক-বাদ্যের শব্দ শুনে শিউরে উঠে বলত ঐখানে ডাকাতিয়া কালীবাড়ি। ভয়ে সেখানে যেতো না কেউ। কালের পরিবর্তনে জমিদারী আমলে লোকজনের আগমন ঘটে। কাপালিকরা মন্দির পরিত্যাগ করে চলে যায় অন্যত্র। জমিদাররা সেখানে প্রতিষ্ঠা করে সার্বজনীন কালী মাতার মন্দির। প্রায় পাঁচশ বছর আগের সেই ডাকাতিয়া কালীবাড়ি নামে এই মন্দিরকে এখন আর কেউ চেনে না। স্মৃতি বিস্মৃত হয়ে গেছে সকলের কাছে ডাকাতিয়া কালীবাড়ি। এখন সবার কাছে পরিচিত পেয়েছে পটুয়াখালী পুরাতন কালীবাড়ি নামে।
বহুকাল আগে চন্দ্রদ্বীপের উত্তরে প্রবাহিত ছিল বিশাল এক নদী। নাম তার সুগন্ধা। পরবর্তীকালে মৃত প্রায় সুগন্ধা থেকে কীর্তনখোলা, পায়রা, বলেশ্বর, বিষখালী, লোহালিয়া প্রভৃতি নদী প্রবাহিত হয়। পশ্চিমে বলেশ্বর, আর পূর্বে লোহালিয়া পর্যন্ত সমগ্র এলাকাটি হচ্ছে অতীত সুগন্ধার মোহনা। কালের পরিক্রমায় সুগন্ধা শুকিয়ে উত্থিত হয় এক জলাভূমি। সেই জলাভূমি পরিণত হয় গভীর অরণ্য সুন্দর বনে। সমগ্র পটুয়াখালী সেই সুন্দর বন থেকে প্রসূত এলাকা।
চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে এই অঞ্চলে চন্দ্রদ্বীপ নামে এক নতুন রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। ঐতিহাসিকদের মতে, ঐ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা দনুজ রায়। তখন বাউফলের অন্তর্গত কচুয়া নামক স্থানে প্রতিষ্ঠা করা হয় চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী। আশপাশের এলাকায়ও গড়ে ওঠে জনবসতি। সেসময়ে একদল কাপালিক এসে আস্তানা গাড়ে লোহালিয়া ও লাউকাঠী নদীর সঙ্গম স্থলের গভীর অরণ্য মাঝে। তবে তাদের এখানে আগমনের নির্দিষ্ট সময় কিংবা কোথা থেকে কিভাবে আগমন ঘটেছে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দীর্ঘদেহী এই কাপালিকগণ পরিধান করতেন গেরুয়া বসন। গলায় পরতেন নাভি অবধি রুদ্রাক্ষের লম্বা মালা। কপালে অঙ্কিত করতেন সিঁদুরের ত্রিশুল। তারা ছিলেন দেবী কালী মাতার উপাসক। সেসময়ে লোনার কারণে নদীর জল ব্যবহার করা যেত না। জলের জন্য তারা খনন করেন পুকুর। জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে নিজেদেরকে রক্ষায় তৈরি করেন সুউচ্চ মাটির ঢিবি। উপাসনার জন্য সেখানে নির্মাণ করেন মন্দির। সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন কালী মাতার বিগ্রহ। নিত্য পূজা ছাড়াও প্রতি অমাবশ্যায় নানা ধরনের নৈবদ্য সাজিয়ে ভোগের আয়োজন করা হতো। তারা কার্তিকের অমাবশ্যার তিথিতে মায়ের বিশেষ পূজা সমাপন শেষে কাঁধে খড়গ ও ত্রিশুল নিয়ে নামতেন লুণ্ঠন কজে। লুণ্ঠনই ছিল তাদের পেশা। চন্দ্রদ্বীপের জনবসতি এলাকায় ও নৌপথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক নৌকায় ডাকাতি করে তারা লুটে নিত ধন-রত্ন ও প্রয়োজনীয় মালামাল। ফিরে আসার সময় তারা অপহরণ করে আনতেন নিখুঁত ও সুঠামদেহী কোন এক হতভাগ্য অবিবাহিত কিশোর কিংবা যুবককে। তারা ফিরে এসে বিশাল আয়োজন করতেন চৈত্র অমাবশ্যায় কালী পূজার। এই পূজায় কালী মাতার নামে উত্সর্গ করে তাকে দেয়া হতো নরবলি।
