গজল সম্রাট মেহেদী হাসান

যাঁর কণ্ঠে কথা বলেন ঈশ্বর

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:১৫
ষাটের দশকের প্রথম দিকের কথা। মেহেদী হাসান তখনো গজল সম্রাট হয়ে ওঠেননি। পল্লিগ্রামের একটি গানের জলসায় তাঁর ডাক পড়ে; যেখানে গানের স্রোতা নিরক্ষর কৃষক। মেহেদী হাসান প্রথমে ‘গুলুমে রাঙ্গ ভারে’ গজলটি গেয়ে শোনান। গান শেষে প্রচণ্ড করতালির মধ্যে গজলটি আবারও শোনাবার ফরমায়েশ আসে। মেহেদী হাসান স্রোতাদের প্রতিক্রিয়া দেখে তো রীতিমতো অবাক! ‘গুলুমে রাঙ্গ ভারে’ কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের লেখা একটি অত্যন্ত উচ্চমার্গের গজল যা শিক্ষিত গজল-বোদ্ধাদেরও ধাঁধায় ফেলে দেয়। আজ সেই গজল সাধারণ কৃষকদের কাছে এত সমাদর পাবে, সেটা তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। এর পর তিনি যতবার গজলটি শোনালেন, ততবারই জোরালো অভিবাদন পেলেন। মেহেদী হাসান ধাঁধায় পড়ে গেলেন। তখন স্রোতাদের মধ্য থেকে একজন প্রবীণ মেহেদী হাসানের কাছে এসে বললেন, ‘তোমার কণ্ঠে ঈশ্বরপ্রদত্ত এমন কিছু আছে, যা সংগীতের অভিধানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যাকে অনেকে ‘মেহবুব সুর’ বলে থাকেন। তাই তোমার গান অজপাড়াগাঁয়ের কৃষকদেরও হূদয় ছুঁতে পেরেছে; কবি ফয়েজের কাব্যের অন্তর্নিহিত বাণী তাদের বোঝার প্রয়োজন হয়নি।’ এমনই ছিল মেহেদী হাসানের কণ্ঠের জাদু। তাঁর গজল শুনে হয়তো তাই কিংবদন্তি শিল্পী লতা মুঙ্গেশকর বলেছিলেন, ‘মেহেদী হাসানের কণ্ঠে বাস করেন স্বয়ং ঈশ্বর।’ প্রয়াত অপর এক কিংবদন্তি গায়ক মো. রফি বলেছেন, ‘আমরা গান করি আমজনতার জন্য আর মেহেদী হাসান গান করেন আমাদের জন্য।’ এতেই বোঝা যায় মেহেদী হাসান কোন মাপের শিল্পী ছিলেন। সর্বকালের সেরা গজলশিল্পী হিসেবে মেহেদী হাসানকে মেনে নিয়েছেন সবাই। এ জন্য তাঁকে বলা হয় শাহেনশাহ-ই-গজল। কেউবা আবার ভালোবেসে তাঁকে ডাকেন ‘খাঁ সাহেব’ বলে। খাইবার থেকে ঢাকা, কারাকোরাম হতে কন্যাকুমারী পর্যন্ত তাঁর অসাধারণ গায়কি এবং কণ্ঠের মাধুর্য আলো ছড়াচ্ছে লাখো-কোটি সংগীতপ্রেমী মানুষের অন্তরে। সুরের এই জাদুকরের মহাপ্রয়াণের বর্ষপূর্তি হচ্ছে এ মাসেই। দীর্ঘদিন অসুস্থতার সাথে লড়াই করে গত বছরের ১৩ জুন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন গজল সম্রাট মেহেদী হাসান। মেহেদী হাসানের জন্ম ১৯২৭ সালে ১৮ জুলাই, রাজস্থানের ঝুন ঝুন জেলার লুনা গ্রামে, কালাওয়ান্ত সংগীত পরিবারে। ‘কালা’ মানে কলা বা শিল্প আর ‘ওয়ান্ত’ শব্দের অর্থ শিল্পী। তাঁর বাবা ওস্তাদ আজিম আলী খান এবং চাচা ওস্তাদ ইসমাইল খান ছিলেন ধ্রুপদ সংগীতের প্রখ্যাত পণ্ডিত। শৈশবে বাবা ও চাচার কাছেই মেহেদীর সংগীতে হাতেখড়ি হয়। মেহেদীর প্রথম স্টেজ পারফর্মেন্স হয় বরোদার মহারাজার দরবারে। ৪০ মিনিট ধরে বরোদার মাহরাজার সামনে তিনি রাগ বসন্ত পরিবেশন করেন। এরপর শিশু মেহদী ধ্রুপদি ও খেয়াল পরিবেশন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এভাবেই শুরু হয় ভুবনজয়ী এই শিল্পীর যাত্রা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর মেহেদীর পরিবার ভারত ছেড়ে পাকিস্তানের শাহিওয়াল এলাকায় চলে আসে। মহেদী তখন ২০ বছরের টগবগে যুবক। নতুন দেশে অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখে আর্থিক সঙ্কটে পড়ে যায় তাঁর পরিবার। বেঁচে থাকার তাগিদে তাই জীবনসংগ্রামে নামতে হয় মেহেদী হাসানকে। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে বুকের গভীরে সংগীতের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করতেন বলে কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নিয়মিত সংগীতচর্চাও চালিয়ে যান। একজন বড় সংগীতশিল্পী হতে হলে ফুসফুসে জোর লাগে; বাবার এই পরামর্শ শুনে তিনি নিয়মিত শরীরচর্চা শুরু করেন। সকালে দৌড়াদৌড়ি এবং সন্ধ্যায় কুস্তিগিরদের আখড়ায় শরীরচর্চা—এই ছিল তাঁর রুটিন। সাফল্যের শীর্ষে আরোহণ করতে মেহেদী হাসানের মতো কালজয়ী শিল্পীকেও ক্যরিয়ারের প্রথম দিকে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি লাহোরের বেশ কিছু অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন। কিন্তু তাতে সাফল্য আসেনি। অবশেষে ১৯৫৭ সালে রেডিও পাকিস্তানের করাচি স্টুডিওতে তিনি অডিশনের সুযোগ পান। অডিশনে মেহেদী হাসান প্রথমে ঠুমরি, তারপর একে একে রাগ খাম্বাজ, পিলু, দেশ, তিলক কামোদ গেয়ে শোনান। রেডিও কর্মকর্তা জেড বুখারি এবং রফিক আনোয়ার তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন। মেহেদী হাসান এ-গ্রেড ক্যাটাগরির শিল্পী হিসেবে কাজ পান। যদিও এ-গ্রেডের সম্মানী ছিল ১৫ রুপি; কিন্তু প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ মেহেদী হাসানের সম্মানী ৩৫ রুপি নির্ধারণ করা হয়। তাঁর গলার ‘আকার’(signature) ঠুমরি ও গজলের জন্য মানানসই ছিল। তাই তিনি বিশুদ্ধ উচ্চাঙ্গ সংগীতের পরিবর্তে হালকা ক্ল্যাসিকাল ও গজলের দিকে মনোনিবেশ করেন। তাঁর গায়কির স্বতন্ত্র ধারা ও মিষ্টি কণ্ঠ স্রোতাদের নজর কাড়তে শুরু করে। মেহেদী হাসানের শিল্পীখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। পাকিস্তানি ফিল্মি গানের সর্বকালের সেরা গানগুলো মেহেদী হাসানেরই গাওয়া। তবে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবেও তাঁর খ্যাতি তাত্ক্ষণিক আসেনি। তাঁর প্রথম ফিল্মি গান হলো ‘শিকার’ ছায়াছবির ‘নাজার মিলতেহি দিলকি বাত কা চার্চা না হো যায়ে’। ১৯৫৬ থেকে ৬১ সাল পর্যন্ত তিনি মাত্র নটি ফিল্মি গান করেন, যেগুলো তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। কিন্তু ১৯৬২ সাল ছিল তাঁর জন্য পয়মন্ত বছর। ওই বছর তিনি পাঁচটি ফিল্মি গান করেন, তার মধ্যে তিনটি ছিল সুপার হিট। অতঃপর ‘ফিরিঙ্গি’ (১৯৬৪) ছবিতে ফয়েজ আহমদ ফয়েজের লেখা ও তাঁর বড় ভাই পণ্ডিত গোলাম কাদিরের কম্পোজিশনে ‘গুলুমে রাঙ্গ ভারে’ গজল তাঁকে এনে দেয় গগনচুম্বি সাফল্য আর খ্যাতি। গুলাম কাদিরের কম্পোজিশনে আরও দুটি গজল ‘মোহাব্বাত কারনে ওয়ালে (হাফিজ হোসিয়ারপুরি)’ এবং ‘ভুলি বিছরি চান্ত উমিদে (রাজি তিরমিজি)’ সুপার হিট হয়। ঘুরে যায় মেহেদী হাসানের ভাগ্যের চাকা। এর পর তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। মেহেদী হাসানের অনেক ফিল্মি গান ছিল বড় বড় কবিদের লেখা গজল। দুরূহ গজলকে গীতের হালকা রং মেখে তিনি যেভাবে পরিবেশন করতেন, তাতে চলচ্চিত্রের সস্তা বাণিজ্যিক অবেদন ছাড়িয়ে স্রোতারা ভিন্ন স্বাদ খুঁজে পেতেন। এমন দুটো উদাহরণ হচ্ছে আহমেদ ফারাজের লেখা মাস্টারপিস গজল ‘আবকে হাম বিছড়ে তো শায়েদ’ এবং রাগ আইমানের ওপর রচিত ‘রাঞ্জিসহি সাহি’। মেহেদী হাসান ধ্রুপদ সংগীতের অঙ্গন থেকে ফিল্মি গানের জগতে আসেন। তাঁর রেওয়াজ-চর্চিত কণ্ঠে সব ধরনের গানই অমরত্ব পেয়েছে। মেহেদী হাসান পঁচিশ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। জিন্দেগিমে সাভি পিয়ার কিয়া কারতে হেয়, তেরে ভিগে বাদানকি খুশবু, পিয়ার ভারে দো শারমিলে নেয়ন—রোমান্টিক সংগীতে যেমন ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে তেমনি এক নায়ে মোড়পে, মুঝে তুম নাজারছে, ইক হুসনেকি দেবিছে মুঝে পেয়ার হুয়া থা গায়কির চূড়ান্ত মানদণ্ড বলে ধরা হয়। মেহেদী হাসান পপ স্টার ছিলেন না; কিন্তু ৭০ দশকের শেষের দিকে রবিন ঘোষের সুরে গাওয়া ‘কাভি ম্যায় সোচতা হু’, ‘মুঝে দিলছে না ভুলানা’ উপমহাদেশে ফিউশন মিউজিকের দ্বার খুলে দেয়। মেহেদী হাসান উর্দু সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন না। অথচ মির, গালিব, ফয়েজ, আহমাদ ফারাজ কিংবা পারভিন শাকিরের মতো সেরা উর্দু কবিদের রচিত গজলে ব্যবহূত শব্দ এবং ছন্দের অন্তর্নিহিত বার্তা বোঝার ছিল তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা। উর্দু গজলের কোন স্বরের ব্যাপ্তি কতটুকু কিংবা কোন শব্দের ওপর কতটুকু জোর দিলে কাব্য-স্তবকের মর্মার্থ বেরিয়ে আসবে, সেটা তার মতো করে কোনো গজলশিল্পী গাইতে পারেননি। মেহেদী হাসানের অনন্য গায়কির জন্য অত্যন্ত জটিল রাগ-রাগিনীও শিশুর সহজ-সরল মিষ্টি হাসির মতো স্রোতাদের হূদয়ে ঢেউ তোলে। মেহেদী হাসানের ভক্তরা ছড়িয়ে আছেন বিশ্বেজুড়ে। নেপালের রাজা বীরেন্দ্র ছিলেন তাঁর গানের একনিষ্ঠ ভক্ত। একবার রাজার আমন্ত্রণে তিনি নেপালের রাজপ্রাসাদে গান পরিবেশন করছিলেন। ‘জিন্দেগিমে তো সাভহি পিয়ার কিয়া কারতে হ্যায়’ গানটি গাইবার সময় মেহেদী হাসান গানের কথা ভুলে যান। দর্শকদের সারি থেকে রাজা বীরেন্দ্র তত্ক্ষণাত্ দাঁড়িয়ে গানের ভুলে যাওয়া লাইনটি গেয়ে শুনিয়ে দেন। এমনই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও কবি অটল বিহারি বাজপায়ি, কিংবদন্তি শিল্পী লতা, মো. রফি, অভিনেতা দিলীপ কুমার, জগজিত্ সিং, হরিহরণ, তালাত আজিজ ও বলিউডের এই প্রজন্মের সেরা গায়ক সনু নিগমও মেহেদী হাসানের গানের একনিষ্ঠ অনুরাগী। মেহেদী হাসানের মতো মহত্ শিল্পী ও তাঁর সংগীতকে ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে বাঁধা যায় না। প্রকৃত অর্থে তিনি কোনো দেশের নন। বাংলাদেশেও রয়েছে মেহেদী হাসানের অগণন ভক্ত। তাঁর গাওয়া বাংলা গান ‘হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়’, ‘রাজাসাহেব’ ছায়াছবির ‘ঢাকো যত না নয়ন দু-হাতে’ এবং ‘তুমি যে আমার’ বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীরা চিরদিন মনে রাখবে। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশের এতগুলো টিভি স্টেশনে মেহেদী হাসানের স্মরণে কোনো অনুষ্ঠান হলো না—ভাবতেই বেদনায় নীল হই। মেহেদী হাসান গুটিকতক পাকিস্তানিদের মধ্যে একজন, যিনি বাঙালিদের অধিকার হরণের জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে ধিক্কার দেন। ১৯৮৫ সালে সার্ক সম্মেলন উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঢাকায় আসেন মেহেদী হাসান। তখন রেকর্ডিং স্টুডিওতে দেওয়া এক সাক্ষাত্কার থেকে জানা যায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে এই মহান শিল্পীর অপার শ্রদ্ধার কথা। ওই আলাপচারিতায় মেহেদী হাসান বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার জন্য পাকিস্তানি শাসকদের দায়ী করে ভাষা শহীদদের জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। গজল গায়কিতে ভিন্নধারা প্রবর্তন করে গজলকে উত্কর্ষের প্রান্তিক স্তরে নিয়ে গেছেন মেহেদী হাসান। তাঁর সাফল্য আমাদের উপমহাদেশে গজলকে পেশা হিসেবে নিতে শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে। আজ বিশ্বের দেশে দেশে গজলশিল্পীরা যে কনসার্টের আমন্ত্রণ পাচ্ছেন, তা মেহেদী হাসানেরই অবদান। মেহেদী হাসান আমাদের মাঝে নেই, তবে বিশ্বের গজলপ্রেমী মানুষের কাছে তিনি অমরত্ব পেয়েছেন; অমরত্ব পেয়েছে তাঁর সংগীত— ‘ভুলি বিছরি চান্দ উমিদে চান্দ ফাসানে ইয়াদ আয়ে/ তুম ইয়াদ আয়ে অওর তুমহারে সাথ জামানে ইয়াদ আয়ে’।