মহাসড়কে চলছে গণচাঁদাবাজি

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৩, ২২:৫৩
সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজির ঘটনা নতুন নয়। তবে যখনই চাঁদাবাজি বেড়ে যায় তখনই তা আলোচনায় চলে আসে। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হয়, মালিক-শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। আবার কিছুদিন থামে, তারপর আবারো শুরু হয় আগের মতোই চাঁদাবাজি। বর্তমানের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন যা হচ্ছে তা এক কথায় গণচাঁদাবাজি। যে যার মতো পারছে চাঁদা তুলছে। কারো কোন জবাবদিহিতা নেই। আর এ চাঁদাবাজি যারা করছেন তারা বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নামেই চাঁদা নিচ্ছেন। হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি এম আসাদুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, ‘চাঁদাবাজি হচ্ছে, পুলিশ চাঁদাবাজি করছে—এমন শব্দগুলো আসলে হাইপোথিটিক্যাল। কারো বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করতে হলে সুনির্দিষ্টভাবেই করতে হবে। পুলিশের বিরুদ্ধে কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। অযথা অভিযোগের জন্য শুধু অভিযোগ করলেই হবে না। তথ্য-প্রমাণ দিয়ে অভিযোগ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ রাজশাহীর পরিবহন শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে গত দুই দিন ধরে পরিবহন বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন করছেন। তাদের ১০ দফা দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। গতকাল দুপুরে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে পরিবহন শ্রমিক, মালিক ও পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের একটি বৈঠক হয়। সেখানে একজন পরিবহন মালিক অভিযোগ করেন, বঙ্গবন্ধু সেতুর দুই প্রান্তে ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে পুলিশ চাঁদাবাজি করে। জবাবে বৈঠকে উপস্থিত ওই অঞ্চলের হাইওয়ে পুলিশের এসপি ইসমাইল হাওলাদার বলেন, এ তিনটি স্পটের একটি জায়গাতেও হাইওয়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করে না। জেলা পুলিশ সদস্য এসব জায়গায় থাকেন। ফলে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষে এর জবাব দেয়া সম্ভব নয়। তার দাবি হাইওয়ে পুলিশ চাঁদাবাজি করে না। রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসা একটি পরিবহনের মালিক ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, রাজশাহী থেকে ছেড়ে একটি বাস ঢাকায় আসতে দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। আর যে সব জেলা পার হয় ওই জেলাগুলোতে মাসিক ভিত্তিতে সার্জেন্টদের ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। তিনি বলেন, রাজশাহী থেকে বাসটি ছাড়তে হলে নানা রশিদে প্রায় ৪০০ টাকা দিতে হয়। এরপর একটু এগুলেই মালিক সংগঠনের চেকপোস্ট। তাতে দিতে হয় ৫০ টাকা। এরপর কাঁটাখালী, বানেশ্বর, পুঠিয়া, নাটোর, বনপাড়া, বঙ্গবন্ধু সেতুর দুই পাশ, এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল, কালিয়াকৈর শ্রমিক সংগঠনের নামে ২০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এর বাইরে পোশাকি পুলিশ সামনে চলে এলে তাকে তো কিছু দিতেই হয়। তিনি বলেন, প্রতিটি বাসের কিছু না কিছু সমস্যা থাকে। আর কোন সমস্যা না থাকলে অতিরিক্ত স্প্রিড, কালো ধোঁয়াসহ নানা অযুহাতে সামনে এসে দাঁড়ায় পুলিশ। কোথাও শ্রমিক সংগঠনকে চাঁদা না দিলেও পুলিশ বাসটি থামিয়ে হয়রানি করে। ফলে বোঝাই যায় এসব কথিত শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ সদস্যদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। বাস মালিকের এ অভিযোগের ব্যাপারে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি বলেন, নিজের দোষ থাকলে তো আরেকজনকে দায়ী করা যাবে না। তিনি বলেন, ‘আমি বলছি না যে সব পুলিশ সদস্য ভালো, কিন্তু কেউ নিজে বৈধ থেকে রাস্তায় চলার পর পুলিশ কাউকে হয়রানি করলে অবশ্যই আমি দেখব। তার জন্য আমাকে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, তাদের দেয়া প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করলে মহাসড়কে কোন চাঁদাবাজিই থাকত না। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সরকার তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি বন্ধে যোগাযোগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তারা যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাতে বলা হয়েছিল, রাজশাহী থেকে কোন বাস ছেড়ে পথের মধ্যে কোন টার্মিনালে না ঢুকলে কোথাও তাদের চাঁদা দিতে হবে না। আর কোন টার্মিনালে ঢুকলে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে একসঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি চাঁদা দিয়ে চলে যাবে। পুরো বৈধ চাঁদার টাকাটা এক জায়গা থেকে নিলে কেউ আর পথের মধ্যে অযাচিতভাবে চাঁদা দাবি করতে পারত না। জানা গেছে, মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য মালিক-শ্রমিক ও প্রশাসনের সহায়তায় একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ২০১০ সালের ১২ জুলাই প্রথম বৈঠকে দেশের পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধের বিষয়ে একমত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ওই কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা ভেঙ্গে দেয়। পরে চাঁদাবাজি বন্ধে কাজের কাজ আর কিছুই হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিবহন ব্যবসায়ী জানান, সায়েদাবাদ নতুন রাস্তা, মাওয়াঘাট, ভাঙ্গায় পুলিশ সার্জেন্টদের নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসোহারা দিতে হয়। মাসোহারা না দিলে মামলাসহ নানাভাবে হয়রানি করে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলা থেকে রাজধানী ঢাকা আসার পথে মাওয়া অথবা পাটুরিয়া ঘাট পার হতে হয়। দুটি ঘাটেই ট্রাকের কাছ থেকে পারাপারের নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করা হয়। চালকরা অভিযোগ করে বলেন, কোন ঘাটেই দালাল না ধরে সরাসরি টিকেট কেনা যায় না। আর এসব দালাল স্থানীয় প্রভাবশালী মহল পালন করে বলে অভিযোগ করেন ট্রাক মালিকরা।