কাঁচা ঘুমটা হঠাত্ ভেঙে গেল। চোখ মেলে তাকায় আরমান। চোখেমুখে দারুণ বিরক্তি। মেজাজ খারাপ। অনেক রাতে ঘুমিয়েছিল আরমান। ছুটির দিন আগামীকাল। অফিস-আদালত বন্ধ। ইউনিভার্সিটির ক্লাসও হবে না। রাতে ঘুমুতে যাবার সময় ভেবেছে সকাল দশটা পর্যন্ত সে ঘুমুবে। অনেক বিষয়ের মধ্যে ঘুম তার একটি প্রিয় বিষয়। কিন্তু ঘুমটা বুঝি হলো না। এত সকালে কে এসেছে? বালিশের তলা থেকে ঘড়ি বের করে দেখে—সকাল দশটা নয়, বাজে মাত্র পৌনে ছটা।
কলিংবেলটা এখনো একটানা বেজে চলেছে।
না, বাসায় আর কেউ ঘুম থেকে জাগছে না। উপায়হীন আরমান চোখে ঘুম নিয়ে বিছানা ছাড়ে। শীত লাগছে। দরজা খোলে সে। আশ্চর্য বিস্ময়ে আরমান বিমূঢ়। দরজার ওপাশে যাকে দেখছে, তাকে কখনোই আশা করেনি। ঘুম এবং ঘুমের অবচেতনে করোটির ভেতর উইপোকার তীব্র কামড় অনুভব করে।
যে ওপাশে দাঁড়ানো—সেও তাকিয়ে তাকিয়ে আরমানকে দেখছে। ঠিক দেখছে নয়—নিরীক্ষণ করছে। তার মুখে লাল চাপদাড়ি। এই দাড়ি কালোই হয়। দাড়িকে মেহেদি মেখে লাল করে। মাথায় গোল সাদা টুপি, সারা শরীরে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাফনের সাদা কাপড়ে ঢাকা। চোখ দুটো বেশ বড় বড়। মণি দুটো দ্রুত নড়ে। মানুষটা সাদাময়। মনে হয় সাদা কাপড় তার প্রিয়। হাতে পুরোনো ছাল ওঠা চামরার ব্যাগ।
তুমি আরমান না? সাদাময় মানুষটি জিজ্ঞেস করে।
মাথা নেড়ে তার জিজ্ঞাসায় সমর্থন জানিয়ে আমরান বলে—হ্যাঁ, আমিই আরমান।
আমাকে চিনতে পারোনি? অমন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছ কেন? তার কথায় একটি শ্লে¬ষ। কিছু রাগও। আমি তোমার আফসার মামা। বিরক্তির সঙ্গে কথাটা আফসারউদ্দিন শেষ করে তাকায় আরমানের দিকে।
আমি আপনাকে চিনেছি।
এখন দরজা থেকে সরো—আমি ভেতরে ঢুকব।
এতক্ষণে খেয়াল হয় আরমানের—ঘুম চোখে পুরো দরজা জুড়ে দাঁড়ানো সে। দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। আফসার ভেতরে ঢোকে। চামড়ার ব্যাগটা নামিয়ে রাখে মেঝেতে। চেয়ারে বসে আয়েশ করে। হাই তোলে। টুপিটা খুলে টেবিলে আদবের সঙ্গে রাখে। চারপাশে চোখ বুলায়। দেয়ালে একটা ছবির দিকে তার চোখজোড়া আটকে যায়। কপাল কুঁচকে সে তাকিয়ে থাকে।
ঘরে ছবি থাকলে ফেরেস্তা আসে না—মন্তব্য করে। এই মন্তব্যটা সে কাকে উদ্দেশ করে বলছে—আরমান বুঝতে পারে না। তোমার মা কোথায়? আফসার জিজ্ঞেস করছে আরমানকে। এখনো কেউ ঘুম থেকে উঠেনি। নামাজ পড়ে বলে মনে হয় না।
আফসার সাহেবের কথা শেষ হয় না, আরমানের মা, আফসার সাহেবের ছোট বোন জোবেদা বেগম বড় ভাইয়ের পায়ের ওপর হুমড়ি খায়। পরপর তিনবার তার পয়ের ধুলো ঠোঁটে ও বুকে ছোঁয়ায়।
কেমন আছেন ভাইজান? হাস্যোজ্জ্বল মুখে জোবেদা বেগম বড় ভাইয়ের কুশল জানতে চায়।
তেমন একটা ভালো নেই। পেটের ব্যথা আবার বাড়ছে। তোমার অন্য ছেলেমেয়েরা?
সবাই ঘুমুচ্ছে ভাইজান। জানেন তো, এ বাসার লোকজনের ঘুম ভাঙে একটু দেরিতেই। ভেতরে আসুন, বিশ্রাম নেবেন।
ঠিক আছে, চলো। ব্যাগটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল আফসারউদ্দিন।
আরমান ঠায় দাঁড়ানো দরজার সামনে।
বিক্ষিপ্ত যন্ত্রণায় তার শান্ত মনটা কেমন কুয়াশায় ঢেকে গেছে ভাবছে সে—আজকের দিনের শুরুটা ওই মানুষটার মুখ দেখে কেন শুরু হলো? কয়েক বছর আগে প্রতিজ্ঞা ছিল—এ জীবনে কোনোদিন মায়ের একমাত্র ভাই, সংসারের একমাত্র মামা আফসারউদ্দিনের মুখ সে দেখবে না। সেই মুখ দেখতে হলো? শুধু কি দেখা? ঘরে ঢোকার দরজা পর্যন্ত খুলে দিতে হয়েছে। আবার একই ঘরে, একই ছাদের নিচে থাকতে হবে। টেবিলে মুখোমুখি বসে, চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে?
মা কতবার বলেছে—আরমান, মামাবাড়ি থেকে এবার বেড়িয়ে আয়।
তুমি সব জানার পরও আমাকে যেতে বলছ মা?
এখন যাস না। কিন্তু ছোটবেলায়? তখন তো বছরে তিন-চারবার মামাবাড়ি যেতি। তোর মামা তোকে কত আদর করত।
আরমান হাসে—মা, সে তো ছোটবেলার কথা। তখন তো পাপ-পুণ্য বুঝতে পারতাম না। এখন তো সবকিছু বুঝতে পারি। নিজের কাছে আমার কিছু দায়বদ্ধতা আছে। কথা ও কাজের বাস্তবতার কারণে নিজস্ব কমিটমেন্ট থেকে সস্তা আবেগের কাছে পরাজিত হতে পারি না।
মায়ের মুখ কালো হয়। নিজের মায়ের পেটের একমাত্র ভাইকে, আপন পেটের সন্তান তীব্র ঘৃণা করে—একথা কাউকে বলা যায় না। আর বুকের মধ্যে এটা একটা দহন। কলজে, রক্ত, মাংস, যন্ত্রণায় সিদ্ধ হয়।
কথা প্রসঙ্গে বাসায় এসব নিয়ে আলাপ হলে আরমান নির্মম বাক্যে মামা আফসারউদ্দিনকে আক্রমণ করত। জোবেদা বেগম কথায় ছেলের সঙ্গে পেরে উঠত না। তখন কান্নাকাটি করে, কপালকে দোষ দিয়ে নিশ্চুপ থাকত জোবেদা বেগম। এখন আর এসব নিয়ে আলোচনা হয় না। মায়ের কষ্টের কথা ভেবে আরমান নিজেই এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়।
আলোচনা উঠত আরমান, বাবা মকবুল হোসেন, ছোট ভাই শিহাবের মধ্যে। ছোট বোন রঞ্জনা এসব বুঝত না। তবে মাকে কাঁদতে দেখে তার খারাপ লাগত। ভাইয়ার কথায় এক ধরনের কঠোর দৃঢ়তা থাকত যা রঞ্জনার ভীষণ ভালো লাগে।
হাসি পায় আরমানের। আফসারউদ্দিনকে সে চিনতে পারবে না? প্রথম দৃষ্টিতেই চিনেছে এবং ঘটনার আকস্মিকতায় আরমান অবাক চোখে দেখছে মায়ের একমাত্র বড় ভাই আফসার মামা দরজার সামনে হাতে চামড়ার ব্যাগ নিয়ে দাঁড়ানো। থাকে মফস্বলে। পিরোজপুরে। মফস্বল শহর পিরোজপুরের মাঝখানে তার একটা মুদি দোকান আছে এবং সফল দোকানদার। বেচাকেনা নাকি ভালোই হয়। সেখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থানও বেশ ভালো মামার।
আফসার মামার চিঠি পেয়েই আরমান বলেছিল আফসার সাহেব বাসায় আসলে আমি এ বাসায় থাকব না।
বাসায় থাকবি না কেন? জোবেদা বেগম জিজ্ঞেস করে।
যা জানো, সে বিষয়ে প্রশ্ন কর কেন?
কোথায় থাকবি?
মা ভীষণ কষ্ট পাবে জেনেও জবাবে বলেছে—তোমার ভাইয়ের ওই মুখ দেখার ইচ্ছে একদম আমার নেই। দেখলে আরও খারাপ লাগবে। হয়তো ঝগড়া-মারামারি হতে পারে। আর থাকব কোথায়? এ কোনো কথা হলো? ঢাকা অনেক বড় শহর। তা ছাড়া আমার পরিচয় তো কম নয়। তোমার ভাই যে কয়দিন থাকবে, সে কয়দিন হলে কাটিয়ে দেব।
জোবেদা বেগম ভাবেনি—আরমান সত্যিই আফসার সাহেব বাসায় আসার সঙ্গে সঙ্গে বাসা ছেড়ে চলে যাবে। আজ তিনদিন, বাসায় নেই আরমান। প্রথম দিন ভেবেছিল, আরমান রাতে বাসায় আসবে। কিন্তু না—সে আসেনি। মকবুল হোসেনের অফিসে গিয়ে দেখা করেছে। বাবার কাছে মায়ের জন্যে একটা চিঠি পাঠিয়েছে।
মা, আমার জন্য কোনো চিন্তা করো না। হলে ভালোই আছি। তোমার একমাত্র বড় ভাইকে ভালোভাবে যত্ন করো। ‘তিনি’ চলে গেলে আমি বাসায় আসব।
—আরমান।
চিঠিটা লিখেছে ভালোই। কিন্তু জোবেদা বেগম দুটো কারণে ক্ষিপ্ত, ব্যথিত এবং অপমানিত। প্রথম কারণ, এমন কোনো ভাগ্নে আছে, একমাত্র বড় মামা বাসায় আসলে ভাগ্নে মামার মুখ দেখবে না বলে বাসা থেকে চলে যায়? মাকে চিঠি লিখে জানায় আবার—মামা ভদ্রলোক যতক্ষণ কিংবা যতদিন বাসায় থাকবে, সে বাসায় আসবে না। মামার মুখোমুখি হতে হবে, কথা বলতে হবে—তাই বন্ধুদের সঙ্গে ইউনিভার্সিটির হলে থাকবে? জোবেদা বেগম জানে—আরমান সত্যিই আসবে না, যতদিন তার বড় ভাই থাকবে বাসায়। মায়ের পেটের বড় ভাইকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে? কেমন করে সম্ভব? আফসার শহর খুব বেশি পছন্দ করে না। প্রায় দশ বছর পর ঢাকায় এসেছে। পেটে ব্যথা তার। ভীষণ যন্ত্রণা। পিরোজপুরের সব ডাক্তার দেখানো শেষ। কিন্তু ব্যথা কমে না। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার তাকে ঢাকা এসে ভালো ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নিতে বলেছে। তাই ঢাকা আসা। নইলে গাড়ি-ঘোড়া, বাস-ট্রাক আর মানুষের এই গিজগিজে পরিবেশে সে আসত না। বয়সও কম হয়নি তার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা তার স্পষ্ট মনে আছে। ছোটবেলার জোবেদা বেগমকে সে-ই কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে, এখন কেমন করে বলে ভাইজান, আপনি আমার বাসা থেকে অন্য কোথাও গিয়ে থাকেন। শাঁখের করাতে কাটছে তার কলিজা, আত্মা, হূিপণ্ড। এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততা নিয়ে আছে মকবুল হোসেন। আরমান বাসায় আসছে না—এ বিষয়ে তার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে রীতিমতো অফিস করে। খায়। সংসারের যাবতীয় কাজ করে অথচ আরমান সম্পর্কে তার কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই।
আরমানকে বাসায় আসতে বলো—বলে জোবেদা বেগম।
আমি ওকে কোথায় পাব?
তোমার সঙ্গে ওর দেখা হয় না?
সেই কবে, চার-পাঁচদিন আগে অফিসে এসেছিল।
আরমান ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। সচেতন। সে যা কিছু করছে, তাতে বাবা হিসেবে মকবুলের কিছুই করার নেই। মকবুল নিজেও আরমানের বিশ্বাস ও চেতনাকে লালন করে। এতখানি নয় হয়তো। আজকালকার ছেলেরা অনেক বেশি শার্প। তীক্ষ। অন্যায়কে সরাসরি অন্যায় বলার ক্ষমতা রাখে। যা সম্মান করে মকবুল।
জোবেদা বেগম স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। অনড় পাথর। জীবনের একি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে সে? কোনদিকে যাবে সে? জীবনের দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর যার সঙ্গে সংসারযাপন করে এল, আজ সেও জীবনের বৈপরীত্যে এসে দাঁড়াল? কষ্ট-যন্ত্রণায় নাড়ি ছিঁড়ে যে সন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে এল সেও কি না মাকে অপমান করতে ছাড়ল না?
কী ব্যাপার? এখানে দাঁড়িয়ে কেন? জোবেদা বেগমের পেছনে আফসার এসে দাঁড়ায়।
কিছু না ভাইজান। আঁচলে চোখ মোছে জোবেদা বেগম।
কাঁদছিস কেন?
চোখে ময়লা গেছে—লুকাতে চায় সে।
এক গোলক ধাঁধায় পড়েছে আফসারউদ্দিন। ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। যতদূর সে জানে, তার বোন জোবেদা বেগম দাম্পত্যজীবনে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করে। সুখের
সংসার। ঢাকায় নিজেদের বাড়ি। ছেলেমেয়েরা সবাই শান্ত। মকবুল ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠিত। নিজেদের গাড়ি। সবকিছু মিলিয়ে ছিমছাম জীবন। কিন্তু আফসার সাহেবের মনে এখন সন্দেহ দেখা দিয়েছে। জোবেদা বেগমের মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ দেখে সে। রঞ্জনা তার কাছে একদম ঘেঁষে না। ডাকলেও কাছে আসে না—দূরে দূরে থাকে। তাকে দেখলেই রঞ্জনা দৌড়ে অন্য কোথাও সরে যায়। শিহাবও তাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে। সকালে নাস্তার টেবিলে আফসার সাহেব জিজ্ঞেস করল, জোবেদা?
বলুন ভাইজান।
ব্যাপারটা কী?
কোন ব্যাপার?
আরমান কোথায়? যেদিন এলাম সেদিনই কেবল সকালে একটু দেখলাম। তারপর আর না। এমনকি বাসায়ও আসে না।
মকবুল জবাব দেয়—ওর কথা বলবেন না ভাইজান। আরমান একটু খেয়ালি মানুষ। তা ছাড়া ছাত্র-রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ঢাকার বাইরে গেছে ও।
কবে গেল?
যেদিন আপনি এসেছেন—সেদিনই সকালে।
আমাকে একটু বলেও যাবে না? ওকে সেই দশ বছর আগে দেখেছি। তোমরা মাঝেমধ্যে পিরোজপুর গেলেও আরমান যায়নি। সেদিন সকালে আরমানকে দেখে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। ছোটবেলায় কতবার ও আমার পিঠে চড়েছে, আমাকে ঘোড়া বানিয়ে।
চুপচাপ খাচ্ছে সবাই। অস্বস্তিকর নীরবতা টেবিলে।
আফসারকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় মকবুল। চিকিত্সাটা ঠিকঠাকমতো হচ্ছে। ডাক্তারের কাছ থেকে আসতে আসতে আফসার বলে—ভাবছিলাম আরমানকে সাথে নিয়ে ঢাকা শহরটা একটু ঘুরব। সেই দশ বছর আগে ঢাকায় এসেছিলাম। এতদিনে ঢাকার শরীরে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
আরমানকে পাবেন বলে মনে হয় না। কবে আসবে তার ঠিক নেই। তার চেয়ে শিহাব আর রঞ্জনাকে নিয়ে যান। ওরা ঢাকার সবকিছু ভালোভাবেই চেনে।
ঠিক আছে—আফসার সাহেব সায় দেয়।
মকবুল হোসেনের মিথ্যা কথায় জোবেদা বেগম খুশি হয়েছে। অন্তত আরমান বাসায় না থাকার একটা বিশ্বাসযোগ্য কারণ দেখানো গেছে।
যতদিন যাচ্ছে জোবেদা বেগমের মুখ পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠছে। কথা বলে অনেক কম। মনে হয় লুকিয়ে লুকিয়ে কান্নাকাটি করে। জিজ্ঞেস করতেও পারে না মনের দ্বিধার জন্য। জানতে চাইলে আবার কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কে জানে!
আফসার সাহেবের মনে যেটা মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে—বাসায় আরমানের অনুপস্থিতি। সে যেদিন থেকে বাসায় এসেছে ঠিক সেদিন থেকে আরমান উধাও। বাসায় আসে না। কোথায় আছে তাও কেউ তাকে বলছে না। মকবুল হোসেন সেদিন খাবারের টেবিলে যা বলেছে, তা সে বিশ্বাস করেনি। সেদিন কথায় কথায় শিহাব বলেছিল—ঢাকার কোনো এক এলাকা থেকে বাসায় ফোন করেছিল।
ঢাকাতেই আছে আরমান? প্রশ্ন করে আফসারউদ্দিন। তাহলে বাসায় আসছে না কেন?
জানি না।
শিহাব দ্রুত চলে গেছে। বুঝতে পারছে আফসারউদ্দিন—সত্য হলেও বলতে চায়নি শিহাব। হঠাত্ অসতর্ক মুহূর্তে বলে বিব্রত এখন। পুরো বিষয় বিশ্লেষণ করে সে কোনোকিছুই আবিষ্কার করতে পারে না। এক ভয়ংকর অস্বস্তির কালো ফেনায় ভাসছে আফসারউদ্দিন।
পনের দিন হয়ে গেল ঢাকায় এসেছে আফসারউদ্দিন। কাল চলে যাবে সে। ডাক্তার দেখানো শেষ। মোটামুটি অবস্থা ভালো। এই কয়দিনে হাঁপিয়ে উঠেছে। একদম থাকতে ইচ্ছে করে না। সবকিছু বিস্বাদ লাগে। প্রিয়তম মানুষদের তিক্ত পরিবর্তন তাকে বিস্মিত করেছে। সে তার কোনো দোষ খুঁজে পাচ্ছে না। তার বোন, বোনজামাই, ভাগ্নে—এদের কাছে কী অপরাধ করেছে সে? জামা-কাপড় ব্যাগে ভরে। সকালেই লঞ্চ। বাড়ির জন্য চিন্তিত। গ্রামে অনেক কাজ পড়ে আছে। তার দীর্ঘ জীবনে পনেরো দিন বাড়ি ছেড়ে থাকেনি।
সকালে ঘুম থেকে উঠেছে জোবেদা বেগম। পরোটা বানিয়েছে। মাংস রান্না করেছে। আফসারউদ্দিন পরোটা আর গরুর মাংস খেতে বেশি ভালোবাসে। আর কিছুক্ষণ পর সে চলে যাবে। জোবেদা বেগম রান্না করছে আর একা একা কাঁদছে। বয়স অনেক হয়েছে তার ভাইয়ের। যেকোনো সময়ে হঠাত্ মারা যেতে পারে। বুড়ো মানুষটার সঙ্গে আরমান এমন কঠোর কঠিন ব্যবহার না করলেও পারত। মানুষ ভুল করে না? তার ভাইও না হয় ভুল করেছে। বুকটার মধ্যে জোবেদা বেগমের কান্নার হু-হু বাতাস। একটা মাত্র জীবন অথচ কত তার রূপ। ভাই-সন্তান, স্বামী-সংসার এক একটা মানুষের মধ্যে কত রকমের যে দেয়াল গড়ে ওঠে।
নাস্তার টেবিলে মুখোমুখি বসেছে আফসারউদ্দিন, মকবুল হোসেন, শিহাব আর রঞ্জনা। মাংস রান্নাটা খুব ভালো হয়েছে—পরোটার সঙ্গে মাংসের টুকরো মুখে দিতে দিতে আফসারউদ্দিন স্মৃতি রোমন্থনে চলে যায়—জোবেদা, তোর মনে আছে, মা কী চমত্কার করে মাংস রান্না করতেন, সারা বাড়ি মাংসের গন্ধে ভরে যেত।
ভাইজান, আমার রান্না ভালো হয়নি?
হাসে আফসার—কে বলল ভালো হয়নি। ভালো হয়েছে বলেই তো মায়ের কথা মনে পড়ল।
বাড়ি গিয়েই আমাকে চিঠি লিখবেন ভাইজান—জোবেদা বেগম বলে। পথে কোনো অসুবিধা হলো কি না, বাড়িতে ভালোমতো পৌঁছলেন কি না—এসব ভেবে দারুণ দুশ্চিন্তায় থাকব।
তুইও উত্তর লিখিস। মরে গেলে আর কেউ বলবে না। আরমানকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। ও কি আমার সঙ্গে রাগ করেছে?
আপনি যতদিন, যতক্ষণ বাসায় থাকবেন, ভাইয়া ততদিন বাসায় আসবে না—রঞ্জনা বলে আফসারউদ্দিনকে।
সকালে নাস্তার টেবিলে একটা তাজা বোমা বিস্ফোরিত হলো। আফসার তাকায় রঞ্জনার দিকে।
কেন? আফসারউদ্দিন জিজ্ঞেস করে রঞ্জনাকে। আমি কী করলাম?
মকবুল, শিহাব মুখে পরোটা মাংস নিয়ে বসে আছে। চিবুতে ভয় পাচ্ছে। শিহাব খাবার রেখে ওঠার চেষ্টা করছে। জোবেদা বেগম বোবা দৃষ্টিতে রঞ্জনার দিকে তাকিয়ে আছে।
ভাইয়া ফোনে আমাকে বলেছে—আপনি রাজাকারতো। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আপনি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। অনেক বাাঙালি আপনি হত্যা করতে পাকিস্তানি সৈন্যদের সহায়তা করেছেন। এখনো তাদের দল করছেন। এই কারণে ভাইয়া আপনার মুখ দেখতে চায় না।
ফ্যাল ফ্যাল করে আফসারউদ্দিন তাকিয়ে থাকে রঞ্জনার দিকে। তার মনে হচ্ছে, চোখে মুখে অসংখ্য তীর এসে বিদ্ধ হচ্ছে। সে রক্তের উষ্ণীষে ভেসে যাচ্ছে। আরমান এসব কারণে তার মুখ দেখতে চায় না! কথা বলতে চায় না? তাই বাড়ি থেকে চলে গেছে? তার মুখ দেখতে কি খুব কুিসত? যে গরুর মাংস সে খাচ্ছে—সেই গরুর মুখের চেয়েও কি তার মুখ খারাপ? নাকি অন্য কোনো জন্তু-জানোয়ারের মুখের মতো তার মুখ কুিসত? কদাকার? কেমন সে মুখ? হায়েনা? শুয়োর নাকি খেঁকশিয়ালের গড়নে তার মুখ?
\
