হরতালে রাজধানীসহ কয়েক স্থানে ভাংচুর, আগুন ককটেল বিস্ফোরণ

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৫
ইসলামী ছাত্র শিবিরের ডাকা হরতালে গতকাল বুধবার রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি স্থানে বিক্ষিপ্ত ককটেল বিস্ফোরণ, কভার্ড ভ্যানে আগুন, পুলিশের সাথে পিকেটারদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। হরতাল চলাকালে রাজধানীতে অধিকাংশ দোকানপাট খোলা ছিল। সচিবালয়সহ অফিস-আদালতের হাজিরা ছিল প্রায় স্বাভাবিক। ব্যাংকে লেনদেন হয়। বিমান, রেল ও লঞ্চ চলাচল করেছে। মহানগরীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যানবাহন চলাচল করেছে। তবে প্রাইভেট গাড়ি কম চলাচল করার পাশাপাশি দূরপাল্লার রুটে কোন বাস ছেড়ে যায়নি। হরতালের পক্ষে ও বিপক্ষে রাজপথে মিছিল হয়েছে। হরতালে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক রাখা হয়। কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ আটক নেতাদের মুক্তি এবং ‘নিখোঁজ’ নেতাদের সন্ধান দাবিতে গতকাল রাজধানীসহ সারাদেশে হরতাল পালন করে শিবির। তবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকা ও কিশোরগঞ্জ জেলা হরতালের আওতামুক্ত ছিল। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর আজিমপুরে হরতালের সমর্থনে বের হওয়া মিছিল থেকে পিকেটাররা মিল্কভিটা কোম্পানির একটি কভার্ড ভ্যানে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পরে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর কর্মীরা গিয়ে আগুন নেভান। ততক্ষণে আগুনে গাড়িটির অনেকাংশ পুড়ে যায়। ভোর সাড়ে ৬টায় গুলশানের শাহজাদপুর এলাকায় একটি গলির মুখে হরতালের সমর্থনে শিবির কর্মীরা মিছিল বের করে। সেখানে তারা ৬টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। বেলা ১১টার দিকে শাহবাগ মোড়ে পূবালী ব্যাংক সংলগ্ন এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। সকাল পৌনে ৭টায় মিরপুর-১ নম্বর গোলচত্বর এলাকা থেকে শিবিরের নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করে। পরে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এদিকে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ শিবিরের ডাকা হরতাল প্রত্যাখ্যান করে গতকাল দুপুর সাড়ে ১১টায় শাহবাগে হরতালবিরোধী মিছিল বের করে। মিছিলটি শাহবাগ থেকে টিএসসি রাজু ভাস্কর্য হয়ে আবার শাহবাগ কাঁটাবন ঘুরে আসে। এ মিছিল শুরুর আগে কে বা কারা শাহবাগে দুইটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উত্তর বাড্ডায় শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ফাঁকা গুলি চালায় পুলিশ। পরে শিবির কর্মীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। এদিকে হরতাল চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজধানীতে ১১ জনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে ৬ জনকে ৬ মাস করে জেল দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। আমাদের ব্যুরো অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা সারা দেশের হরতাল পরিস্থিতির খবর জানানঃ চট্টগ্রামে ঢিলেঢালা হরতাল চট্টগ্রাম ঃ বুধবার শিবিরের ডাকা হরতালে নগরীর বিভিন্ন স্থানে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ ও পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হরতালে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে মঙ্গলবার রাত আড়াইটায় উত্তর মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি ফখরী জাহান সিরাজকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এছাড়া হরতাল চলাকালে নগরীর বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের দায়ে ৫ শিবির কর্মীকে আটক করা হয়। নগরীর খাতুনগঞ্জ, ষোলশহর দুই নম্বর গেট এবং জেল রোডে দুইটি টেম্পো ও একটি হিউম্যান হলারে অগ্নিসংযোগ করে পিকেটাররা। বাকলিয়া থানাধীন চামড়ার গুদাম এলাকায় শিবিরকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় বাকলিয়া থানার এএসআই রবিউল আহত হন। হরতালে শহরের অনেক এলাকাতেই দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল ও জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক ছিল। রাস্তায় ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি না চললেও প্রচুর বাস, রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করেছে। সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) ঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় পিকেটারদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। এ ঘটনায় ৩ শিবিরকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে পৌরসভা জামায়াতের আমীর মো. তৌহিদুল হক চৌধুরী দাবি করেন। রাজশাহী ঃ বুধবার ভোর সাড়ে ৬টায় হরতালের শুরুতে নগরীর কাজিহাটা বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ছাত্রশিবির কর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছে। কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। হরতালে দূরপাল্লার বাস-ট্রাক চলেনি। তবে আন্তঃজেলা রুটে বাস চলাচল করেছে। মহানগরীসহ সকল উপজেলার প্রধান ও বাইপাস সড়কে হালকা যানবাহন এবং পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। বরিশাল ঃ বরিশালে শিবিরের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে গতকাল বুধবার সকালে বাস ও টেম্পুতে অগ্নিসংযোগ-ভাংচুর, ককটেল বিস্ফোরণ, টায়ারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ভোর ৫টায় নগরীর সিএ্যান্ডবি রোডে একটি সিটি বাস ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় হরতাল সমর্থকরা। এসময় বেশ কয়েকটি টেম্পু ভাংচুর করা হয়। প্রায় একই সময় বিএম কলেজের সামনে একটি টেম্পুতে অগ্নিসংযোগহ কয়েকটি টেম্পু ভাংচুর ও কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। হরতালকে কেন্দ্র করে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল না করলেও নগরীতে জীবন-যাত্রা ছিল স্বাভাবিক। খুলনা ঃ ককটেল বিস্ফোরণ, বিক্ষোভ মিছিল ও পিকেটিংয়ের মধ্যদিয়ে গতকাল বুধবার ইসলামী ছাত্র শিবিরের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল খুলনায় ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়েছে। সকাল ৭টার দিকে শিবির কর্মীরা ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রূপসা সেতু এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল, টায়ারে আগুন ও সড়কে ইট ফেলে বিক্ষোভ করে। এ সময় সেখানে দুইটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। যশোর ঃ যশোরে শিবিরের ঢিলেঢালা হরতালে বুধবার সকাল ৭টার দিকে শহরের নিউমার্কেট এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে গ্লাস ভাংচুর করে শিবির কর্মীরা। মনিহার এলাকায় ভাংচুর করে ৪টি ইজিবাইক। অফিস-আদালত, ব্যাংক, বীমাসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও লোকজনের উপস্থিতি ছিল কম। কুমিল্লা ঃ হরতাল চলাকালে শিবিরকর্মীদের হামলায় কুমিল্লার বুড়িচং থানার একজন এএসআইসহ ৩ পুলিশ এবং সদর দক্ষিণ থানার ২ জন পুলিশ সদস্যসহ মোট ৫ জন আহত হন। এসময় সদর দক্ষিণে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে ভাংচুর চালায় শিবিরকর্মীরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সৈয়দপুর এলাকায় সকাল ৭টার দিকে শিবিরকর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ এতে বাধা দেয়। এসময় শিবিরকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং ৫টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। বুড়িচং থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, ইট-পাটকেলের আঘাতে থানার এএসআই মোজাম্মেল, কনস্টেবল আবু তাহের, আবদুল হামিদ আহত হয়েছেন। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ২০ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুঁড়ে। অপর দিকে সকাল সাড়ে ৬টায় মহানগরের কুমিল্লা-লাকসাম সড়কের নোয়াগাঁও চৌমুহনী এলাকায় হরতাল সমর্থকরা খাবার বহনকারী পুলিশের একটি পিক-আপে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। এসময় তাদের হামলায় কনস্টেবল সুরুজ ও পিক-আপ চালক কনস্টেবল তপন আহত হন। এসময় শিবির কর্মীরা ৪টি ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এছাড়া সকাল সোয়া ৯টার দিকে মহানগরীর লাকসাম রোডস্থ টমছমব্রিজ এলাকায় শিবির কর্মীরা ৬টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। সাতক্ষীরা ঃ সাতক্ষীরায় টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাংচুর ও ১৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে হরতাল। ফেনী ঃ শহরের বেশ কয়েকটি জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পিকেটাররা রাস্তায় আগুন দিয়ে ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শিবিরকর্মীরা কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করেছে। পুলিশ ৩ শিবিরকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া জেলার ৬টি উপজেলার কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। লক্ষ্মীপুর ঃ লক্ষ্মীপুরে বিক্ষোভ মিছিল, গাড়ী ভাংচুর, হাতবোমা বিস্ফোরণ ও সড়ক অবরোধের মধ্য দিয়ে হরতাল পালিত হয়েছে। সকালে শহরের মিয়া রাস্তার মাথায় সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে যানচলাচল বন্ধ করে দেয় জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা। এসময় ওই স্থানে ১০/১২টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা। সিরাজগঞ্জ ঃ সিরাজগঞ্জে গাড়ি ভাংচুর, পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও টিয়ারশেল রাবার বুলেট নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে পালিত হয় হরতাল। শিবির কর্মীরা মহাসড়কে অন্তত ২৫টি যানবাহন ভাংচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে হরতালকারীদের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ৩০ রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। জীবনযাত্রা ছিলো স্বাভাবিক - স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারাদেশে হরতাল চলাকালে কয়েকটি স্থানে শিবির কর্মীরা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ১১টি গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করেছে। বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ৩৫টি ককটেলের। এছাড়া কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানাধীন সৈয়দপুর (ডুবাইচর) নামক স্থান ও কুমিল্লা সদর থানাধীন নওগাঁ চৌমুহনী নামক স্থানে পিকেটিংয়ের চেষ্টাকালে পুলিশ বাধা প্রদান করলে হরতালকারীরা পুলিশের উপর মারমুখী হয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশের এসআই মোজাম্মেল হক, কনষ্টেবল আবু হানিফ ও কনষ্টেবল আবু তাহের, পিকআপের ড্রাইভার নায়েক তপন চাকমা, কনষ্টেবল সুরজ আলী আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এছাড়া হরতাল চলাকালে শিবির কর্মীরা কয়েকটি স্থানে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের প্রতিরোধ করলে তারা পালিয়ে যায়। গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।