আহ্লান সাহ্লান মাহে রমজান

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:১৯
পবিত্র রমজানুল মুবারক আমাদের মাঝে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের ছায়া বিস্তার করেছে। আর কয়েকটা দিন পরেই জান্নাত লাভের এই পবিত্র সমুহান মাস পেয়ে ধন্য হবে সমগ্র মুসলিম জাহান। সাধনার মাধ্যমে পৌঁছে যাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টির রাইয়ান নামক দরজায়। সেই জন্য এখনই রমজান কারীমকে জানাই আহ্লান সাহ্লান   ইসলামের বুনিয়াদ পাঁচটি জিনিসের উপর। তন্মধ্যে একটি রমাযানের সিয়াম। আরবী সিয়াম শব্দের যথার্থ ভাব প্রকাশক শব্দ বাংলা ভাষায় নেই। যদিও কেউ কৃচ্ছ্রসাধনা ও উপবাস প্রভৃতি শব্দ দ্বারা সিয়ামের ভাব প্রকাশ করেন। সিয়ামের প্রতিশব্দ হিসেবে ফারসী ভাষাতে রোজা শব্দটি ব্যবহূত হয়, যদিও তা সিয়ামের সঠিক ভাব প্রকাশক শব্দ নয়। রোজা শব্দ দ্বারা সিয়ামের প্রকৃত ভাব প্রকাশ পাক বা না পাক, বাংলার মুসলিমগণ রোজা শব্দটি দ্বারা সিয়ামই বোঝে। কিন্তু সিয়াম বললে বেশীরভাগ লোকই বুঝতে পারেন না। তাই সিয়ামের বদলে রোজা শব্দটিই এখানে ব্যবহার করছি। আরবী সিয়াম শব্দের শাব্দিক অর্থ বিরত হওয়া এবং শরীয়াতের পরিভাষায় সিয়াম হল কতিপয় বিশেষ শর্তসাপেক্ষে বিশেষ বিষয় হতে নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষভাবে বিরত থাকা (ফাতহুল বারী ৪র্থ খণ্ড পৃষ্ঠা ১০২। এই রোজা কবে থেকে চালু হয়েছিল তার বিশদ বিবরণ পাওয়া খুবই মুশকিল। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হল যেমন তোমাদের পূর্বেকার লোকেদের উপর ফরয করা হয়েছিল” (সূরা বাকারা ২: ১৮৩)। এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, মুহাম্মদ (স.)-এর পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও রোজা ফরয ছিল। আদম (আ.)-এর রোজা আদম (আ.) যখন নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলেন এবং তারপর তাওবাহ করেছিলেন তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তাঁর তাওবাহ কবুল হয়নি। ৩০ দিন পর তার তাওবাহ কবুল হয়। তারপর তাঁর সন্তানদের উপরে ৩০টি রোজা ফরয করে দেয়া হয় (ফাতহুল বারী ৪র্থ খণ্ড ১০২-১০৩ পৃষ্ঠা)। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম রোজা কে রেখেছিলেন্ল এ ব্যাপারে সাধক চূড়ামণি শাইখ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) বর্ণনা করেছেন, যির্র ইবনে হুবাইশ (রা.) বলেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে আইয়্যামে বীয (চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখকে আইয়্যামে বীয বলে) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আদম (আ.)-কে একটি ফল খেতে মানা করেছিলেন। কিন্তু আদম (আ.) সেই ফল খেয়ে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসতে বাধ্য হন। সে সময় তাঁর দেহের রং কালো হয়ে যায়। ফলে তাঁর এ দুর্দশা দেখে ফেরেশতাগণ কেঁদে কেঁদে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করলেন, হে আল্লাহ! আদম তোমার প্রিয় সৃষ্টি!! তুমি তাঁকে জান্নাতে স্থান দিয়েছিলে, আমাদের দ্বারা তাকে সিজদাও করালে, আর একটিমাত্র ভুলের জন্য তার গায়ের রং কালো করে দিলে? তাদের জবাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আদম (আ.)-এর কাছে এ ওয়াহী পাঠালেন, তুমি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখ। আদম (আ.) তা-ই করলেন। ফলে তাঁর দেহের রং আবার উজ্জ্বল হল। এ জন্যই এ তিনটি দিনকে আইয়্যামে বীয বা উজ্জ্বল দিন বলে (গুনইয়াতুন ত্ব-লেবীন বাংলা অনুবাদ ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ৩০৭)। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) ঘরে ও সফরে আইয়্যামে বীযে কখনো সিয়াম না করে থাকতেন না (নাসাঈ, মিশকাত ১৮০ পৃষ্ঠা)। নূহ (আ.)-এর রোজা আদম (আ.)-এর পর নূহ (আ.) কে দ্বিতীয় আদম বলা হয়। তাঁর যুগেও সিয়াম ছিল। কারণ, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন: নূহ (আ.) ১লা শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন (ইবনে মাজাহ ১২৪ পৃষ্ঠা)। মুআয ইবন মাস’উদ, ইবনে আব্বাস, আতা, কাতাদাহ ও যাহ্হাক (রা.) থেকে বর্ণিত, নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে প্রত্যেক মাসে তিনটি করে সিয়াম ছিল। পরিশেষে রমাযানের এক মাস সিয়ামের দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তা রহিত করে দেন (তাফসীর ইবনে কাসীর, ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ২১৪)। ইবনে কাসীরের (রহ.) এ বর্ণনা প্রমাণ করে যে, নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে মুহাম্মদ (স.)-এর যুগ পর্যন্ত রমাযানের সিয়াম ফরয হবার আগে কমপক্ষে তিনটি করে সিয়াম ফরয ছিল। ইবরাহীম (আ.) ও বিভিন্ন জাতির রোজা নূহ (আ.)-এর পরে নামকরা নবী ছিলেন ইবরাহীম (আ.)। তাঁর যুগে ৩০টি সিয়াম ছিল বলে কেউ কেউ লিখেছেন। ইব্রাহীম (আ.)-এর কিছু পরের যুগ বৈদিক যুগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাত্ উপবাস ছিল। প্রত্যেক হিন্দী মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের উপর ‘একাদশীর’ উপবাস রয়েছে। এ হিসেবে তাদের উপবাস ২৪টি হয়। কোন কোন ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসে প্রত্যেক সোমবারে উপবাস করেন। কখনো হিন্দু যোগীরা ৪০দিন পানাহার ত্যাগ করে চল্লিশে ব্রত পালন করেন। হযরত মূসা (আ.)-এর রোজা ইবরাহীম-এর পর কিতাবধারী প্রসিদ্ধ নবী মূসা (আ.) তাঁর যুগেও সিয়াম ছিল। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) মাদীনায় (হিজরত করে) এসে ইয়াহুদীদেরকে আশুরার দিনে (মুহাররম মাসের ১০ তারিখে) রোজা অবস্থায় পেলেন। তাই তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা করছো? তারা বলল, এটা সেই মহান দিন যেদিনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মূসা (আ.) ও তাঁর কওমকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফির’আউন ও তার জাতিকে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ মূসা (আ.) ঐদিনে রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরা আজকে ঐ রোজা করছি (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১৮০ পৃষ্ঠা)। ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তওরাতে আছে, মূসা (আ.) তূর পাহাড়ে ৪০ দিন পানাহার না করে কাটিয়েছিলেন। তাই ইয়াহুদীরা সাধারণভাবে মূসা (আ.)-এর অনুসরণে ৪০টি সিয়াম রাখা ভাল মনে করতো। কিন্তু এর মধ্যে ৪০তম দিনটিতে তাদের উপর রোজা রাখা ফরয ছিল। যা ইয়াহুদীদের ৭ম মাস তিসরিনের ১০ম তারিখে পড়তো। এ জন্য ঐদিনটিকে আশুরাহ বা ১০ম দিন বলা হয়। এ আশুরার দিনে মূসা (আ.) তাওরাতের ১০টি বিধান পেয়েছিলেন। এ কারণেই তাওরাতে ঐদিনের রোজার অত্যন্ত তাগিদ এসেছে। এছাড়াও ইয়াহুদী সহীফতে অন্যান্য রোজারও স্পষ্ট হুকুম রয়েছে (সীরাতুন নাবী ৫ম খণ্ড, ২৮৬ পৃষ্ঠা)। দাউদ (আ.)-এর রোজা মূসা (আ.)-এর পর কিতাবধারী বিখ্যাত নবী ছিলেন দাউদ (আ.)। তাঁর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল। আল্লাহর রাসুল বলেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় রোজা দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন বিনা রোজায় থাকতেন (নাসাঈ ১ম খণ্ড ২৫০ পৃষ্ঠা, বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১৭৯ পৃষ্ঠা)। অর্থাত্ দাউদ (আ.) অর্ধেক বছর রোজা রাখতেন এবং অর্ধেক বছর বিনা রোজা থাকতেন। ঈসা (আ.)-এর রোজা দাউদ (আ.)-এর পর কিতাবধারী বিশিষ্ট নবী হলেন ঈসা (আ.)। তাঁর যুগে এবং তাঁর জন্মের আগেও রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআনে আছে, ঈসা (আ.) এর যখন জন্ম হয় তখন লোকেরা তাঁর মা মারইয়ামকে তাঁর জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আমি করুণাময়ের উদ্দেশ্যে মানতের রোজা রেখেছি। সুতরাং আজকে আমি কোন মানুষের সাথে মোটেই কথা বলব না” (সূরা মারইয়াম ১৯ : ২৬ আয়াত)। এ আয়াতদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আ.) ও তাঁর উম্মাত (অনুসারী সম্প্রদায়) রোজা রাখতেন। ঈসা (আ.) জঙ্গলে ৪০ দিন সিয়াম রেখেছিলেন। একদা ঈসা (আ.)-কে তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞেস করেন যে, আমরা অপবিত্র আত্মাকে কি করে বের করব? জবাবে তিনি বলেন, তা দু’আ ও রোজা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে বের হতে পারে না (মথি ৭-৬৬, সীরাতুন নবী ৫ম খণ্ড ২৮৭-২৮৮ পৃষ্ঠা)। জাহেলী আরবদের সিয়াম ঈসা (আ.)-এর পর শেষ নবী মুহাম্মদ (স.)-এর যুগ। তাঁর নবী হবার পূর্বে আরবের মুশরিকদের মধ্যেও সিয়ামের প্রচলন ছিল। যেমন ‘আয়িশা (রা.) বলেন, “আশুরার দিনে কুরাইশরা জাহেলী যুগে রোজা রাখতো এবং রাসুলুল্লাহ (স.) জাহেলী যুগে ঐ রোজা রাখতেন। অতঃপর যখন তিনি মাদীনায় আসেন তখনও ঐ রোজা নিজে রাখেন এবং সাহাবীদেরকে রোজা রাখার হুকুম দেন। পরিশেষে রমাযানের সিয়াম যখন ফরজ হয় তখন তিনি আশুরার রোজা ছেড়ে দেন” (মুসলিম ১১২৫, বুখারী ১৫৯২, তিরমিযী ৭৫৩, আবু দাউদ ২৪৪২, ইবনে মাজাহ ১৭৩৩)। (চলবে) ই-মেইল:[email protected]