কবিসুরশ্রী স্বরূপেন্দু সরকার

কবিয়ালের সৃজনবিশ্ব

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:১৪
‘হয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মা-বাবা প্রায় উপেক্ষিত শিক্ষার আর মূল্য রইল কই? কেউ মূর্খ পিতার চায় না দিতে সত্য পরিচয় দেখে মনে হয় বাবা ঠিক তালই\’ ‘বাবা ঠিক তালই’ এ রকম তীক্ষ ও কার্যকর উেপ্রক্ষা সৃষ্টির নমুনা দেখেই কবিয়াল স্বরূপেন্দু সরকারের কবিত্ব সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কবিগান যে কেবল সাময়িক বুদ্বুদ নয়, এর ঢেউও যে কালে-কালে প্রবাহিত হতে পারে, কবিয়াল রমেশ শীল কিংবা বিজয় সরকারের কবিগান ও ছুটা গানগুলো পড়ে-শুনে আমরা নিশ্চিত হতে পারি। এই ধারারই একজন সার্থক কবিয়ালের নাম স্বরূপেন্দু সরকার (১৯৩৩-২০০৯)। বিজয় সরকারের শিষ্যত্ব গ্রহণের বাসনা থাকলেও বিজয় সরকারের পরামর্শে তিনি নিশিকান্ত সরকারের শিষ্যত্বে কবিগান শেখা শুরু করেন। মাত্র ২১ দিন শিক্ষালাভের পর তিনি স্বতন্ত্র দল গঠন করে কবিগান গাইতে আসরে নামেন। তাঁর সময়ের বিখ্যাত কবিয়াল বিজয় সরকার, ছোট রাজেন্দ্রনাথ সরকার, বিনয় সরকার, দ্বিজবর সরকার, নন্দলাল সরকার, প্রিয়নাথ সরকার, সরোজ সরকার, সিদ্ধেশ্বর সরকার প্রমুখের সঙ্গে তিনি কবির লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন এবং প্রশংসা অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকার বাংলা একাডেমীর একুশের মঞ্চে কবিগানের আয়োজন করা হয়। আর এখানে তিনি ছোট রবীন্দ্রনাথ সরকারের বিপক্ষে কবিগান পরিবেশন করেন। ‘স্বৈরতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র’ লড়াইয়ে তিনি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকায় এবং ছোট রবীন্দ্রনাথ সরকার গণতন্ত্রী সরকারপ্রধানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকায় যুক্তি দিয়ে যে মানুষের প্রশংসা অর্জন করা যায়, সেদিন তিনি তা দেখিয়েছিলেন। কেবল কবিত্বের জোরেই তা সম্ভবপর হয়েছিল। কবিয়াল স্বরূপেন্দু সরকারের জন্ম বাগেরহাট জেলার চিতলমারী থানার চরবানিয়ারি গ্রামে ঠেটারচর পাড়ায়। পিতার নাম কৃষ্ণকান্ত সরকার ওরফে কেষ্ট গোঁসাই এবং মাতার নাম বিনোদিনী দেবী। স্বরূপেন্দু সরকারের পুত্র অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার জানান, কৃষ্ণকান্তের আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন বিখ্যাত মতুয়া-সংগীত রচয়িতা এবং মতুয়াভক্ত শিরোমণি প্রেমিক কবি অশ্বিনী গোঁসাই। ঠেটারচর পাড়ার স্থানীয় পাঠশালায় স্বরূপেন্দু সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯৫১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলেও মায়ের মৃত্যুর কারণে আর পরীক্ষা শেষ করা হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটলেও ব্যাপক পড়ালেখা ছিল তাঁর। ধর্ম, ইতিহাস ও দর্শনে ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। ১৯৫৯ সালের প্রথম দিকে পিরোজপুর থানার জুজখোলা গ্রামে ‘হয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মা বাবা প্রায় উপেক্ষিত’ কবিগানটি পরিবেশন করে সুনাম অর্জন করেনে। রাজেন্দ্রনাথ সরকারের বিপক্ষে কবিগান গেয়েই কবিয়াল-জীবনের শুভ সূচনা হয় স্বরূপেন্দুর। ১৯৬১ সালের কবিয়াল দ্বিজবর সরকার, ছোট রাজেন্দ্রনাথ সরকার, কালিদাস সরকার, বিনয় সরকার প্রমুখের বিপক্ষে কবিগান করার সুযোগ পান। ১৯৬৫ সালের পূর্বে কোনো এক সময়ে বাগেরহাট ডাকবাংলায় পল্লিকবি জসীমউদ্দীন স্বরূপেন্দুর ধুয়াগান পড়ে প্রশংসা করেন এবং ঢাকার পত্রিকায় প্রকাশের আশ্বাস দেন। ১৯৬৫ সালে ধুয়াগান নিয়ে ‘ভাটির নাইয়া’ নামে এবং ওড়াকান্দির হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনীভিত্তিক ‘শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের পাঁচালি’ নামে দুটি বই বরিশাল থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭ সালের দিকে বরিশাল প্রদর্শনী উপলক্ষে আয়োজিত কবিগানে ‘বলদের কবি’ নামে একটি কবি পরিবেশন করেন। তাতে ‘এবার দুশত বত্সরের পরে পুনঃ প্রাণ পেলাম ধরে, এবারে পূর্ণ স্বাধীন হলাম। এখন সুখী দুঃখী ধনী মানীর সমান অধিকার, কেহ আর নয় কারো কেনা গোলাম/ এইসব দেখে শুনে ধীরু বাবুর গোয়ালের বলদ ও তার ঝেড়ে ফেলে মনের গলদ, বাবুকে বলতেছে হাম্বা রবে/ তোমরা তো হলে স্বাধীন, আমরা পরাধীন আর রব কদিন, বলো না তবে।’ এই গান শুনে বরিশালের তত্কালীন জেলাপ্রশাসক উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং আর কোথাও তা পরিবেশন না করার হুমকি দেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গোপালগঞ্জে শ্রীধাম ওড়াকান্দিতে রাজেন্দ্রনাথ সরকারের বিপক্ষে কবিগান পরিবেশন করেন। গানের টপ্পায় রাজেন্দ্রনাথ সরকার ইন্দিরা গান্ধী এবং স্বরূপেন্দু সরকারকে শেখ মুজিবের ভূমিকায় অবতীর্ণ করিয়ে পাঁচালি পরিবেশন করেন। ১৯৭১ সালের লবণহ্রদ ক্যাম্পে কয়েক লাখ শরণার্থীর সামনে অন্তত সাত পালা কবিগান করেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সরকারি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সুরেন্দ্রনাথ সরকার এবং মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের বিপক্ষে স্বরূপেন্দু সরকার বেশ কয়েক পালা কবিগান পরিবেশন করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের কোথাও কবিগান হয়নি। কবিগান হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তখন ছিল না। ১৯৭৩ সাল থেকে পুনরায় কবিগান শুরু হয়। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কবিগান গেয়ে বেড়াতে থাকেন। ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এই পঁচিশ বছর স্বরূপেন্দু সরকার সক্রিয়ভাবে কবিগান পরিবেশন করেছেন। ১৯৮০ সালে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে কুমিল্লার কালোশশী চক্রবর্তী এবং ১৯৯৪ সালে সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরে যশোরের সঞ্জয় মল্লিকের বিপক্ষে কবিগান পরিবেশন করেন তিনি। কেবল কবিগান রচনা ও পরিবেশন রচনা নয়, গ্রন্থ রচনায়ও তিনি মনোনিবেশ করেন। অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার জানিয়েছেন, ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত ‘শ্রীশ্রীহরিঠাকুরের পাঁচালি’ বইটিতে হরিচাঁদ ঠাকুরের কীর্তিগাথার মোট তিনটি উপাখ্যানকে পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে উপস্থাপন করা হয়। একই বছর প্রকাশিত ‘ভাটির নাইয়া’ গ্রন্থে, ভূমিকায় কবি জসীমউদ্দীনের এক চিঠির অংশে দেখা দেখা যায়, তিনি লিখেছেন : ‘তোমার বিচ্ছেদ গান আমার এত ভাল লেগেছে যা অন্য কারো গানে আজ পর্যন্ত পাই নাই, তাই তোমার প্রেরিত কবিতা বাদ দিয়ে বিচ্ছেদ গানই ছাপতে দিয়েছিলাম।’ এ চিঠি স্বরূপেন্দু সরকারের একপ্রকার স্বীকৃতি বটে। এই গ্রন্থে দেহতত্ত্ব, বিচ্ছেদ, মনঃশিক্ষা, পল্লিগীতি, ইসলামি গজল, নারীশিক্ষা, লোকশিক্ষা, মতুয়াগীতি—প্রভৃতি ধরনের গান রয়েছে। স্বরূপেন্দু সরকারের তৃতীয় গ্রন্থ ‘ঠাকুর এলো মোদের ঘরে’ (১৯৬৬)। এতে প্রতিটি বর্ণকে আদ্যক্ষর হিসেবে লেখা পঞ্চাশটি ছড়া স্থান পেয়েছে। ছড়াগুলোতে মতুয়া আদর্শের প্রতিফলন, হরিচাঁদ ঠাকুরের উত্তরপুরুষ অংশুপতি ঠাকুরের আধ্যাত্মিক শক্তির কথাও প্রচারিত। চতুর্থ গ্রন্থ ‘মহালক্ষ্মী শ্রীশ্রী শান্তিদেবীর পাঁচালি’ (১৯৯৮)। পঞ্চম গ্রন্থ ‘পতিতপাবন গুরুচাঁদ’ (২০০০); ষষ্ঠ গ্রন্থ ‘সমাজ সংস্কারে মতুয়া’। এতে মতুয়া ধর্মকে স্বতন্ত্র একটি ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা রয়েছে। সপ্তম গ্রন্থ ‘ছোটদের ধর্মগ্রন্থ’ (২০০২)। হিন্দুদের বিভিন্ন সম্প্রদায়-বিশ্বাসের কথা মনে রেখে বইটিতে পয়ার ছন্দে ১২টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। অষ্টম গ্রন্থের নাম ‘পাগল হরিভজন’ (২০০৩)। হরিচাঁদ ঠাকুরের অন্যতম ভক্ত, সুন্দরবনের বাসিন্দা হরিভজনের কাব্যজীবনী এটি। লেখক জানিয়েছেন, ১৯২৩ সালের রাসপূর্ণিমায় তিনি সুন্দরবনের দক্ষিণে দুবলার চরের বিখ্যাত রাসমেলার সূচনা করেন। নবম গ্রন্থ ‘শ্রীশ্রীহরিচাঁদের জীবনকথা’। গদ্যভাষায় রচিত এটি শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ। স্বরূপেন্দু সরকারের আরও কয়েকটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে অপ্রকাশিত। এর মধ্যে, ‘পতিতের বান্ধব’, ‘মতুয়া আউল’, ‘যিশু কথামৃত’ উল্লেখযোগ্য। স্বরূপেন্দু সরকারের রচিত অজস্র ডাক, মালশি, সখীসংবাদ, কবি, ধুয়া প্রভৃতি ধরনের গান অপ্রকাশিত রয়েছে। এগুলো প্রকাশিত হলে বাংলার এক রত্নভান্ডার রক্ষা করা যাবে। একটি ডাকগানে তিনি বলেছেন, ‘মা তুই দিসনে কেন সাড়া গো, মা তুই দিসনে কেন সাড়া/ শুধু কি তুই মাটির মা-টি, ভিতরে নাই কিছু খড়-কুটা ছাড়া \’ তিনি যে ছন্দ-অন্ত্যমিলে পারদর্শী ছিলেন, তা আধুনিক কবির কৃতিত্বকেও হার মানায়। একটি ধুয়াগানেই তার প্রমাণ রয়েছে, ‘শ্রীধাম ওড়াকান্দি প্রেমবারুণী আয় কে ছুটে যাবি।/ মুখে হরি বলে আয় সকলে মন গুণে ধন পাবি\’ অনুপ্রাসের চমত্কার প্রয়োগ রয়েছে, ‘মহামায়া কেটে মোহমায়া পদছায়া দেহ মা সন্তানে। মাগো পেতে নিত্য বৃন্দাবন, অকারণ ভজন-সাধন,/ ত্রিভুবনে কে পায় কখন তোর বিন প্রেম প্রদানে \’ সখীসংবাদ গান রচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ‘একদিন শ্রীরাধিকা কুঞ্জবাসে আঁখি মুদি ভাবাবেশে/ কভু কাঁদে কভু হাসে মনপ্রাণ আকুল।/ হেনকালে আসি ললিতে, লাগিল সে বলিতে/ রাধে লো তুই চলিতে পথ করেছিস ভুল\’ আর তিনি যে গোটা বাংলাভাষী দর্শক-শ্রোতার কাছে স্মরণীয় হয়েছেন কবিগান রচনার জন্য, সেই কবিগানের কিঞ্চিত্ উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে নিবন্ধের শুরুতে এবং মাঝখানে। কবিগানের আসরের প্রশংসা ছাড়াও তিনি অজস্র সম্মান ও স্বীকৃতি লাভ করেছেন। ১৯৭৯ সালে বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ থানার রাজাপুর গ্রামের একটি মতুয়া সম্মেলনে স্বরূপেন্দু সরকারকে ‘কবিসিন্ধু’ উপাধি দান করা হয়। ২০০৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরেন্দ্র স্মৃতি সংসদের পক্ষ থেকে স্বরূপেন্দু সরকারকে সংবর্ধনা প্রদান ও ‘কবিসুরশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ২০০৮ সালের ২৮ জুন ঢাকায় মতুয়া মহাসম্মেলনে স্বরূপেন্দু সরকারকে ‘মতুয়ারত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ২০০৯ সালের ১৯ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২০০৬ সালে দেওয়া মানপত্রে মত্রচিত বাক্য দিয়েই তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো যায়, ‘হে কবিসাধক, তোমার সাধনা বিফলে যাওয়ার নয়/ তুমি আমাদের “কবিসুরশ্রী” এই হোক পরিচয়।’