হিংসাত্মক রাজনৈতিক মনোভাব বাংলাদেশকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা নির্বাচিত শাসনব্যবস্থা যেখানে সরকার জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ দেশের গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা। আমরা বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আমাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম হচ্ছে গণতন্ত্রবিরোধী। একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং ন্যায়সঙ্গত হলে বিরোধী পক্ষের মতামতকে বিবেচনায় আনতে হবে যা আমাদের দেশের ইতিহাসে বিরল।
একটি প্রবাদ বাক্য আছে— যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা, যা আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশে বহুল প্রচলিত— যে কারণে বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দলের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্তকে নাকচ করে দেয় (হোক সেটি দেশের জন্য মঙ্গলজনক বা অমঙ্গলজনক) এবং তাদের মনোভাব দেখে মনে হয় যে বিরোধী দলে থাকা মানে সরকারের কাজে বাধা দেওয়া। অপরপক্ষে, বিরোধী দল কোনো মতামত পেশ করলে সরকারি দলের কাজ হচ্ছে কোনো ধরনের কর্ণপাত না করে দেশের স্বার্থবিরোধী বলে এড়িয়ে চলা— যা গণতন্ত্রের মতাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ প্রসঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালেই সহজে বুঝতে পারবো যে আমরা গণতন্ত্রকে পরিচর্যার মাধ্যমে কতটুকু আত্মস্থ করতে পেরেছি।
সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমের আলোচিত খবর হচ্ছে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে নোংরা ও অশালীন ভাষায় কটুক্তি করা। একদল আরেকদলকে দুর্নীতিবাজ, লুটবাজ, গণতন্ত্রবিরোধী বলে নোংরা কথার বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয় যা দেখে সচেতন তরুণ সমাজ আজ দ্বিধাগ্রস্ত। আমরা তাদের কাছ থেকে কী শিখবো? সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে এদেশের রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য দেখা যায় (যেমন আমরা রাজনীতিকে ঘৃণা করি)। সংসদ অধিবেশন চলাকালে প্রতি মিনিটে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ হয় যে টাকা এদেশের মেহনতি মানুষের কাছ থেকে আসে। সংসদে তাদের সমস্যার বিষয়ই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। আমরা এ ধরনের নিন্দনীয় কাজের পুনরাবৃত্তি চাই না এবং কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়নের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আমরা ২০১২ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে ফিরে তাকালে গণতন্ত্রকে সহজেই বুঝতে পারবো। ফলাফল ঘোষণার পর বিরোধী দলের প্রার্থী মিট রমনি পরাজয় বরণ করে বিজয়ী প্রার্থী বারাক ওবামাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচনের চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীত এই অর্থে যে পরাজিত ব্যক্তি বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে ঘোষিত ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন যা প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। সর্বোপরি, আমরা যেহেতু গণতন্ত্রে বিশ্বাসী তাই আমাদের চিন্তা-চেতনাকে গণতন্ত্রের পথে ও আদর্শে লালিত করতে হবে এবং যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত করতে হবে গণতান্ত্রিক পন্থায়। তবেই বিজয় হবে গণতন্ত্রের, মঙ্গল হবে দেশের, দেশের জনগণের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
