সোশ্যাল নেটওয়ার্ক : সম্পর্ক বিক্রি করার হাট?

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৪
ঘটনা-১ শিহাবের মা বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ। সেদিন বিকেলে মা শিহাবের কাছে এক গ্লাস পানি চান। শিহাব তাঁকে একটু অপেক্ষা করতে বলে। মা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘কী রে! কই? তোরা অসুস্থ হলে তো আমি এমন করি না।’ শিহাব মিনিট কুড়ি পর হাস্যোজ্জ্বল মুখে পানি নিয়ে হাজির হয়— ‘মা জানো, তুমি অসুস্থ হয়েছো, এটা আমার বন্ধুদের জানিয়েছিলাম। এই পোস্টে আমার ১০২ জন বন্ধু লাইক দিয়েছে! আরো অনেকেই কমেন্টও করেছে!’ কথা শুনে মার চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায়!— ‘আমার অসুস্থতার জন্য তোর বন্ধুরা খুশি হয়েছে?!’ এবার শিহাব বেশ বিরক্ত, ‘দূর তুমি কিছুই বোঝো না। ’ ঘটনা-২ সুজাতা আজ অনেক বেশি সেজেছে। বার বার সে আয়নায় নিজেকে দেখছে— সব ঠিক আছে তো! ওদিকে বাবা তাগাদা দিচ্ছেন, ‘মা একটু তাড়াতাড়ি কর, বিদ্যুত্ চলে যেতে পারে!’ হ্যাঁ, সেও বিদ্যুতের গুরুত্বটা বোঝে। কাজী সাহেব এসেছেন। দুইজন সাক্ষীও উপস্থিত। সুজাতা দ্রুত শাড়িটা ঠিক করে এসে কম্পিউটারটা অন করে স্কাইপি চালু করলো। সে প্রার্থনা করছে, আজ যেন বিদ্যুত্ না যায়! মিরাজ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে টুপি মাথায় বসে আছে। সুজাতা তাকে দেখছে, ভিডিও চ্যাট প্রোগ্রাম স্কাইপির মাধ্যমে কম্পিউটারে! হ্যাঁ, আজ সুজাতার বিয়ে। সুজাতা থাকে ঢাকায় আর মিরাজের বাসস্থান নিউইয়র্কে। কম্পিউটারের সাউন্ড বক্সের ভলিউমটা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। ‘কবুল’ ‘কবুল’ ‘কবুল’ শোনার জন্য। সঙ্গে সুজাতাও তিন ‘কবুল’ বললো। সুজাতার চোখে-মুখে তৃপ্তি! ওদিকে মিরাজের মুখেও আনন্দের ঝিলিক। ঘটনা-৩ ক্যাম্পাসে ক্লাসের ফাঁকে লিরা, জয়, অনামিকা, কাঁকন, সঞ্জয় ও রূপম—৬ জনের এই বন্ধুর দল বেশ চুটিয়ে আড্ডা দেয়। কিন্তু ইদানীং লিরা, কাঁকন ও শিহাব আড্ডায় একটু অন্যমনস্ক! একটু সময় পেলেই কেউ তার মোবাইল কিংবা কেউ ল্যাপটপটা বের করে কী যেন করে! সঞ্জয় বললো, ‘কিরে, জয়! এত ম্যাসেজ! নতুন প্রেম-ট্রেম শুরু করলি, নাকি?’ অনামিকা বলে উঠলো, ‘না, না। শুধু ও কেন? লিরা-কাঁকন-ও তো! কিরে তাহলে তো বিশাল খাই-দাই আছে, হ্যাঁ?’ জয় বলে ওঠে, ‘তোরা না, পারিস-ও! প্রেম হলে ঘটা করেই পরিচয় করিয়ে দিবো, বুঝলি! আরে ফেসবুকটা একটু খুলে দেখে নেই! কে কী আপডেট করছে! সঙ্গে সঙ্গে একটু লাইক-টা দিয়ে দেই।’ এগুলো আমাদের আধুনিক সমাজেরই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা। প্রতিটা সম্পর্কই অনেক আপন, অনেক কাছের। অথচ প্রতিটা সম্পর্কেরই কোথায় যেন রয়েছে একটা আবেগশূন্য দূরত্ব! হ্যাঁ, সম্পর্কগুলো থেকে এই আবেগ-অনুভূতিগুলোকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করার এই কৃতিত্ব (!) আপনি অনায়াসেই প্রযুক্তিকে দিতে পারেন। আবেগের জায়গায় আজ যেন অনেক যোগ-বিয়োগ, সমীকরণ, হিসাব, লাভ-ক্ষতি এসে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে কি বাজারের যুগে একান্ত আপন সম্পর্কগুলোতেও লেগেছে কর্পোরেটীয় হাওয়া? বাজার এখন সম্পর্কগুলোকেও দখল করছে? যোগাযোগের নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করাচ্ছে বাজার? বাজারের হাওয়া যোগাযোগে : যোগাযোগের নতুন সংজ্ঞায়ন? বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের বিষয় গণযোগাযাগ ও সাংবাদিকতা হওয়ায় যোগাযোগকে পাঠ্যসূচিতে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সেই সুবাদেই জেনেছি, খুবই সাধারণ ভাষায়, যোগাযোগ হলো দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে সংকেত ও প্রতীকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনে তথ্য, ধারণা, অনুভূতি আদান-প্রদানের একটি প্রক্রিয়া। পরবর্তী সময়ে হ্যারোল্ড ডি. ল্যাসওয়েল যোগাযোগের সংজ্ঞায়নে ‘কে’ বলেছেন, ‘কাকে’ বলেছেন, ‘কোন মাধ্যমে’ বলেছেন এবং এতে ‘প্রভাব’ কেমন— এমন একটা প্রক্রিয়াতে যোগাযোগকে ব্যাখ্যা করেন। শ্যানোন ও ওয়েভার তাঁদের প্রদত্ত মডেলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘নয়েজ’-এর কথা প্রথম উল্লেখ করেন। যোগাযোগকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রথমবারের মতো উইলবার শ্র্যাম ‘সিগন্যাল’ বিষয়টির সংযোজন ঘটান। তিনি তাঁর দ্বিতীয় মডেলে ‘অভিজ্ঞতা’ এবং তৃতীয় মডেলে ‘ফিডব্যাক’ বিষয়টিকে নজরে নিয়ে আসেন। সর্বশেষ ‘মিউচুয়াল আন্ডারস্টান্ডিং’-এর সংযোজন ঘটান রজার্স কিনকেইড। অর্থাত্ শুরু থেকেই যোগাযোগের মধ্যে দুটি পক্ষ দেখা যায়। একজন, যিনি বার্তা প্রেরণ করেন— প্রেরক ও আরেকজন, যিনি বার্তা গ্রহণ করেন— প্রাপক। কিন্তু বাজারের যুগে, মুনাফার যুগে এখানে তৃতীয় এক পক্ষের উপস্থিতি যেন সহজাত হয়ে উঠছে। যিনি পুরো যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যিনি প্রেরক-প্রাপকের যোগাযোগের উদ্দেশ্য, যোগাযোগের চাহিদা তৈরি করছেন। এখানে তৃতীয় পক্ষ হলেন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক পক্ষ। পাঠক, আসুন, একটু সহজ করা যাক। সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোর কথা ভেবে দেখুন তো, তারা আসলে কী করছে? বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন ভিন্ন আচার-ব্যবহারের তাবত্ মানুষকে একটা হাট তৈরি করে দিয়েছে। সেই মানুষের হাট থেকে আপনি বেছে নিচ্ছেন আপনার বন্ধুবেশী যোগাযোগের পার্টনারকে। এই ধরনের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান ‘অভিজ্ঞতা’ এবং ‘মিউচুয়াল আন্ডারস্টান্ডিং’ বিবেচনায় আসে না। এখানে তৃতীয় পক্ষ, অর্থাত্ নিয়ন্ত্রক প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে যোগাযোগের একটা উদ্দেশ্য তৈরি করে দিচ্ছে। যোগাযোগের মোট তিনটি মাধ্যমের কথা বলা হয় :ওরাল, ভিজ্যুয়াল ও রিটেন (ডেনিস এম সি কুয়েল)। অনেকেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোকে এই তিন নম্বর খাতে ফেলতে ইচ্ছুক। কিন্তু লেখার মাধ্যমে যার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, তিনি অবশ্যই প্রেরকের পূর্ব পরিচিত। এবং সেখানে খুব সাধারণভাবেই দুজনের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা, অভিজ্ঞতা, নির্দিষ্ট কিছু সংকেত ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে, যা এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোতে স্পষ্টতই অনুপস্থিত। কিন্তু কথিত এই যোগাযোগ মাধ্যমে আপনি শতভাগ আগ্রহী কারণ এই যোগাযোগে আপনাকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না। আপাত বিচারে, আপনি লাভবান-ই হচ্ছেন বৈ কি! সোশ্যাল নেটওয়ার্ক :সম্পর্ক বিক্রি করার হাট? ব্যবসায় একটা কথা খুবই প্রচলিত। কোনো কিছুর জন্য যখন আপনি কোনো মূল্য পরিশোধ করছেন না, তখন বুঝতে হবে, সেখানে আপনিও একটা পণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। আর ফেসবুকের ক্ষেত্রে আপনার মূল্যটা বছরে ৪.৮৪ মার্কিন ডলার! ফেসবুক যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় প্রতি ব্যবহারকারীর মাধ্যমে বিজ্ঞাপনী রেভিনিউ আয় করে ৯.৫১ মার্কিন ডলার, ইউরোপে ৪.৮৬ মার্কিন ডলার, এশিয়ায় এটা ১.৭৯ মার্কিন ডলার এবং বিশ্বের বাকি দেশে ১.৪২ মার্কিন ডলার। আমেরিকার পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর গড়ে ২২৯ জন বন্ধু থাকে। ফলে যখন একজন ব্যবহারকারী একটি পণ্য অথবা কোম্পানির বিজ্ঞাপন পছন্দ করে তখন তারা সেটা তার পরিচিত বন্ধুদের কাছে পাঠায়। আমেরিকার নীলশেন মিডিয়া রিসার্চ (এনএমআর) তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বন্ধুর নাম দেখলে ৬০ শতাংশ মানুষ সেই পণ্যটি ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর এজন্যই ফেসবুক বিজ্ঞাপনের জন্য অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০১৩ সালে সংবাদ সংস্থা রয়টারের হিসাবে, ফেসবুক এক মিলিয়ন কোম্পানি ও ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনী প্লাটফর্ম। ‘স্পন্সর নিউজ ফিড’ ছাড়াও ফেসবুকের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে বিজ্ঞাপন চালু করেছে ফেসবুক। বর্তমান আয়ের ১৪ শতাংশ এখন মোবাইল বিজ্ঞাপন থেকেই আসছে। মোবাইলের মাধ্যমে বর্তমানে ৪৮৮ মিলিয়ন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছেন। বিজ্ঞাপনের জন্য বেশি জায়গা বের করতে ফেসবুকের টাইমলাইনেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। ফেসবুক ব্যবহার না করলেও ফেসবুকের কোনো ক্ষতি নেই। কারণ যাঁরা ফেসবুক ব্যবহার ছেড়ে দেবেন, তাঁদের কাছ থেকেও অর্থ আয় করার পথ বের করেছে ফেসবুক। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে থার্ড পার্টির অ্যাপ্লিকেশন প্লাটফর্মে বিজ্ঞাপন কৌশল পরীক্ষা করেছে ফেসবুক। ব্যবহারকারীর তথ্যের বিনিময়ে এই অর্থ আয় করার কৌশল নিয়েছেন ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। আবার আপনার ফেসবুকে করা মন্তব্যটি জনপ্রিয় করতে চান বা সবার কাছে পৌঁছাতে চান? এজন্য সর্বনিম্ন সাত ডলার খরচ করলেই হবে। বন্ধুকে কোনো উপলক্ষে উপহার দিতে চাইলে ফেসবুকের পাতায় গিফটস নামের একটি আইকনে ক্লিক করলেই চলে। এটাও আয়ের একটা কৌশল মাত্র। অপরিচিত কাউকে বার্তা পাঠাতে বা তাকে বন্ধুত্বের জন্য প্রস্তাব পাঠাতে ফেসবুকের আয় এক ডলার। ফেসবুকে আপনি বন্ধুর পোস্টে লাইক অপশনে ক্লিক করবেন, নতুন বন্ধুর সংযোজন কিংবা নতুন ফ্যান ক্লাবে যোগ দেবেন, নিজ স্ট্যাটাস আপডেট কিংবা বন্ধুদের ছবি ট্যাগ করবেন— সবই আপনার কাছে বন্ধুত্বের জন্য কিংবা সম্পর্কের জন্য; কিন্তু এসবই ফেসবুককে কোটি কোটি ডলারের অধিকারী একটি কোম্পানি করে তুলেছে। আগে (ফিজিক্যাল বিশ্বে) সম্পর্ককে বোঝা হতো অপরের সঙ্গে কাটানো সময়ের দৈর্ঘ্য দিয়ে। অর্থাত্ কতটা সময় মানুষ একে অপরের সঙ্গে অতিবাহিত করছে সেটাকে। আর ফেসবুক এখন মানুষের আবেগগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে ৪২০ বর্ণ আর কিছু ছবি দিয়েই সেই জায়গা দখল করেছে। মানুষ অনেক ব্যস্ততার এই সময়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবেই নেটে বসে তৈরি করা কিছু সাইবার ‘বন্ধুত্ব’-কে টিকিয়ে রাখতে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ভেবে দেখুন তো, আপনি আপনার শৈশব কাটানো গ্রামে থাকা ফুপু কিংবা মামার খোঁজ নিয়েছেন কিনা? কিন্তু ফেসবুকে আপনি সবচেয়ে ‘অ্যাকটিভ বন্ধু’! খুবই স্পষ্ট করেই এটা দাবি করা যায়, ফেসবুকে কোনো সম্পর্ক কিংবা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না। এটা কোনো যোগাযোগ মাধ্যমও নয়। এটা একটা বৃহত্ মনস্তাত্ত্বিক ব্যবসা মাত্র। দিনশেষে মানুষের সমস্যা সাইকোলোজিক্যাল। সে চায় শেয়ার করতে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ও সাইকোলোজিতে অধ্যয়ন করা মার্ক জুকারবার্গ এই বিষয়টা ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং এটাকে কেন্দ্র করেই ২০০৪ সালে ফেসবুক তৈরি করেন। ২৯ বছর বয়সী জুকারবার্গ আজ আমেরিকার একজন ধনকুবের। প্রযুক্তি তাই আজ অনায়াসেই কিনে নিচ্ছে আবেগ! স্বামী-স্ত্রী ট্রেনে ভ্রমণে বের হয়েছেন। ট্রেন এক স্টেশনে থামলে স্ত্রী এক আমলকি দোকানিকে দেখে সেখান থেকে স্বামীকে আমলকি আনতে পাঠান। ট্রেন আবার যাত্রা শুরু করলে স্বামী দোকানির কাছ থেকে দ্রুত শুধু আমলকি নিয়েই স্ত্রীর বাড়ানো হাতে হাত রেখে লাফিয়ে ট্রেনে উঠতে চান, কিন্তু স্ত্রী তাঁর বাড়ানো হাতটি দিয়ে আমলকি নিয়ে নেন এবং প্যাকেটে লবণ না দেখে বলেন, ‘লবণ কই?’। এদিকে ট্রেনের গতি বাড়তে থাকে। হ্যাঁ, পাঠক, এটা একটা ফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপনের কাহিনি চিত্র। বিজ্ঞাপনের শেষে শোনা যায়, ‘আর কেউ না বুঝুক, আমরাই বুঝি আপনার ফিরে আসার গুরুত্ব’! ঢাকা