পাশের বাসার পিচ্চিটি আলু খাচ্ছে। ছোট্ট একফালি বারান্দা, কিচেন-সংলগ্ল। কিছুক্ষণ মাথা নুইয়ে আলুর খোসা ছড়াচ্ছিল। বড় এক গামলাভরতি আলু। ওই বাড়িতে কি আলু-উত্সব? লিজিং কোম্পানির প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমদাদুল হকের মনে প্রশ্ন জাগে। পুরো অফিসের অন্ধি-সন্ধির খবর তার নখরদর্পণে। পান থেকে চুন খসলে তিনি কেবল ভ্রুু কুঁচকান না, কার্য-কারণ খুঁজে বের করেন। এই অভ্যাসটি তিনি সর্বদা সঙ্গে নিয়ে বেড়ান।
পিচ্চিটার সঙ্গে চোখাচোখি হয়। প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও তেরছা করে হাসে। সতর্ক দৃষ্টিতে ঘরের ভেতর তাকায়। তারপরও দাঁত কেলিয়ে নিম্নশব্দে হাসে। আর টপাটপ আলু খেয়ে চলে। ফাঁকে কিচেন থেকে এক চিমটে লবণ নিয়ে আসে। লবণ দিয়ে আলু খাওয়া ভারি মজা। এমদাদুল ইঙ্গিতে হাততালি দিয়ে উত্সাহ জোগায়। পিচ্চিটা গপাগপ আলু খায়।
সজনে গাছটি বাতাসে দুলছিল। একইসঙ্গে গাছের পাতা ও সজনে ডাঁটা। দক্ষিণা নরম বাতাস শরীরে আরাম লেপে দিচ্ছে। শহরে এ রকম খোলা জায়গা কমই থাকে। বেশ কিছু প্লট জুড়ে টিনশেডের ঘর, আনাচে-কানাচে গাছ-গাছালি। সেখানে দিনভর প্রকৃতির রং বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাখির আনাগোনার বদল হয়। কত রকম পাখি যে শহরে আছে! খুব প্রত্যুষে টুনটুনির টুনটুন, মোলায়েম রোদে চড়ুই পাখির ঝাঁক, মধ্যাহ্নের আগমুহূর্তে কয়েকটি ময়নাপাখি, কড়া রোদে কাকের কা কা—সজনে, জাম্বুরা আর পেয়ারা গাছের ডালে। ষোলতলা দালানের ছায়ায় পড়ে থাকা এমদাদুল হকের ভাড়াটে ফ্ল্যাটে দক্ষিণা বায়ু, সবুজের সমারোহ, কিলবিলে আলো অপার প্রশান্তি দিয়ে চলছে। বাড়িঅলির তীব্র খকরামি সত্ত্বেও বাড়িটি তার ভালোই লাগছে। কলিং বেল বেজে ওঠে। যা ভাবছিল, ঝাঁজালো মহিলা।
—তোমরা কি কিছু দেহ না?
এমদাদুল ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। বুঝতে পারে না, চোখ থাকিতে কেন সে অন্ধ।
—তোমরা কি দেহ না, পাশের বাড়ির পোলাটা চুরি কইরা আলু খায়?
ইমদাদুল পাশের ওই ফ্ল্যাটে চোখ বোলায়। পিচ্চিটি অতি মনোযোগের সাথে আলুর খোসা ছাড়াচ্ছে। দুনিয়াদারি বিষয়ে যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বাড়িঅলি সেদিকে রুদ্ররোষে তাকিয়ে থাকে। বিড়বিড় করে।
—তোমরা কি কিছু দেহ না?
ঝড়ো হাওয়া তুলে মহিলা চলে যায়। গরমের ভাপ নেমে আসে। ভয়ে যেন বায়ুর বাঁকবদল ঘটেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। পিচ্চিটি আবার আলু খাওয়া শুরু করে।
ওই দালানের প্রতিটি বেডরুমের বারান্দায় থরে থরে কাপড় শুকানো হচ্ছে। রোদে টাঙানো কাপড় দেখে বাড়ির লোকজন নিয়ে একটি ধারণা করা যায়। এই কাজটি এমদাদুল হক শুক্রবার দুপুরে মনোযোগের সাথে করে থাকে। বলা যায়, এটা তার সখ; কিংবা খেলা। আর শুক্রবারে মোটামুটি সকলে বাসায় থাকে। দুপুরের মধ্যে গোসল সম্পন্ন করে। ভিজে কাপড় বারান্দায় ঝুলতে থাকে। ঝুলন্ত কাপড় দেখে অনেক কিছুই অনুমান করা যায়। যেমন বাড়িতে কজন থাকে, তাদের বয়স, নারী-পুরুষ-শিশুর সংখ্যা এমনকি তাদের রুচিবোধ ও অর্থ-বিত্ত। কিন্তু ষোলতলার ওই দালানের পাঁচতলার ফ্ল্যাটের মানুষজনের গোঁমর অতি জটিল। হ্যাঁ, পিচ্চি আছে বটে, দিনে অধিকাংশ সময়ে কিচেনের লাগোয়া বারান্দায় বসে এটা-ওটা কাজ করে—পেঁয়াজ-রসুন কাটে, মাছ কোটে, তরমুজ ফালি করে—মৌসুমের সঙ্গে বদলে যায় কাজের ধরন। কাজের মাঝে ভেতর থেকে কেউ ডাক পাড়ে, পিচ্চিটি ত্বরিত সেদিকে চলে যায়। কখনো কোমর দুলিয়ে তিড়িংবিড়িং করে আসে, কিছুক্ষণ উদ্দাম নৃত্য করে, সঙ্গে গানও। গানের শব্দ কানে আসে না, তবে নাচের ধরন দেখে বোঝা যায়—আই অ্যাম অ্যা ডিসকো ড্যানসার, কিংবা নাচো গো কমলা কোমর নাচাইয়া... এই রকম কিছু। ওই ফ্ল্যাটে একটি মোটা-খাটো মধ্যবয়সী লোকের দেখা মেলে কখনোসখনো। হঠাত্ করে আসে, হঠাত্ করে নাই। ওই দালান থেকে কিছু খবিস লোক নিচে ময়লা ছুড়ে ফেলে, মোটা লোকটি ওই দলের। গেরস্থালি ময়লার সঙ্গে লোকটি ব্যক্তিগত গোপন ময়লায়ও নিচে ফেলে। অথচ ওই ফ্ল্যাটে কোনো নারীর কোনো দেখা মেলেনি। কদাচিত্ স্লিপিং গাউন, সেমিজ, ঘাগরা, পেটিকোট, ব্রা ঝুলতে দেখা গেলেও সেগুলো নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, ও বাড়িতে কোনো নারী আছে কি না। কারণ একই ধরনের মেয়েলি পোশাক পুনরায় দৃৃষ্টিগোচর হয় না, কিংবা হলেও পোশাকে বয়স ও রুচির হেরফের থাকেই।
কড়া রোদে গাছের পাতা নেতিয়ে পড়েছে। কাক কা কা করছে। একটি বিড়াল ছায়াযুক্ত এক ডালে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, নিচে শুয়ে থাকা কুকুরটি সেদিকে তাকিয়ে আছে। আম গাছে কাচা আম ঝুলছে, দুলছে। আমের আকৃতি ও সৌন্দর্য অন্য এক রূপক তুলে ধরে। এমদাদুল হাঁক ছাড়ে—জুলিয়া খাতুন। পরপর তিনবার। আঁচলে হাত মুছতে মুছতে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, মোলায়েম কণ্ঠে শুধায়—কী হয়েছে, চিত্কার কেন?
—কী সৌন্দর্য! জুলিয়া খাতুন সোয়ামির দ্যুতিময় চোখের নিশানা ধরে ঝুলন্ত আমের সন্ধান পায়। ছোট হিমসাগর গাছটিতে কাচা আম। একটি টুনটুনির বাসা ঝুলছে, মুখ বের করে রেখেছে টোনাটুনি। সেদিকে ঠায় তাকিয়ে থাকে, বলে—তোমার কি আমের ভর্তা খেতে ইচ্ছে করছে, গরমে আমের ভর্তার মজাই আলাদা।
এমদাদুল ভ্রু কুঁচকায়। মনে মনে, আমি কই কী আমার সারিন্দা ভাবে কী। একটু প্রতিক্রিয়া দেখানোর ইচ্ছে জাগলেও বউয়ের চোখের মুগ্ধতা লক্ষ করে মিইয়ে আসে। বলে, আলু খেতে ইচ্ছে করছে। জুলিয়া খাতুন টোনাটুনির থেকে চোখ না ফিরিয়েই উত্তর করে—ছিঃ, দুপুরে কি আলু খায়, আলু খায় সকালে কিংবা বিকালে। আর যা গরম! এখন খায় কাঁচা আম ভর্তা।
এমদাদুল অতীত হাতড়িয়ে বেড়ায়, ভাবে, ঠিকই তো, দুপুরে সকলে আম ভর্তাই খায়। আবিষ্কার করে দুই পদের আম ভর্তা তার প্রিয়। পদ এক—আমের পাতলা ফালি, পরিমাণমতো লবণ ও পোড়া শুকনো মরিচ মিলিয়ে মাখতে হয়, পদ দুই—কুচি কুচি আমের সঙ্গে পরিমাণমতো কাঁচামরিচ, চিনি ও দুধ মিলিয়ে মাখতে হয়। সে প্রথম পদটিই আজকের জন্য পছন্দ করল, আর বলল, মরিচের অংশ পরিমাণের চেয়ে বেশি হলেও সমস্যা নেই। তৃপ্তির একটি ভাব নিয়ে চারপাশটায় চোখ বোলায়, পিচ্চিটার আলু খাওয়ায় কোনো বিরাম নেই। ইচ্ছে করে চট করে রাম থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। বিড়বিড় করে—খবিস লোকটার সঙ্গে থাইক্যা খাসলত খবিস হইয়া গেছে।
আম ভর্তা খেতে খেতে তার সেইসব আলু-খাওয়া দিনের কথা মনে পড়ে। তখন নিকুঞ্জে ঠাঁই পেতেছিল। বড় বড় দালানের তলে ছোট্ট এক রুমের টিনশেড ঘরে থাকত দুই বেকার বন্ধু। অন্ধকার ও স্যাঁতসেতে ঘর। ওপর থেকে অবিরত ময়লা-আবর্জনা, পানির ছিটা নেমে আসত। বীভত্স গন্ধ আর মাছি-মশা লেগেই থাকত। একটু বৃষ্টি হলেই যেন বর্ষাকাল। ইউনিভার্সিটির স্বপ্ন-দ্যুতিময় দিনগুলো মনে হতো অবাস্তব, কখনো ঘটেনি তেমন কিছু। অথচ স্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়াত, স্বপ্ন ধরতে কত দৌঁড়াল। সবই মিছা। মায়া মরীচিকা। বিস্তৃত পরিসর ছোট হতে হতে কঙ্করের বৃত্তে আটকে গেল। সব কিছু খাটো হতে লাগল। স্বপ্ন, মন, চিন্তা—সবই। সকালে ঘুম থেকে উঠে সবুজ সংঘ ক্লাবের দেয়ালে সাঁটানো দৈনিক পত্রিকা আদ্যোপান্ত পড়ে যাওয়া, ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে বিচিত্র গাড়ির আসা-যাওয়া দেখা, হাইওয়ে ধরে আনমনে হাঁটা—এমনি করে দুপুর পর্যন্ত পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতো। পেট চোঁ চোঁ করত। গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়ে আর কতক্ষণ থাকা যায়। বাসায় এসে সটান বিছানায় শুয়ে চালার দিকে তাকিয়ে থাকত। উত্তপ্ত চালা থেকে যেন গড়িয়ে পড়ত তপ্ত সিসাগলা।
চোখ বুঁজে নিজেকে ছেড়ে দিত, যেন অকূল দরিয়ায় মাঝিহীন এক নৌকা, যেদিক খুশি সেদিক যাক। এভাবে ক্ষিধে মরত বটে তবে দেহ ভেঙে পড়ত। জয়নাল টানা ঘুমিয়ে বারোটা বাজিয়ে বের হতো। পাশেই ছিল পাতানো বোনের বাড়ি। বাজার-সওদা করে দিত, ভাগনেদের আদর করত—ঘোড়া হতো, হাতি হতো—এই করে খাওয়াটা হতো। আগে একসঙ্গে কাটাত অধিকাংশ সময়। মারদাঙ্গা হাসি-ঠাট্টায় কেটে যেত বেলা। এখন যেন অচেনা মানুষ। বিচ্ছিন্ন দুয়েকটা কথা হয় বটে, তবে নিস্পৃহতা চেপে বসেছে। অস্বস্তি থেকে বিরক্তি এসেছে। নিদারুণ সেই দিনগুলোতে অপরাহ্নে ক্ষিধে যাঁতা দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে দরজাপথে বাইরে তাকিয়ে ছিল। এক দঙ্গল পাতিহাঁস দেহ এলিয়ে-বেলিয়ে ঠোঁটের ডগায় ভেজা মাটি ঠুকছিল আর হইহুল্লোড় করছিল। হঠাত্ হাঁসগুলো সশব্দে দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ল, দেখল কিছু আলু গড়িয়ে দরজার সামনে পড়ে রইল। আলু কয়টি হাতে নিয়ে ক্ষিধেটা আরও চাগিয়ে উঠল। স্টোভে তেল নেই যে সেদ্ধ করে খাবে। অতঃপর চাকরি গাইড, এমএলএম সফলতার নির্দেশিকাসমূহে আগুন দিয়ে আলু পোড়ানো হলো। আহ! সেকি সোয়াদ। আর নতুন করে বেঁচে ওঠা। বাবা, তোমার চোখে পানি কেন—অমির কথায় সম্বিত ফিরে পায়। হাতের তালুতে চোখ মুছে বলে—মরিচ পরিমাণের চেয়ে অধিক হয়েছে। মমি মাথা ঘুরিয়ে হঠাত্ থামে, বলে—না, না। তোমার আলুর কথা মনে পড়েছে।
দরজায় ঠকঠক। শব্দ বলছে বাড়িঅলি এসেছে। বুড়ি কখনো কলিং বেল টেপে না। আঙুলের কড়েতে কাঠের দরজায় ধাতব শব্দ তোলে। জমিলা খাতুন দরজা খুলে দিতেই হাতে কিছু কুমড়ো শাক তুলে দেয়। বলে—নিজস্ব গাছের। হাইব্রিড মুক্ত। দিয়েই চলে যায়। মিনিট দুই পরে আবার ঠকঠক। বুড়ির ঝাঁজালো কণ্ঠ—যেতে না যেতে দরজা বন্ধ করা কেন? আদব-কায়দা শিখলা না।
ঘরে ঢুকে বাড়িঅলি বাথরুমে প্রবেশ করে। বের হয়ে বলে, তোমরা বাথরুম এমন ঝকঝকে রাখো কেমনে? ওরা পারে না ক্যান? সকলরে শিখাইয়া দিতে পারো না। স্বার্থপরের মতো কেবল নিজেরটাই দ্যাখো।
কিচেন, ড্রয়িং ও বেডরুম পরিদর্শন শেষে বারান্দায় এসে রীতিমতো চিত্কার করে ওঠে। অমি ও মমি ভয় পেয়ে বাবার কোল ঘেঁষে বসে। ওইটা কী? টবের দিকে আঙুল। এমদাদুল আমতা আমতা করে বলে—বৃক্ষ, আলু বৃক্ষ, মিষ্টি আলু। বুড়ি গলাটা আরও বাড়িয়ে দেয়, মিষ্টি আলু লাগাও ক্যান, গোলালু লাগাইতে পারো না। এমদাদুল ঢোক গেলে—গোলালু লাগানোর ব্যবস্থা এইখানে নাই। এবার বুড়ির আর্তচিত্কার—কী বললা, আমার বাড়িরে অপবাদ দিবা না, কত বড় বাড়ি আর গোলালু লাগাইতে পার না, হেডম নাই হেইডা কও। এমদাদুল কিছু বলে না, কানি চোখে দেখে পিচ্চিটি আলুর খোসা ছাড়াচ্ছে। বুড়ি গলা কিছুটা নামিয়ে বলে, তোমরা আম ভর্তা খাও কেন? আলু খাইতে পারো না। বন্ধের দিনে রসাইয়া রসাইয়া আলু খাইবা। তখন জুলিয়া খাতুন এক প্লেট আম ভর্তা এনে বাড়িঅলির হাতে তুলে দেয়। কয়েক পলক প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলে—একটু বসতে দিতে হয়, সেই ভদ্রতা কি...। কথা শেষ হওয়ার আগেই জুলিয়া খাতুন মোড়া পেতে দেয়। আয়েস করে তিনি আম ভর্তা মুখে দেন। কিছুটা খেয়ে ভেজা গলায় বলেন, তোমরা দুধ দিয়া আম ভর্তা খাইলা, আমারে দিলা দুধ ছাড়া। এটা কিন্তু সঠিক হয় নাই।
একটু দার্শনিক চালে এমদাদুল বলতে চেয়েছিল—সঠিক-বেঠিক সব কিছু একাকার হয়ে গেছে। কিছুই বলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতঃপর মৃদু হাসল, লঘু পরিহাসমূলক। বাড়িঅলির আম ভর্তা খাওয়া দেখতে দেখতে তার আলুময় সেই দিনগুলোর কথা মনে এল। আলু দামে সস্তা, সেদ্ধ করলেই লবণ দিয়ে খাওয়া যায়, আলু সবখানে পাওয়া যায়—তাই আলু খাওয়াই সাব্যস্ত হলো সে-সকল নিদারুণ দিনগুলোতে। পাল্লা পাঁচ টাকা। ওই টাকাও সঙ্গে থাকত না। এক কেজি, দুই কেজি করে নিয়ে আসত। বিক্রেতারা পাঁচ কেজির কম বেচতে চাইত না। তখন ইনিয়েবিনিয়ে বলত—সিঙ্গেল মানুষ, আলু খাইতে শখ অইছে, বেশি নিলে নষ্ট হইব। ঘুরেফিরে একই কথা বারবার। পরে বিক্রেতারা তাকে দেখলেই বলত—ভাইজান তো সিঙ্গেল, এক কেজি না কি দুই কেজি। এমদাদুল পরিহাস বুঝত, রা করত না। লাজুক হাসত।
কখনো পয়সা না থাকলে উপুড় হয়ে শুয়ে দরজার পথে চেয়ে থাকত। না, আর কখনো ওপর থেকে আলু বর্ষিত হয়নি। রাতে স্টোভে আলু বসিয়ে একটু পরপর কাঠিতে খুঁচিয়ে দেখত, নরম হয়েছে কি না। সেদ্ধ হলে নামিয়ে ডেকচিটা সামনে রেখে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকত। খিদের সঙ্গে দুষু্বমি করত। খিদেটা মুচড়িয়ে মুচড়িয়ে প্রতিবাদ করত। আলুর খোসা ছুলে লবণ দিয়ে মুখে পুরে তর সইত না। দাঁতগুলো কিড়মিড় করে সচল হতো, গলায় আটকে যেত। একটু সয়ে এলে আস্তে আস্তে আয়েস করে খেত। জোছনা রাতে অধিক মজা হতো। লাইট অফ করে দরজার সামনে বসত। আলু-লবণের সঙ্গে একটু জোছনা মিশিয়ে নিত। মজা আরও বেড়ে যেত। কিছু সেদ্ধ আলু রেখে দিত সকালের জন্য। রাতে আর সকালে আলু, এই নিয়ে দিনের পর দিন। সেসব দিনের আলু-উত্সবের কথা ছুটির দিনে মনে আসে। মন উদাস হয়। ছেলেমেয়ে ও বউকে সামনে বসিয়ে বারবার একই গল্প করে। এই গল্প পুরোনো হয় না।
ওই পিচ্চিকালে, ক্ষেতের আলু চুরি করে খাওয়ার দিনগুলোও পুরোনো হয় না। হল্যান্ড থেকে আসত বাক্স ভরতি বীজ আলু। নানাবাড়ির উঠোনজুড়ে মেয়েরা বসত গোলালু বীজ কাটতে। আলুর শরীরভরা চোখ। চোখ থেকে বেরিয়ে আসত অঙ্কুর। সেটি কেটেই রুয়ে দিতে হয়। তখন দেশটি আলুর দেশে পরিণত হয়নি, গোলগাল আলুটি আসত সাত-সমুদ্দুর পেরিয়ে। সকলে অবাক হয়ে দেখত কীভাবে আল বেঁধে আলু আবাদ হয়। আলু ওঠানোর সময়টি ছিল উত্সবমুখর। কেউ একজন লাঙল দিয়ে আল ভেঙে দিয়ে যেত, আর তারা আলু তুলে ওড়ায় ভরত। উঠোনে আলুর স্তূপ জমত। ঘরের চৌকির তলায় বিছানো কিংবা চালার সঙ্গে বস্তায় ঝুলন্ত থাকত। পুরো গ্রামের বাতাসে নতুন আলুর গন্ধ। সকাল বেলা ইয়া বড় ডেকচি আলু সেদ্ধ হতো। সকলে গোল হয়ে উঠোনে বসে আলু খেত। খাওয়ার মাঝে আস্তে আস্তে গল্প-গুজব জমে উঠত। আলু বড় মজা, আলু বড় আনন্দময়। তার পরও আলু নিয়ে কত আদিখ্যেতা, সকলে আলুর দোষ খোঁজে, গুণ খোঁজে না।
বাড়ির পাশেই কাঁচাবাজার। এমদাদুল অমি-মমিকে নিয়ে বের হয়। ঘুরে ঘুরে আলু দেখে। লাল আলু, লম্বা আলু, জামআলু, নরমাল আলু, পিচ্চি আলু। তারা ডাঙর ডাঙর গোলালু কেনে। হই-হুল্লোড় করে বাসায় ফেরে। এমদাদুল হেঁড়ে গলায় চিত্কার করে—জমিলা খাতুন, প্রিয় জমিলা খাতুন। জমিলা খাতুন সামনে এসে স্বামীর মুখ চেপে ধরে—ছিঃ, এত চিত্কার করছ কেন? এমদাদুল হাসে। বলে, সন্ধ্যায় আলু-উত্সব হবে।
ওই, বাড়িত কী ডাকাত পড়ছে, না কি বাজার বইছে। বাড়িঅলি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। জমিলা খাতুন তাকে আলুবিষয়ক পরিকল্পনার কথা বলে। তিনি বোঝেন, গলা নামিয়ে বলেন—আলু-উত্সব করবা, ভালা কথা, তবে তেজ দেখাও ক্যান? অতঃপর তিনি কিচেনে ঢোকেন। বলেন, রান্নাঘর এত তকতকে থাকে কেমনে, ওরা পারে না ক্যান? তোমরা শিখাইয়া দিতে পারো না? বেডরুমে ঢুকে লেপ্টি মেরে বসেন। জমিলা ফ্রিজ থেকে কাটা তরমুজ বের করে খেতে দেয়। কাঁটাচামচে তরমুজ গেঁথে দ্রুত খেয়ে চলছেন। হঠাত্ থমকে চামচটির দিকে চেয়ে বলেন, জানো আমার একটা বিদেশি কাঁটাচামচ পাইতেছি না। কয়েক ঘর ভাড়াটে নিয়াই তো আমার সংসার। কামডা কে করল? তখন ওদের অতীতস্মৃতি মনে পড়ে। যখন বাসা ভাড়ার দরদস্তুর করে, তখন বাড়িঅলি নুডুলস খাইয়েছিল। সেটিই প্রথম এবং শেষ। পরে আরেকটি তথ্য জেনেছে, এই বাড়িতে কোনো ভাড়াটেই এক বছরের অধিক থাকতে পারে না। তাদের দশ মাস চলছে। পয়মন্ত সময়। যেকোনো সময় খালাসের সময় হয়েছে। বুড়ির ভাঁজে ভাঁজে চলেও বাগ মানাতে পারছে না, বরং উটকো ঝামেলা হয়ে মাথায় চড়ে বসেছে। মাথায় বসে যখন-তখন ডুগডুগি বাজায়।
তরমুজ খাওয়া শেষ করে বাড়িঅলি উঠে দাঁড়ায়, মোলায়েম সুরে বলে—তোমাদের তরমুজ এত মিঠা ক্যান? তোমরা কি অর্ডার দিয়া তরমুজ বানাইছ। জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়, দেখে পিচ্চিটা আলুর খোসা খুলছে। বলে, কইতে পারো ওই পোলার পেট কত বড়? সারা দিন তো কেবল আলু খায়। ওই বাড়ির পেটমোটা লোকটাও আলুবাজ। এমদাদুল অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে ছিল, কিছু কথা না বললে তো চলে না, বলল—এভাবে ভাবা কি ঠিক? বাড়িঅলি রীতিমতো চেঁচিয়ে ওঠে—তুমি আলু জানো। আমার পোলা আমি বুঝি না।
বাড়িঅলি চলে যাওয়ার পরও এমদাদুল কিছুক্ষণ থমকে থাকে। জানে, বড়লোক সন্তানরা তাদের এড়িয়ে চলে। এই শহরেই থাকে কিন্তু এত কাছে! বের হবার আগে বুড়ি রোষে বলে গেল, তোমরা এত পানি নষ্ট করো ক্যান? বেশি পানি চাইলে বনশ্রী চইলা যাও? রামপুরা থাকতে হলে অল্প পানিতে চলা শিখতে হইব।
সূর্যটা পশ্চিম আকাশে অনেকটা হেলে পড়েছে। সজনে গাছ ধীরলয়ে নড়ছে। পাখিরা এ ডাল-ও ডাল, এ গাছ-ও গাছ করছে। পাশের পাঁচতলা ফ্ল্যাটের মোটা লোকটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের লালিমার দিকে তাকিয়ে আছে, ম্লান অভিব্যক্তি। কিছু পাখি বৃত্তাকারে উড়ছে। পিচ্চিটি দেয়ালে হেলান দিয়ে আলু খাচ্ছে, মোটা লোকটি দেখেও না দেখার ভান করছে।
জমিলা খাতুন ট্রেতে আলু সাজিয়ে বারান্দায় নিয়ে আসে। সবাই গোল হয়ে বসে। বিষণ্ন শেষ বেলা। প্রচণ্ড খিদে। গোলালু খেতে হলে গোল হয়ে বসতে হয়। ওরা গোল হয়ে আলু খেতে শুরু করে। একটি একটি করে আলু তুলছে, খোসা ছুলে লবণ মিশিয়ে খাচ্ছে। খাওয়ার চুকচুক শব্দ ছাড়া কোনো সাড়া নেই। তৃপ্তির ঢেকুর উঠছে কখনো। সূর্যের তেজ আগেই গেছে, এখন আলোর তেজও কমে আসছে। পরিবেশটা ঘোলাটে। দেহগুলো অস্পষ্ট হচ্ছে। অদূরের পিচ্চিটা তুমুল নৃত্য করছে, মনে হচ্ছে একটি ছায়া তোলপাড় তুলছে। নৈঃশব্দ্য নামছে, আলো-ছায়া খেলছে, পাখিরা গান করছে।
