চে গুয়েভারা

কাব্যপ্রেমী এক মহান বিপ্লবী

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:১৩
চে; এরনেস্তো; চে গুয়েভারা; এরনেস্তো চে গুয়েভারা—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, নামটি উচ্চারণের সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অনিবার্য বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। কানে বাজে তাঁর বলা শেষ কথাটি, ‘বিপ্লবের মৃত্যু নেই।’ বিপ্লব ছিল চের স্বপ্ন। এই স্বপ্নের পেছনেই ছিল তাঁর অবিরাম যাত্রা। আর এই যাত্রাকে গতিশীল রাখতে যে বিষয়গুলো চেকে উত্সাহ জুগিয়েছে সেগুলোর মধ্যে কবিতা একটি অন্যতম বিষয়। চে সারাজীবন ছিলেন একজন শতভাগ কাব্যপ্রেমী মানুষ। কবিতাকে তিনি ভাবতেন তাঁর হতাশা ও নৈরাশ্যকে মুছে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে। এ ব্যাপারে একবার চে তাঁর সহপাঠিনী তিতা ইনফানতেকে লিখেছিলেন—‘আমার কিছু সময় আছে, হারিয়ে যাওয়া সময়, ঠিক বলতে গেলে নৈরাশ্যের... যখন এমনটি হয়, সেই স্বল্পস্থায়ী সময়কে আমি সমাধান করে ফেলি এক গ্লাস মদে ও একগুচ্ছ কবিতার মাধ্যমে।’ ১৯৫৬ সালের শেষদিকে চে যখন মেক্সিকোতে গা-ঢাকা দিয়ে ছিলেন, তখন মাঝে মাঝে তাঁর স্ত্রী তাঁদের ছোট্ট মেয়ে ইলতিদাকে নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে আসতেন। তখন চে তাঁদের আবৃত্তি করে শোনাতেন আনতোনিও মাচাদোর কবিতা— ‘পাহাড় থেকে সমুদ্রে এই প্রতিজ্ঞা আমার যদি আমার কলমটা তোমার পিস্তলকে করত দামি ক্যাপ্টেনের মতো সুখী মরণ হতো আমার’ এর কিছুিদন পর চে যখন মেক্সিকোর জেলে বন্দী, তখন তিনি তাঁর বাবা-মা কে চিঠি লিখতেন। সেই চিঠির মাঝেও থাকত হিকমেত, নেরুদা কিংবা বোদলেয়ার এর কবিতার লাইন। চে যে কবিতার একজন নিবিষ্ট পাঠক ছিলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাঁর সবুজ নোটবই। তিনি সেখানে তাঁর প্রিয় কবিদের প্রিয় কবিতাগুলো লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। এই নোটবইটি ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। এ প্রসঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী আলেইদা মার্চ স্মৃতিচারণ করে বলেছেন—‘পড়ে যেত সমস্ত সময়, প্রতিটি মুহূর্ত যখনই অবসর পেত, দুটি সভার মধ্যবর্তী সময়ে কিংবা এক স্থান হতে অন্য স্থানে ভ্রমনকালে।’ চের নোটবইতে যে কবিতাগুলো লিপিবদ্ধ ছিল সেগুলো হলো, পাবলো নেরুদা, নিকোলাস গিইয়েন, সেসার ভাইয়েহো, লেওন ফেলিপো প্রমুখ কবিগণের। নেরুদার দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত ছিলেন চে। নেরুদা মিশে ছিল তাঁর সত্তায়। ১৯৬১ সালে সফল বিপ্লবের পর চে যখন কিউবার শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তখন দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, নেরুদা তাঁর প্রিয় কবি এবং তাঁর প্রিয় কবিতা নেরুদার ‘স্ট্যালিনগ্রাদের প্রতি ভালোবাসার নতুন গান’— ‘লিখেছিলাম সময় এবং জল নিয়ে আবিষ্কার করেছিলাম বিষাদ এবং তাঁর পিঙ্গল বর্ণ লিখেছিলাম আকাশ আর আপেল নিয়ে এখন লিখছি স্ট্যালিনগ্রাদ সম্পর্কে’ নেরুদা ছিল চের যৌবনের কবি। ১৯৫৬ সালে মেক্সিকোয় থাকাকালীন নেরুদার ‘ক্যান্টো জেনারেল’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে চে এক সুচিন্তিত মতামতে বলেছিলেন, ‘এই সংকলনটি আমেরিকার কবিতার জগতে একটি শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম।’ কবি নিকোলাস গিইয়েন এর সাথে চের ছিল এক নিবিড় সম্পর্ক। ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে গেরিলাদের এক সমাবেশে এই কবি তাঁর একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন এবং কবিতাটি চেকে উত্সর্গ করেছিলেন। কবিতার শুরুটা ছিল এমন— ‘এ জন্য নয় যে পড়ে গিয়েছ তোমার কণ্ঠস্বর একটু নিচু। এক আগুনের ঘোড়া ঊর্ধ্বে তুলে ধরে তোমার গেরিলা ভাস্কর্য। পর্বতমালার বাতাস এবং মেঘেদের মধ্যে।’ স্প্যানিশ কবি লেওন ফেলিপোর সাথে চের পরিচয় হয়েছিল মেক্সিকোতে থাকাকালীন অবস্থায়। তিনি ছিলেন স্বেচ্ছা-নির্বাসিত কবি। পরবর্তী সময়ে এই কবির সাথে চের নিয়মিত পত্রযোগাযোগ হতো। চের প্রিয় কবিদের অনেকেই বেঁচে ছিলেন তাঁর মৃত্যুর পরও। কিন্তু তাঁদের কেউই জানতেন না তাঁদের কবিতা ছিল চের আমৃত্যু সঙ্গী। চের মৃত্যুতে তাঁকে বিদায় জানিয়ে নেরুদা লিখেছিলেন ‘এক বীরের মৃত্যুতে বিষণ্নতা’ নামক কবিতাটি—‘এই ইতিহাসে যারা বাস করতাম/ এই মৃত্যু এবং পুনরুত্থান/ আমাদের অবরুদ্ধ আশা/ যারা বেছে নিয়েছিলাম যুদ্ধ।/ যারা দেখতাম পতাকাগুলো বড় হচ্ছে/ জানতাম যারা সবচেয়ে শান্ত/ তাঁরাই আমাদের একমাত্র বীর...’ চের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে বিস্তর। তিনি শুধু সাহিত্যানুরাগীই ছিলেন না, ছিলেন সাহিত্যের একজন সৃষ্টিকর্তাও। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ডায়েরি এবং মার্কসবাদ ও বিপ্লব নিয়ে লেখা নানা বই। কিন্তু একজন কবি হিসেবে চে সারাজীবন নিজের সাথে লুকোচুরি খেলেছেন। তিনি মনে করতেন, তাঁর লেখা কবিতাগুলোর কোনো মূল্য নেই। তাই তিনি তাঁর অন্য লেখাগুলো প্রকাশ করলেও কবিতা কখনো প্রকাশ করেননি। চে তাঁর কৈশোর, যৌবন ও বিপ্লবী জীবনে সার্বক্ষণিকভাবে যেমন কবিতার সাথে বাস করেছেন তেমনি লিখেছেনও অনেক কবিতা। কিন্তু সেগুলো প্রকাশের কোনো ইচ্ছা না থাকায় খুব অল্প কবিতাই পাঠকদের জানা আছে। বিপ্লব, পৃথিবীর বিবর্তন, প্রাক-ইসপানিক যুগের নিদর্শন ইত্যাদি ছিল তাঁর কবিতার উপজীব্য। ১৯৫৫ সালে একটি কবিতায় চে লিখেছিলেন— ‘আমি একাকী মুখোমুখি অনমনীয় রাতের আর নোটের চিটচিটে ভাবটা নিশ্চিত ফেলে দিই ইউরোপ আমাকে ডাকে পুরোনো মদের কণ্ঠস্বরে সোনালি মাংসের সুরভী, জাদুঘরের দ্রষ্টব্য। নতুন দেশগুলোর সুখী বাঁশির সুরে আমি মুখোমুখি হই মার্কস এবং এঙ্গেলসের। গানের শব্দবন্ধনের অভিঘাতে।’ সেনা-প্রশিক্ষণের জন্য মেক্সিকোতে থাকাকালীন অবস্থায় চে তাঁর বিপ্লবী বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোকে উত্সর্গ করে একটি কবিতা লিখেছিলেন— ‘চলো যাই আমরা ভোরের আলোয় উজ্জ্বল পয়গম্বর যোগাযোগহীন লুকানো পথ দিয়ে যাকে এত ভালোবাস সেই সবুজ কুমিরটিকে মুক্ত করতে।’ চে কখনোই ফিদেলকে তাঁর এই কবিতাটি দেখাননি। এ থেকেই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তিনি তাঁর কবিতাকে একান্তই নিজের সম্পদ ভাবতেন। কবিতা যেমন ছিল চের সকল কর্মকাণ্ডের অনুপ্রেরণা, তেমনি তিনি কবিতার মাধ্যমে স্বীকার করেছেন বিপ্লবের প্রতি তার দায়-দায়িত্ব। কিন্তু তার ফলাফল সম্পর্কে তিনি কখনোই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই তিনি সেগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি। একটি কবিতায় তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে লিখেছেন— ‘এবং পথে যদি বাধা দেয় কোনো প্রতিবন্ধকতা চেয়ে নেব কিউবান অশ্রু মোছা আঁচল যাতে তা আচ্ছাদিত করে গেরিলা যোদ্ধার হাড় আমেরিকান ইতিহাসের পরিবর্তনশীলতায় আর কোনো কিছুই নয়।’ কবিতা ছিল চের নিজস্ব আশ্রয়। কবিতা দিয়ে তিনি মুছতেন নৈরাশ্য আর দৈনন্দিন জীবনের রুক্ষতা। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি লিখে গেছেন কবিতা। আকণ্ঠ পাঠ করেছেন নেরুদা, বোদলেয়ার, ফেলিপো আর গিইয়েন। কবিতাই ছিল চের বিপ্লবের রসদ।